মাত্র এক মাসের ব্যবধানে, মার্চ শেষে তা বেড়ে প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ বলছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো সুষম সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতি এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিধি ও সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় উৎস থেকেই ঋণ গ্রহণের প্রবণতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অর্থ বিভাগের সাম্প্রতিক মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক নীতি বিবৃতির প্রক্ষেপণ বলছে, আগামী তিন বছরে এ ঋণ স্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছবে যা দেশের সার্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে বেসরকারি খাতের বিকাশ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
অর্থ বিভাগের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর শেষে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৬ লাখ ৩৩ হাজার ১০০ কোটি টাকায়। এর পরবর্তী অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ২৯ লাখ ৫৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা হবে এবং তিন বছর পর অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছর শেষে এ ঋণ স্থিতি দাঁড়াবে ৩৩ লাখ ৭৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়। এ বিশাল ঋণের মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎসের অবদান থাকবে ১৮ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১৪ লাখ ৯৭ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়।
ঋণের এ উল্লম্ফন স্বাভাবিকভাবেই সুদ পরিশোধের ব্যয়কে বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারকে সুদ বাবদ পরিশোধ করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে ১ লাখ ৬২ হাজার ৭০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ বাজেটের একটি বড় অংশই চলে যাবে বিগত বছরগুলোর ঋণের মাশুল গুনতে, যা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের বরাদ্দকে করবে সংকুচিত।
সরকারের এ ঋণ বৃদ্ধির মূল কারণ রাজস্ব আয়ের শ্লথগতি। গত পাঁচ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব আয় বেড়েছে মাত্র ৩৫ শতাংশ, সেখানে ঋণের পরিমাণ বেড়েছে ৪২ শতাংশ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে করের টাকায় সরকারের পুরো পরিচালন ব্যয় মেটানো তো দূরের কথা, বেতন-ভাতা, পেনশন ও সুদের টাকা পরিশোধের পর কৃচ্ছ্রসাধন করেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অর্থনীতির পরিভাষায় একে বলা হয় ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’। সরকার যখন নিজের ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেয়, তখন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো বেসরকারি খাতে ঋণ দিতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে মন্থর করে দেয়।
সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সাবেক অর্থ সচিব ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রাজস্ব আয়ে উল্লেখযোগ্য উল্লম্ফন ঘটানোর মতো কোনো বড় প্রশাসনিক সংস্কার এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে বাজেট ঘাটতি অব্যাহত থাকবে এবং সে ঘাটতি পূরণে সরকারকে ঋণের ওপর নির্ভর করতেই হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ ঋণ ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হবে কিনা। যদি ঋণ করে ঘি না খাওয়া হয়, ঋণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প থেকে রিটার্ন নিশ্চিত করা যায় এবং এ ঋণের কারণে যদি বেসরকারি খাত ঋণ পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হয় তাহলে এটি সম্ভব।’
কেবল অভ্যন্তরীণ উৎসই নয়, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অতীতে নেয়া অনেক মেগা প্রকল্পের ‘গ্রেস পিরিয়ড’ বা রেয়াতকাল শেষ হয়ে আসায় এখন মূল ও সুদ—দুই-ই একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতির ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন। যেহেতু বাংলাদেশে বাস্তবায়িত অধিকাংশ অবকাঠামো প্রকল্প স্থানীয় মুদ্রায় আয় করে, তাই ডলারের দাম বাড়ার কারণে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি হচ্ছে।
আগামী তিন অর্থবছরে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের যে প্রক্ষেপণ করা হয়েছে তাতে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার, ২০২৭-২৮ অর্থবছরে ৪২৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার ও ২০২৮-২৯ অর্থবছরে ৪২৭ কোটি ৬০ লাখ ডলারের ঋণ পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বৈদেশিক ঋণের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ বড় অবকাঠামো প্রকল্প, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষায়িত পেশাগত দক্ষতার অনেকটাই বাইরে থেকে আনতে হয়। ফলে এসব খাতে অর্থায়নের জন্য বৈদেশিক ঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মূল উদ্বেগের জায়গা হলো সেই ঋণের সার্ভিসিং বা পরিশোধ সক্ষমতা। আর এ সক্ষমতা নির্ভর করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অবস্থান, ঋণ পরিশোধে রিজার্ভের ওপর চাপের মাত্রা এবং বিনিময় হার পরিস্থিতির ওপর। যদি টাকার অবমূল্যায়ন হয় এবং বৈদেশিক ঋণে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো থেকে আয় মূলত টাকায় আসে, তাহলে ঋণ পরিশোধের প্রকৃত বোঝা আরো বেড়ে যায়। কারণ অধিকাংশ প্রকল্পই সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না।’
ঋণের ক্ষেত্রে আইএমএফ বাংলাদেশকে এখন মধ্যম ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে উল্লেখ করে এ অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘আন্তর্জাতিক ঋণমান সংস্থাগুলোও বাংলাদেশের আউটলুক নেতিবাচক হিসেবে মূল্যায়ন করেছে, এগুলোর বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি অনেক বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে এখন মূল অর্থ ও সুদ—দুইয়েরই পরিশোধ শুরু হচ্ছে, যা সামনের সময়গুলোয় অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ফলে নতুন ঋণ নেয়ার আগে প্রকল্পের অগ্রাধিকার, বাস্তবায়ন ব্যয়ের দক্ষতা, প্রকিউরমেন্টের স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগের বিপরীতে প্রকৃত অর্থনৈতিক রিটার্ন নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে কিছু প্রকল্পে অতিরিক্ত ব্যয় ও দুর্বল সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো সতর্ক হওয়া জরুরি।’
সামষ্টিক অর্থনীতির এ অভ্যন্তরীণ সংকটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে সতর্ক করা হয়েছে যে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম যদি ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে তার বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব পড়বে পরিবহন, কৃষি ও শিল্প খাতে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে মূল্যস্ফীতি তীব্রতর হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর লোকসান ও ভর্তুকির চাপ বাজেট বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করবে, যা প্রকারান্তরে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রয়োজনীয়তাকে আরো বাড়িয়ে দেবে।
সরকারের ঋণনির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও স্বীকার করেছেন। তিনি গতকাল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রোগ্রামিং ও বাজেট কাঠামো এখন একটি পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের প্রচলিত বাজেট পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে বৈশ্বিক বাস্তবতা ও নতুন অর্থনৈতিক চিন্তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ বিশ্ব অর্থনীতির ধরন, বিনিয়োগের পোর্টফোলিও এবং বিনিয়োগের মানদণ্ড দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ বাস্তবতায় দেশের পাবলিক ফাইন্যান্সের বিদ্যমান আর্কিটেকচারেও পরিবর্তন আনা জরুরি।’
কেবল সরকারকে নয়, বেসরকারি খাতে ঋণ দেয়াও ব্যাংকগুলোর প্রধান কাজ হওয়া উচিত। তবে গত দেড় দশকে যে ঋণনির্ভর কাঠামো তৈরি হয়েছে, তা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘এজন্য ধীরে ধীরে একটি নতুন প্রবণতা তৈরি করতে হবে। এ প্রেক্ষাপটে আগামী অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কমানো হয়েছে, যা সামনের বছরগুলোয় আরো কমে নিম্ন পর্যায়ে চলে আসবে।’