গ্রামীণ অর্থনীতিতে মন্দা, ব্যাংক ঋণ প্রবাহ ঋণাত্মক

কয়েক বছর ধরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে চলমান স্থবিরতা আরো তীব্র হয়েছে। এর প্রভাবে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংক ঋণের প্রবাহ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের দেয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, গত এক বছরে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংক ঋণের স্থিতি না বেড়ে বরং সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি কমেছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে গ্রামাঞ্চলে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৭২০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের মার্চে এ ঋণ স্থিতি কমে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে এমন এক সময়ে মন্দা ভাব চলছে, যখন দেশে আসছে ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। প্রবাসীরা কেবল চলতি অর্থবছরেই (১৪ জুন পর্যন্ত) ৩ হাজার ৪৩০ কোটি বা ৩৪ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৪ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। প্রবাসীদের পাঠানো বিপুল এ অর্থের বড় অংশই গেছে গ্রামাঞ্চলে। রেমিট্যান্সের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থই ভোগব্যয় করে প্রবাসীদের পরিবার। সে হিসাবে গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা হওয়ার পাশাপাশি ঋণের চাহিদাও বাড়ার কথা।

ব্যাংকাররা বলছেন, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি এখন অনেকটাই নিষ্প্রভ। অর্থনৈতিক মন্দা ভাবে গ্রামীণ কুটির, ক্ষুদ্র ও ছোট শিল্পগুলোর অনেক ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন উদ্যোগও গড়ে উঠছে না। এ কারণে গ্রামাঞ্চলে ঋণের তেমন চাহিদা নেই।

অবশ্য অনেক অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষ ভিন্ন ব্যাখ্যাও দিচ্ছেন। তারা বলছেন, দেশের বেশির ভাগ ব্যাংকের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ পৌঁছানোর সক্ষমতাই নেই। বছরের পর বছর তাগাদা দেয়া হলেও ব্যাংকগুলো সে সক্ষমতা গড়ে তোলেনি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির নামে এজেন্ট ব্যাংকিং, উপশাখাসহ যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলো কেবল আমানত সংগ্রহে ব্যবহার হচ্ছে। ব্যাংক খাতের বিরাজমান সংকট ও অস্থিরতার জেরেও গ্রামীণ ঋণ বিতরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণে যে লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে, সেটি বিতরণে পুরোপুরি ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণের চাহিদা নেই বলে জানিয়েছেন ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাসরুর আরেফিন। সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে থাকা এ শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশের ঘরে নেমে গেছে। আমার ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে ঋণের এত কম চাহিদা আগে কখনো দেখিনি। শহরাঞ্চলে যেখানে ঋণের চাহিদা নেই, সেখানে গ্রামে ঋণের চাহিদা আরো কমে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। দেশের অনেক ব্যাংকের এখন ঋণ দেয়ার সক্ষমতাই নেই। সরকারি ব্যাংকগুলোর গ্রামাঞ্চলে অনেক শাখা আছে। আমরা দেখছি, ওই ব্যাংকগুলোর ঋণ প্রবৃদ্ধিতেও স্থবিরতা চলছে।’

সিটি ব্যাংক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে রিটেইল ও ক্ষুদ্র ঋণ সম্প্রসারণে কাজ করছে বলে জানান মাসরুর আরেফিন। তিনি বলেন, ‘আমরা এমএফএস প্রতিষ্ঠান বিকাশের মাধ্যমে বিনা জামানতে ৫০০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ডিজিটাল ন্যানো লোন দিচ্ছি। অতি ক্ষুদ্র এ ঋণ স্থিতি এখন সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের নতুন লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে। বেশকিছু প্রণোদনা প্যাকেজও ঘোষণা করা হয়েছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি নির্বাচিত নতুন সরকার বাজেট ঘোষণা করেছে। আশা করছি, গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াবে।’

প্রতি ত্রৈমাসিকে ব্যাংক খাতের নানা তথ্য-উপাত্ত নিয়ে ‘শিডিউলড ব্যাংকস স্ট্যাটিস্টিকস’ প্রকাশ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রকাশনার সর্বশেষ সংখ্যায় দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের মোট স্থিতি ছিল ১৭ লাখ ৮৩ হাজার ৯২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৬ লাখ ৫১ হাজার ৮১১ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে শহরাঞ্চলে, যা মোট ব্যাংক ঋণের ৯২ দশমিক ৫৯ শতাংশ। বিপরীতে একই সময়ে গ্রামাঞ্চলে ঋণ বিতরণ স্থিতি ছিল মাত্র ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। এটি দেশের ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের মাত্র ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ। যদিও দেশের জিডিপিতে গ্রামীণ অর্থনীতির ভূমিকা ৩০ শতাংশেরও বেশি।

অন্যদিকে বিতরণকৃত ঋণের চেয়ে গ্রামাঞ্চল থেকে প্রায় তিন গুণ আমানত সংগ্রহ করেছে ব্যাংকগুলো। চলতি বছরের মার্চ শেষে সংগৃহীত আমানতের স্থিতি ছিল ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা। আর ২০২৫ সালের মার্চে এ স্থিতি ৩ লাখ ১ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ছিল। সে হিসাবে গত এক বছরে গ্রামীণ অঞ্চলের আমানত ৪২ হাজার ৪৮০ কোটি টাকা বেড়েছে। বিপরীতে একই সময়ে ব্যাংক ঋণের স্থিতি ৪ হাজার ৬১২ কোটি টাকা কমেছে।

গ্রামীণ অঞ্চলে বিতরণকৃত ঋণ স্থিতির মধ্যে কৃষি ঋণও অন্তর্ভুক্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত কৃষি খাতে ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি ছিল ৬৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। এপ্রিলে এসে এ ঋণ স্থিতি না বেড়ে উল্টো ৬৩ হাজার ২৪৭ কোটি টাকায় নেমে গেছে। কৃষি ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও ব্যাংকগুলো পুরোপুরি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠাননির্ভর হয়ে পড়েছে।

গ্রামীণ এলাকা থেকে সংগৃহীত আমানত সংশ্লিষ্ট এলাকায়ই ঋণ হিসেবে বিতরণ করা গেলে অর্থনীতির চিত্র পাল্টে যেত বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকের পক্ষে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণ পৌঁছানো বেশ কঠিন। বেশির ভাগ ব্যাংকের এ ধরনের ঋণ পৌঁছানোর সামর্থ্য কিংবা অবকাঠামোই নেই। এ কারণে ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের জন্য এনজিওর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।’

স্থানীয়ভাবে ঋণ বিতরণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এজেন্ট ব্যাংকিং কিংবা উপশাখার মতো সেবাগুলো আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে চালু করা হয়েছে। তবে এসব সেবার সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এখনো পুরোপুরি পেতে শুরু করেনি। কারণ ব্যাংকগুলো এজেন্ট বা উপশাখার মাধ্যমে এখনো বেশি আমানত সংগ্রহ করছে। সংগৃহীত আমানত যদি সংশ্লিষ্ট এলাকায় ঋণ হিসেবে বিতরণ করা সম্ভব হতো, তাহলে দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠত। গ্রামীণ কর্মসংস্থান বাড়ত। তবে এখনো এ সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছার চেষ্টা করছি।’

কয়েক বছর ধরেই দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বিপরীতে শ্লথ হয়ে পড়েছে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে আসে। আর চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ অর্জিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিপরীতে গত মে মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যেখানে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে ৬ শতাংশ নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল।

অর্থনৈতিক স্থবিরতার পাশাপাশি দেশের ব্যাংক খাতেও সংকট ও অস্থিরতা চলছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়েছে। গত মার্চ শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ স্থিতি ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। দেশের অন্তত দুই ডজন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ সক্ষমতা একেবারেই সংকুচিত হয়ে এসেছে। যে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য বা ঋণ বিতরণের মতো অর্থ আছে, তারাও উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত ঋণ দিচ্ছে না। বেসরকারি খাতে ঋণ না দিয়ে ব্যাংকগুলো এখন সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ড কেনায় বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। এ কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে নেমে এলেও সরকারি ঋণে প্রবৃদ্ধির হার ৩০ শতাংশেরও বেশি।

গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের এখন টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী। ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক এ অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের বেঁচে থাকাই এখন দুষ্কর। আবার ঋণপ্রবাহ কমে আসায় তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনাও পিছিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থানে। গ্রামের কর্মহীন মানুষ এখন শহরমুখী হচ্ছে। গ্রামে ঋণ প্রদানে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো তৎপর হওয়া দরকার। এক্ষেত্রে সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

গ্রামীণ অর্থনীতিতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে সক্ষমতার অভাবে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংকসহ ৭১৯টি ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের বিতরণকৃত ঋণ স্থিতি এখন ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।

গ্রামাঞ্চলে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও এসএমই ফাউন্ডেশনের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিস্তৃত হয়েছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কুটির ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা তহবিল গঠন করেছে। এ তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পিকেএসএফকে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিকেএসএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফজলুল কাদের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গ্রামীণ অর্থনীতিতে বড় ধরনের স্থবিরতা চলছে। এ স্থবিরতা কাটাতে ব্যাংকের চেয়েও ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো ভূমিকা রাখতে পারে। পিকেএসএফের পক্ষ থেকে আমরা বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছি। বাংলাদেশ ব্যাংক যে ৫ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে, সেটির সঙ্গে সরকার ও আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে আরো ৬ হাজার কোটি টাকা যুক্ত করা হচ্ছে। গ্রামীণ অর্থনীতিতে আমরা ১১ হাজার কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যে কাজ করছি। গ্রামীণ অর্থনীতি ও টেকসই উন্নয়নের কারিগর হিসেবে পিকেএসএফের তিন দশকেরও বেশি সময়ের সফল অভিজ্ঞতা রয়েছে।’

আরও