দেশের প্রথম প্রজন্মের উদ্যোক্তা হিসেবে আশির দশকে দায়িত্ব পালন করেছেন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি পদেও। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হিসেবেও চারবার দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। সম্প্রতি বয়োজ্যেষ্ঠ এ উদ্যোক্তা কথা বলেছেন বণিক বার্তার সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইমামূল হাছান আদনান
সাউথইস্ট ব্যাংক কেমন আছে?
বর্তমানে স্থিতিশীল, সুসংহত ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে সাউথইস্ট ব্যাংক। দেশের ব্যাংক খাতের সামগ্রিক প্রেক্ষাপট ও অস্থিরতার মধ্যেও আমাদের মূলধনের ভিত্তি এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত সুদৃঢ়। সাউথইস্ট ব্যাংকের ওপর আমানতকারীদের আস্থা অটুট থাকার কারণেই এ অবস্থান ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জিং সময়েও আমরা বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছি। বেশ দক্ষতার সঙ্গে ঝুঁকি মোকাবেলা করায় আমাদের মূলধন ও ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের অনুপাতও (সিআরএআর) ভালো অবস্থানে আছে। বর্তমানে আমাদের সিআরএআর প্রায় সাড়ে ১৩ শতাংশ। শেয়ারবাজারেও আমাদের ভালো অবস্থান তৈরি হয়েছে। ২০২৫ সালে আমাদের শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২ টাকা ৫০ পয়সা, শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য উন্নীত হয়েছিল ২৫ টাকা ৭০ পয়সায়। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক বিষয় হলো, আমাদের খেলাপি ঋণের (এনপিএল) হার কমে ৭ দশমিক ৫১ শতাংশে নেমে এসেছে। বিপরীতে আমাদের কোনো সঞ্চিতি ঘাটতি নেই।
তবে আমরা কেবল ব্যবসায়িক মুনাফার পেছনে অন্ধভাবে ছুটছি না; আমাদের মূল অগ্রাধিকার হলো সম্পদের গুণগত মান রক্ষা করা এবং সুশাসন নিশ্চিত করা। আমরা প্রতিটি বিনিয়োগ ও লেনদেনে স্বচ্ছতা বজায় রাখছি। ফলে সাউথইস্ট ব্যাংক চলমান অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নিজেদের সুদৃঢ় অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।
প্রতিষ্ঠার তিন দশক পেরিয়ে ব্যাংকটি কতটুকু এগোল?
১৯৯৫ সালে যাত্রা শুরুর পর গত তিন দশকে সাউথইস্ট ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। যাত্রা শুরুর পর থেকে ধাপে ধাপে এগিয়ে বর্তমানে আমাদের রয়েছে বিশাল নেটওয়ার্ক। ব্যাংকিং সেবাকে আক্ষরিক অর্থেই মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে আমরা ১৩৭টি শাখা, ২২টি উপশাখা, ৫৪৯টি এটিএম ও ১৬০টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছি। বর্তমানে আমাদের আমানত স্থিতি প্রায় ৪৫ হাজার ৭০০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন খাতে ঋণ স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার ২০০ কোটি টাকায়।
বৈদেশিক বাণিজ্যেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে আমাদের। প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ আফ্রিকায় একমাত্র সাউথইস্ট ব্যাংকের নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউজ রয়েছে। এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাপিটাল সার্ভিসেস ও মোবাইল আর্থিক সেবা ‘টেলিক্যাশ’ আমাদের সেবার পরিধিকে আন্তর্জাতিক ও আধুনিক মানে উন্নীত করেছে। আমাদের কর্মীদের প্রায় ২২ শতাংশই নারী এবং পর্ষদেও নারী পরিচালক রয়েছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে আমরা পরিচালনা করছি ‘সাউথইস্ট ব্যাংক গ্রিন স্কুল’। এ স্কুলে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং শিক্ষকদের সবাই নারী।
উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার সময় যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা কতটা পূরণ হলো?
দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করায় আমার মনে হয়েছিল, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে গতিশীল করতে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের কোনো বিকল্প নেই। সেই তাড়না থেকেই আমরা লাইসেন্সের জন্য আবেদন করি। সে সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন বাণিজ্যিক ব্যাংক খুলতে চাই। তখন তিনটি স্বপ্নের কথা বলেছিলাম—শিক্ষিত যুবকদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সরকারি কোষাগারে নিয়মিত রাজস্ব দিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্মানজনক ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ নিশ্চিত করা। তিন দশক পর আমরা কেবল হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানই করিনি, বরং দেশের অন্যতম শীর্ষ করদাতা ব্যাংক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছি। বিনিয়োগকারীরাও বছরের পর বছর আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন।
আমাদের স্লোগানই হলো ‘একটি দূরদর্শী ব্যাংক’। সেই দূরদর্শিতাকে ধারণ করেই আমরা প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ব্যাংকিং সেবাকে শহরের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামগঞ্জে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। তবে স্বপ্ন দেখার তো শেষ নেই। সময়ের সঙ্গে স্বপ্নের পরিধিও আরো বিস্তৃত হয়। এখন আমাদের লক্ষ্য চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিশ্বমানের ‘স্মার্ট ব্যাংকিং’ সেবা নিশ্চিত করা এবং প্রত্যেক গ্রাহকের দোরগোড়ায় আধুনিক প্রযুক্তি পৌঁছে দেয়া।
চেয়ারম্যান হিসেবে পর্ষদে ফিরে গত দেড় বছরে সাউথইস্ট ব্যাংকে কী ধরনের সংস্কার আনলেন?
গত দেড় বছর অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং ও পুনর্গঠনের সময় ছিল। চেয়ারম্যান হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব গ্রহণের পর দেখলাম, আমার নিজ হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানটি নানা জটিলতায় জর্জরিত। সেই সংকটময় মুহূর্তে আমার মূল লক্ষ্য ছিল ব্যবসায়িক নৈতিকতা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনা। দায়িত্ব নিয়েই আমি আমানতকারীসহ ভালো-মন্দ সব গ্রাহককে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দিয়ে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছি। অনেকেই আমাদের ডাকে সাড়া দিয়ে এগিয়ে এসেছেন। আমাদের ম্যানেজমেন্ট ধৈর্য ও আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের সমস্যাগুলো শুনে সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিচালনা পর্ষদে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কমিটিগুলোর কার্যকারিতা বাড়িয়েছি। একই সঙ্গে ব্যাংকের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার জবাবদিহি শক্তিশালী করা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ অডিট ও কমপ্লায়েন্স ফাংশনকে আরো স্বাধীন ও শক্তিশালী করেছি, যাতে কোনো স্তরেই অনিয়মের সুযোগ না থাকে।
এছাড়া বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংকের আইটি ও সাইবার সিকিউরিটি অবকাঠামো ব্যাপকভাবে আপগ্রেড করেছি। ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের অযাচিত ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করে তা উল্লেখযোগ্য হারে কমানোর ব্যবস্থা করেছি। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্কতা ও স্বচ্ছতা অবলম্বন করা হচ্ছে। খেলাপি ঋণ আদায়েও আমরা এখন অত্যন্ত কঠোর এবং আপসহীন। ব্যাংকিং সেবাকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন শাখা ও এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট খোলার পাশাপাশি পুরনো শাখাগুলোকে কৌশলগত স্থানে স্থানান্তর করেছি। একই সঙ্গে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে সর্বস্তরে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। সব মিলিয়ে গত দেড় বছরে আমরা সাউথইস্ট ব্যাংককে একটি স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের শক্তিশালী ভিত্তি স্থাপন করেছি।
আগামী দিনগুলোতে আর কী কী পরিবর্তন আনতে চান?
আগামী দিনগুলোতে আমাদের প্রধান লক্ষ্য হবে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যাংকিং সিস্টেম গড়ে তোলা। বর্তমান সরকারের ‘ক্যাশলেস সোসাইটি’ গড়ার লক্ষ্য রয়েছে। আমি চাই সাউথইস্ট ব্যাংক ক্যাশলেস সোসাইটি বিনির্মাণে দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে নেতৃত্ব দেবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমরা বেশকিছু সুনির্দিষ্ট পরিবর্তন আনতে যাচ্ছি। আমাদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও কার্ড অবকাঠামোকে এমন এক শক্তিশালী পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যাতে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে বসেই একজন গ্রাহক নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দে সাউথইস্ট ব্যাংকে লেনদেন করতে পারেন। বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী আমরা কাস্টমাইজড সেবা প্রদান নিশ্চিত করতে চাই। এছাড়া আমি ব্যাংকে এমন একটি কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই, যেখানে ব্যক্তিগত পরিচয় নয়; বরং যোগ্যতা, সততা ও পারফরম্যান্সই হবে পদোন্নতি ও মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছেন?
করপোরেট গভর্ন্যান্স নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা অনেক আছে। তবে আমি বিশ্বাস করি, পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের মধ্যে পরিষ্কার সীমারেখা থাকা জরুরি। আমরা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দিচ্ছি। বিনিয়োগের প্রস্তাব বাছাই থেকে শুরু করে নিয়োগ প্রক্রিয়া—সব ক্ষেত্রেই একটি শক্তিশালী চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স সিস্টেম চালু করা হয়েছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতে আমরা নিয়মিত ইন্টারনাল ও এক্সটারনাল অডিট রিপোর্ট কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। কোনো অনিয়মের ব্যাপারে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’।
দায়িত্ব শেষে সাউথইস্ট ব্যাংককে কোথায় রেখে যেতে চান?
আমার স্বপ্ন হলো সাউথইস্ট ব্যাংক হবে ‘নিরাপদ ব্যাংকিং’ ও গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রে এ দেশের প্রতিটি মানুষের প্রথম পছন্দ। সময়ের সঙ্গে গ্রাহকের চাহিদা ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোও পরিবর্তিত হয়। তাই যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সেবাগুলোকে আরো আধুনিক ও সহজলভ্য করে প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিচ্ছি। ব্যাংক খাতের যেকোনো মানদণ্ডেই সাউথইস্ট ব্যাংক যেন শীর্ষে অবস্থান করে, সেটাই আমার মূল লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করি ‘আকাশই একমাত্র সীমারেখা’।