দেশে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সাফল্য পেয়েছে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবা (এমএফএস)। মোবাইল ব্যাংকিং হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এ সেবায় যুক্ত হয়েছেন ১৪ কোটি ৫৮ লাখ গ্রাহক। প্রতি মাসে তারা এখন গড়ে দেড় লাখ কোটি টাকারও বেশি লেনদেন করছেন। তবে এ লেনদেনের ৮৫ শতাংশই এখনো কেবল অর্থ স্থানান্তর তথা ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে মার্চেন্ট পেমেন্ট বা কেনাকাটায় বিল পরিশোধ হচ্ছে মোট লেনদেনের কেবল সাড়ে ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএফএস লেনদেন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এ হতাশাজনক চিত্র পাওয়া যায়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমএফএসসহ ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থাগুলো চালু হয়েছিল মানুষকে নগদবিহীন লেনদেনে অভ্যস্ত করে তুলতে। কিন্তু এক যুগ পার হয়ে গেলেও এখনো এসব সেবা দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবেই বেশি ব্যবহার হচ্ছে। বিপরীতে মানুষের মধ্যে নগদ টাকার চাহিদা না কমে উল্টো বেড়েই চলেছে। দেশব্যাপী নগদবিহীন লেনদেনের অবকাঠামো গড়ে না ওঠা, রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার মানসিকতা ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত কালো টাকার প্রভাবের কারণেই মার্চেন্ট পেমেন্ট জনপ্রিয় হচ্ছে না বলে তাদের অভিমত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে এমএফএসে লেনদেন হয়েছে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্যাশ আউট হয়েছে ৪৪ হাজার ৫৪৭ কোটি, ক্যাশ ইন হয় ৩৮ হাজার ৭৬২ কোটি ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন হয়েছে ৪৩ হাজার ৭০২ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মোট লেনদেনের ৮৫ দশমিক ৪৯ শতাংশ অর্থই উত্তোলন কিংবা পাঠানো হয়েছে।
বিপরীতে মার্চেন্ট পেমেন্ট তথা কেনাকাটায় লেনদেন হয়েছে মাত্র ৬ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা। সে হিসাবে এমএফএস-ভিত্তিক মোট লেনদেনের মাত্র ৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে কেনাকাটায়। এর বাইরে বেতন পরিশোধে ৩ দশমিক ৩৯ শতাংশ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধে ২ দশমিক ৩০ শতাংশ, মোবাইল টকটাইম কেনায় দশমিক ৬৯ শতাংশ এবং সরকার থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে টাকা স্থানান্তরে দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ অর্থ লেনদেন হয়েছে। অর্থাৎ এমএফএস সেবা নগদবিহীন লেনদেনে অগ্রণী ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও তা এখনো টাকা পাঠানো ও তোলাতেই সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে।
দেশের মানুষের মধ্যে নগদ টাকা ঘরে রাখা ও নগদে লেনদেন বাড়ার বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যেও উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা মূল্যের ছাপানো নোট ব্যাংক খাতের বাইরে রয়েছে। অর্থনীতির আকার ও লেনদেন পরিস্থিতির বিচারে এ পরিমাণ নগদ অর্থ বিশ্বের বেশির ভাগ দেশের তুলনায়ই বেশি।
সম্প্রতি একাধিক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুরও নগদ অর্থের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কেবল ক্যাশ ম্যানেজমেন্টের জন্য প্রতি বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। নতুন টাকা ছাপানো, বিতরণ, সংরক্ষণ, পুরনো টাকা ফেরত নেয়া ও পোড়ানোতে এ অর্থ ব্যয় হয়। আবার ক্যাশলেস না হওয়ার কারণে প্রতি বছর সরকারের রাজস্ব লোকসান হচ্ছে অন্তত দেড় লাখ কোটি টাকা। এসব অপব্যয় ও ক্ষতি কমিয়ে আনতে হলে অবশ্যই ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে হবে।’
এমএফএস লেনদেনে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় উত্তোলন কিংবা পাঠানোয়। প্রতি হাজার টাকা উত্তোলনে ব্যয় হয় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা। এরপরও এ মাধ্যম এখনো মূলত অর্থ স্থানান্তরের মাধ্যম হিসেবেই ব্যবহার হয়ে আসছে। এমএফএস খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারাও চান মানুষ নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন বাড়াক। তবে অবকাঠামোগত দুর্বলতা, সরকারি নজরদারির অভাব ও ব্যবসায়ীদের অনাগ্রহের কারণে নগদবিহীন লেনদেন আশানুরূপ হারে বাড়ছে না।
ক্যাশলেস পেমেন্টে গ্রাহককে অনুপ্রাণিত ও অভ্যস্ত করা গেলে গ্রাহক, মার্চেন্ট, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ সব পক্ষের জন্যই সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি হবে বলে মনে করেন বিকাশের চিফ কমার্শিয়াল অফিসার আলী আহম্মেদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এমএফএসের মাধ্যমে পেমেন্ট বাড়লে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতি উপকৃত হতো। কারণ বাংলাদেশের আট কোটিরও বেশি মানুষের এখন এমএফএস অ্যাকাউন্ট আছে। এ গ্রাহকদের বড় অংশ ডিজিটাল লেনদেনে অভ্যস্ত। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে দেশের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যৌথ অংশীদারত্বের মাধ্যমেই ডিজিটাল পেমেন্টের সম্প্রসারণ সম্ভব।’ ডিজিটাল পেমেন্ট ক্যাশলেস অর্থনীতির যাত্রাপথের ভিত্তি মজবুত করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন তিনি।
বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা সালাহউদ্দীন। গতকাল তিনি পুরান ঢাকার বিখ্যাত একটি মিষ্টির দোকানে কেনাকাটা করেন। বিল মেটাতে বিকাশ অ্যাপ খুলে কিউআর স্ক্যান করতে চাইলে দোকানদার জানালেন, তাদের দোকানে এমএফএস কিংবা অনলাইন পেমেন্টের কোনো ব্যবস্থা নেই। নগদ ছাড়া অন্য কোনো মাধ্যমে তারা বিল নেন না। বরং পাশের একটি এজেন্ট থেকে টাকা ক্যাশ আউট করে এনে বিল পরিশোধের পরামর্শ দেন তিনি। এমএফএসে বিল না নেয়ার কারণ জানতে চাইলে দোকানদার বলেন, ‘পণ্য প্রস্তুতকারক ও সরবরাহকারীদের এখনো নগদ টাকাই দিতে হয়। এমএফএসের টাকা তারা নিতে চান না। তাছাড়া এমএফএস ব্যবহারে বাড়তি ভ্যাট দেয়ার ঝামেলা তো আছেই।’
গত অর্থবছরেও এমএফএস লেনদেনের খুব সামান্য অংশই ব্যয় হয়েছে কেনাকাটায়। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এমএফএসে লেনদেন হয় মোট ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ক্যাশ ইন, ক্যাশ আউট ও ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে লেনদেন হয়েছে ১৫ লাখ ৬৯ হাজার ২৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ মোট অংকের ৮৬ দশমিক ৩৩ শতাংশই হয় এ তিন উপায়ে। বিপরীতে মার্চেন্টে লেনদেন হয় ৮৬ হাজার ৪৭৬ কোটি টাকা। মোট লেনদেনের মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে কেনাকাটায়।
ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে এমএফএসে লেনদেনের যোগ্য প্রায় ১৪ লাখ মাইক্রো-মার্চেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে ৭০ শতাংশের বেশি মার্চেন্ট এখনো পেমেন্ট লেনদেনের জন্য এমএফএস ব্যবহার করছে না। সব ধরনের লেনদেনের জন্য বাংলা কিউআর উদ্ভাবন করা হলেও জনগণের কাছে সেটি জনপ্রিয় করা যায়নি। এছাড়া বাংলাদেশে এখনো ইন্টারঅপারেবল কোনো গেটওয়ে গড়ে ওঠেনি। ফলে অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকরা চাইলেও কেনাকাটায় এমএফএস ব্যবহার করতে পারে না।
মার্চেন্টদের নগদবিহীন অর্থনীতিতে নিয়ে আসতে শিগগির ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট গেটওয়ে তৈরি করা দরকার বলে মনে করেন ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মামদুদুর রশীদ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ভারতের ইন্টারঅপারেবল জাতীয় পেমেন্ট গেটওয়ে ইউপিআই রয়েছে। আমাদের দেশে বাংলা কিউআর চালু করা হলেও দুর্ভাগ্যবশত তা জনপ্রিয় করা যায়নি। একটি জাতীয় ইন্টারঅপারেবল পেমেন্ট গেটওয়ে থাকলে মার্চেন্টের ব্যবহার অনেকাংশেই বেড়ে যেত। এর মাধ্যমে সহজ, দ্রুত ও কম খরচে লেনদেন করা যেত। আবার অনেক ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র মার্চেন্ট বিশেষ করে সিএমএসএমই খাতের উদ্যোক্তারা কর বোঝা এড়ানোর জন্য আনুষ্ঠানিক পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার এড়িয়ে চলে। সরকার তাদেরকে ৪-৫ বছরের করমুক্তি দিয়ে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। বর্তমানে প্রচলিত মার্চেন্ট অনবোর্ডিং নিয়মাবলিও পুনর্বিবেচনা করে আরো সহজ ও সরল করা প্রয়োজন। এসব উপায়ে সরকার লক্ষাধিক কোটি টাকা এমএফএস অথবা ডিজিটাল লেনদেনের আওতায় নিয়ে আসতে পারে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে বাংলা কিউআর কোডকে জনপ্রিয় করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। সম্প্রতি এক সেমিনারে তিনি বলেছেন, ‘কিউআর কোড নিয়ে বাংলাদেশে তেমন কোনো কাজই হয়নি। অথচ ভুটানোর মতো দেশও সিঙ্গেল নেশন কিউআর কোড সিস্টেম তুমুল জনপ্রিয়। পৃথিবীর সব দেশেই কিউআর কোড ব্যাপকভাবে ব্যবহার হচ্ছে। আমরা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে অনুরোধ পাঠিয়েছি, প্রত্যেকটি ব্যবসার অনুমোদনের সময় কিউআর কোড যেন বাধ্যতামূলক করা হয়। বাংলাদেশকে ক্যাশলেস করতে হলে অবশ্যই কিউআর কোডে যেতে হবে।’