খামারে একটি পোল্ট্রি ডিম উৎপাদন করতে ১১ টাকা ৬৪ পয়সার মতো খরচ হয়। কিন্তু খামারিরা ডিম বিক্রি করতে পারছে সাড়ে আট টাকা থেকে সাড়ে ৯ টাকা। এতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের এ কান্না কেউ শোনে না।
মঙ্গলবার (২৫ মার্চ) রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিআইএ) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব বলেন পোল্ট্রি খামারিরা। তারা এ সময় ‘জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠনের দাবি জানান।
বিপিআইএ’র মহাসচিব খন্দকার মো. মহসিন লিখিত বক্তব্যে বলেন, দেশের হাজার হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ডিম পাড়া মুরগি খামারি চরম আর্থিক বিপর্যয় ও হতাশায় নিমজ্জিত। ফেব্রুয়ারি থেকে ডিমের দাম ধারাবাহিকভাবে কমেছে। রমজান মাসে আরো পতন হয়েছে। এতে বিভিন্ন জেলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিরা তাদের ফার্মগেটে ৭ থেকে সাড়ে ৭ টাকা প্রতি পিস ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। যেখানে একটি ডিম উৎপাদন করতে সবমিলিয়ে ১১ টাকা ৬৪ পয়সা খরচ হয়। বিগত বছরের তুলনায় এবার ছোট ও মাঝারি খামারের ডিম উৎপাদন পর্যায়ে ফার্মগেটে মূল্য সর্বকালের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এতে ছোট ও মাঝারি খামারিরা লোকসানের মধ্যে পড়েছেন।
তিনি আরো বলেন, কোনো কোনো স্থানে উল্লেখিত দামেও খামারিরা ডিম বিক্রি করতে পারছেন না। প্রতিদিন খামারে অবিক্রিত ডিম জমে যাচ্ছে এবং উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে ডিম পঁচে যাওয়ার ঝুঁকি থাকছে। ফলে সামনের দিন ডিমের চাহিদার বিপরীতে ঘাটতি তৈরি হবে।
মো. মহসিন বলেন, মুরগির খাবার ও অন্যান্য বাবদ প্রতিদিন যে খরচ হয় সে হিসাবে প্রতি ডিমে একজন ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারির লোকসান দাঁড়ায় ২ টাকা ৫৪ পয়সা। ডিমের দামের এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী দিনে হাজার হাজার খামারি তাদের খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হবে। এরই মধ্যে অনেক ছোট খামারি লোকসানের বোঝা টানতে না পেরে উৎপাদনে থাকা ডিম পাড়া মুরগি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছেন। এমনটি চলতে থাকলে পোল্ট্রি ফার্মিং ও ডিম মুরগির বিপণনের সঙ্গে জড়িত গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ মানুষ কর্ম হারাবেন। আর ডিমের বাজারে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হলে সিজনাল ফরিয়া সিন্ডিকেট ফায়দা লুটার চেষ্টা করবে।
পোল্ট্রি শিল্পের সঙ্গে যুক্তদের রক্ষায় এ সময় বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা, উৎপাদনকারীদের টিকিয়ে রাখা ও ডিমের উৎপাদনের ধারা অব্যাহত রাখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিশেষ তহবিল গঠন করে স্বল্প সুদে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের ব্যবস্থা করা, কৃষির মতো পোল্ট্রি খামারের বিদ্যুৎ বিলে ২০ শতাংশ রিবেট প্রদান ও তার জন্য শর্ত সহজ করা, প্রতি রমজানে যেসব এলাকায় বেশি ডিম উৎপাদন হয় সেখানে প্রাণিসম্পদ, কৃষি বিপণন ও ভোক্তা অধিদপ্তরের সমন্বয়ে গঠিত মনিটরিং টিমের মাধ্যমে নিবন্ধিত খামারিদের ডিম সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা, বিভিন্ন উপকরণের মুল্য বৃদ্ধির বাস্তব পরিপ্রেক্ষিতে ডিম-মুরগির সরকার ঘোষিত যৌক্তিক দাম পুনর্নির্ধারণ, ডিমের উৎপাদন খরচ কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান, পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ‘জাতীয় পোল্ট্রি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড’ গঠনের দাবি জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে খামারি টিআইএম জাহিদুর রহিম জোয়ারদার বলেন, ২০০৭ সাল থেকে ডিম উৎপাদন করছি। শুরু থেকে এখন পর্যন্ত লাভের মুখ দেখিনি। ব্যাংক ঋণ, খাদ্য, ওষুধ এসবের বিল দিতে দিতে আমরা ঋণী হয়ে যাই। যখন দাম কমে যায় তখন খাবার ও ওষুধের দামই উঠে আসে না। যখন একটু ভালো দাম পাই তখনকার লাভের অংশ দিয়ে ব্যাংকের ঋণ ও অন্যান্য খরচ টানতে না টানতে আবারো দামের পতন হয়ে যায়। এভাবেই খামারিরা চলছে। বিদ্যুতের দাম, খাবার-ওষুধের দাম বেড়েছে। ব্যাংকের সুদও বেড়েছে। সবমিলিয়ে খামারিরা ভালো নেই।
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার ক্ষুদ্র খামারি বিলকিস আহমেদ বলেন, আমরা বেশিরভাগ সময়ই ঘাটতির মধ্যে আছি। দুই হাজার মুরগির জন্য শ্রমিক খরচ বাদ দিয়েই মাসে এক লাখ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বিক্রির সময় আমরা দাম পাই না। গতকালও নরসিংদীতে ৮ টাকা ৬০ পয়সা প্রতিপিস ডিম বিক্রি করেছি। এ দামে বিক্রি করে খাবার খরচই উঠছে না। ছোট খামারিদের কান্না কেউ দেখে না। সরকার যেন এ শিল্পে নজর দেন এবং ক্ষুদ্র খামারিদের ভর্তুকির মাধ্যমে টিকিয়ে রাখেন সে দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি শাহ হাবিবুল হক, সিনিয়র সহ-সভাপতি খন্দকার মনির আহমেদ, মহাসচিব খন্দকার মো. মহসিন, ট্রেজারার মিজানুল ইসলাম খান, যুগ্ম মহাসচিব নুরুল মোর্শেদ খান, প্রচার সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য মাহবুব আলম উপস্থিত ছিলেন।