মৌলভীবাজারে অবাধে টিলা কেটে চলছে মাটি বিক্রি

পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে মৌলভীবাজারে অবাধে চলছে পাহাড়-টিলা কাটা। বিক্রি হচ্ছে টিলার মাটি। কেউ বানাচ্ছেন বসতভিটা, আবার কেউ কেউ তৈরি করছেন রিসোর্ট কিংবা বাগান। এতে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। আবাসন ও খাদ্য সংকটে পড়ছে বন্যপ্রাণী।

পরিবেশ আইন লঙ্ঘন করে মৌলভীবাজারে অবাধে চলছে পাহাড়-টিলা কাটা। বিক্রি হচ্ছে টিলার মাটি। কেউ বানাচ্ছেন বসতভিটা, আবার কেউ কেউ তৈরি করছেন রিসোর্ট কিংবা বাগান। এতে উজাড় হচ্ছে বনাঞ্চল। আবাসন ও খাদ্য সংকটে পড়ছে বন্যপ্রাণী।

মাঝেমধ্যে প্রশাসনের দায়সারা দুএকটি অভিযান হলেও ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে প্রভাবশালীরা। এ অবস্থায় পরিবেশ প্রকৃতি ধ্বংসের পাশাপাশি বাড়ছে পাহাড়ধসের আশঙ্কা। সম্প্রতি টিলা ধসের পৃথক দুটি ঘটনায় তিন শিশুসহ চারজনের মৃত্যু হয়। তার পরও ঝুঁকিপূর্ণ বসতি ও পাহাড় কাটা বন্ধ হচ্ছে না। প্রকাশ্যে বিভিন্ন স্থানে টিলা কেটে মাটি বিক্রি করা হলেও এ তথ্য জানা নেই বলে দাবি জেলা প্রশাসনের।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা বাগান, উত্তরভাগ ইউনিয়নের যুদুরগুল এলাকার খাসের টিলা, কমলগঞ্জ উপজেলার কালেঙ্গা, কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা, ভাটেরা ও বরমচাল এবং শ্রীমঙ্গলের মোহাজেরাবাদসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ি টিলা কাটা হচ্ছে। টিলা কেটে তৈরি হচ্ছে হোটেল-রিসোর্ট।

এর মধ্যে জুড়ী উপজেলার সাগরনাল, গোয়ালবাড়ি, জামকান্দি, কচুরগুল, লাঠিটিলা, ভজিটিলা, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আথানগিরি এবং বড়লেখা উপজেলার ডিমাই এলাকায় সবচেয়ে বেশি টিলা কাটা হচ্ছে।

বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের কেছরিগুল, গঙ্গারজল, দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউপির বোবারথল, মোহাম্মদনগর, ছোটলেখা, ঘোলসা, চণ্ডীনগর, মুড়াউল, অফিস বাজার, উত্তর শাহবাজপুর ইউপির বড়-আইল, নান্দুয়া, পূর্ব বাণীকোনাসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে টিলা কাটা হচ্ছে।

সম্প্রতি রাজনগর উপজেলার করিমপুর চা বাগানে গিয়ে দেখা যায়, দিনেদুপুরে টিলার মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ট্রাকে করে। এই চা বাগানের মুসলিম লাইন ও মাদ্রাজি লাইনে টিলা কেটে নির্মাণ করা হয়েছে বসতি। টিলার নিচে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে অনেক পরিবার। স্থানীয়রা জানায়, ওই টিলার মালিক রাজনগর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলাল মিয়া। টিলার মাটি তিনিই কেটে বিক্রি করছেন। এ ব্যাপারে আলাল মিয়ার কথা বলার জন্য তার মোবাইল ফোনে কল দেয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি।

সদর উপজেলার আপার কাগাবলা ইউনিয়নের পাহাড়ি জনপদ আথানগিরিতে গিয়ে দেখা যায়, উঁচু টিলার ক্ষতবিক্ষত বুক জুড়ে সদ্য মাটি কেটে নেয়ার চিহ্ন। টিলার বিশাল এলাকাজুড়ে লাল মাটির বুক বেরিয়ে আছে। প্রতিদিন টিলার মাটি কেটে নেয়া হচ্ছে। লাল মাটির টিলার দক্ষিণ পাশে আরো দুটি টিলা কাটা হয়েছে। এই টিলা দুটির নিচে বসতি রয়েছে। ফলে টিলার মাটি ধসে যেকোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পশ্চিম আথানগিরিতেই নিয়মিত বিভিন্ন টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। এতে অচিরেই এ এলাকার টিলাগুলো নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। এসব টিলার মধ্যে সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলা আছে। মাঝেমধ্যে প্রশাসন অভিযান চালালে দু-একদিন বন্ধ থাকার পর আবার টিলা কাটা শুরু হয়ে যায়।

জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম টিলার মাটি কেটে বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টি দেখে আমরা ব্যবস্থা নেব।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুম এলেই নির্বিচারে চলে পাহাড় কাটা। আর বর্ষা মৌসুমে ঘটে পাহাড়ধসের ঘটনা। তখন বর্ষা মৌসুমজুড়ে থাকে প্রাণহানি ও সম্পদহানির চরম উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা। পাহাড়খেকো চক্র প্রথমে গাছ ও বনাঞ্চল উজাড় করে। তারপর সুযোগ বুঝে ওই ন্যাড়া পাহাড়ি টিলার মাটি কাটতে শুরু করে। প্রশাসনের নিয়মিত তত্পরতা না থাকায় এসব এলাকায় পাহাড় টিলায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে অনেক মানুষ।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুন বড়লেখা উপজেলার উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের আয়েশাবাগ চা বাগানে টিলা ধসে একজনের মৃত্যু হয়। একই দিন পৃথক ঘটনায় বড়লেখা সদর ইউনিয়নের কেছরিগুল গ্রামে টিলা ধসে আহত হন কয়েকজন। এর আগে ২৬ মার্চ কুলাউড়ার ভাটেরায় টিলা ধসে তিন শিশু মারা যায়। ২০১৭ সালের ১৭ জুন রাতে বড়লেখা উপজেলার ডিমাই এলাকায় টিলা ধসে মৃত্যু হয় মা ও মেয়ের। এছাড়া ২০১৪ সালে বড়লেখা উপজেলার শাহবাজপুর এলাকায় টিলা ধসে একই পরিবারের তিনজন মারা যান। এত মৃত্যুর পরও থামছে না টিলা কাটা।

এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণভাবে যারা পাহাড় টিলায় বসবাস করছে তাদের নিরাপদে সরে যেতে গত এক সপ্তাহ আমরা প্রচারণা চালিয়েছি। যারা আছে তাদের সরাতে আমরা সচেষ্ট আছি।

পরিবেশ কর্মী নুরুল মোহাইমীন মিল্টন বলেন, অবাধে পাহাড় টিলা কাটার কারণে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে ভূ-মানচিত্রও। প্রকৃতি পরিবেশ বাঁচাতে এখনই ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সরকারি বা ব্যক্তিমালিকানাধীন টিলা কোনোটিই কাটার বিধান নেই। শুধু জনস্বার্থে টিলা কাটতে হলে পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়ে কাটা যাবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০) ৬-এর খ ধারা অনুযায়ী টিলা কাটা একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। এক্ষেত্রে শাস্তি হিসেবে জেল-জরিমানা দুটোরই বিধান রয়েছে।

মৌলভীবাজার পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা খবর পেলেই ঘটনাস্থলে অভিযান পরিচালনা করি। মামলা দায়ের করি। রাজনগরের করিমপুর চা বাগানে টিলা কাটার ঘটনায় উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আলাল মিয়া, চা বাগানের ব্যবস্থাপক ও উপজেলার গয়ঘর গ্রামের সুহেল আহমদ এ তিনজনকে আইনি নোটিস পাটিয়েছি। ১৯ জুন সিলেটে শুনানির দিন ধার্য ছিল কিন্তু বন্যা পরিস্থিতর কারণে সেটি স্থগিত করা হয়।

আরও