বাংলাদেশ ও চীনের যৌথ বিনিয়োগে ২০১৭ সালে পটুয়াখালীতে নির্মাণ করা হয় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প-১। এর দুই বছর পর ২০১৯ সালে এর পাশেই নির্মাণ করা হয় আরপিসিএল-নরিনকো ইন্টারন্যাশনাল পাওয়ার লিমিটেডের (আরএনপিএল) তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র। গত বছর চালু হয়েছে বরগুনার তালতলী পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প-২। কয়লাভিত্তিক এ তিন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য আনা জ্বালানি নৌপথে খোলা জাহাজে পরিবহন ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে নির্গত বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পরিবেশ ও প্রতিবেশ। হুমকির মুখে পড়েছে পায়রা, আন্ধারমানিক, রাবনাবাদ, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর জীববৈচিত্র্য। নদীতে মাছ উৎপাদন কমেছে। অন্যদিকে নদীর পানির গুণগত মান পরীক্ষার জন্য বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরে থাকা একমাত্র ল্যাবটি বন্ধ প্রায় পাঁচ বছর। গুণগত মান পরীক্ষা ছাড়াই নদীর পানি ব্যবহার করছে এখানকার কোটি মানুষ।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া ও বরগুনার তালতলীতে কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জ্বালানি পরিবহন ও বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট পরিবেশ দূষণে জীববৈচিত্র্য, বনাঞ্চল ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি নিয়ে শঙ্কিত উপকূলের বাসিন্দারা। পরিবেশবিদরা বলছেন, কয়লা থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড, বিষাক্ত সালফার, সিসা ও ভারী ধাতু নিঃসরণের ফলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি। হুমকির মুখে পড়েছে পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় আন্ধারমানিক, পায়রা, রাবনাবাদ ও বরগুনার বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর জীববৈচিত্র্য। এসব নদীতে এখন আর দেখা মিলছে না ইলিশসহ দেশী প্রজাতির কোনো মাছের। ফলে চরম বিপাকে পড়েছে কয়েক হাজার মৎস্যজীবী পরিবার। বাধ্য হয়ে তারা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশ খুব দূষণ সংবেদনশীল। কোনো কারণে একবার যদি মা-ইলিশ এ অঞ্চলে ডিম পাড়ার পরিবেশ না পায় তাহলে তার পরের প্রজন্ম এ এলাকায় আর কখনো ডিম পাড়তে আসবে না। ফলে এ অঞ্চল থেকে ইলিশ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। এছাড়া ইলিশের অভয়াশ্রম আন্ধারমানিক নদীতে এখন অন্য কোনো মাছও তেমন পাওয়া যায় না।
ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের আমতলী ও তালতলী উপজেলার সমন্বয়ক আরিফুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর থেকে পায়রা নদী দিয়ে জাহাজে কয়লা আনা হয়। এটি কোনো বাণিজ্যিক রুট না হওয়ায় এ জাহাজের কারণে প্রতিনিয়ত জেলেদের জাল কাটা পড়ছে। জেলেরা জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এছাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের পর থেকে এ অঞ্চলের নদ-নদীতে আগের তুলনায় অনেক কম মাছ পাওয়া যাচ্ছে। এতে অনেক জেলেই পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।’
সম্প্রতি চম্পাপুর ইউনিয়নের দেবপুর গ্রামে পটুয়াখালী ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সুপারথার্মাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের (আশুগঞ্জ) জমি ভরাটের কাজ করার জন্য দেবপুর খালের ওপর একটা বাঁধ দিয়ে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। হাফিস প্যাদার খালের ওপর বাঁধ দিয়ে সীমানা দেয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। এছাড়া অসংখ্য ছোট ছোট খাল ও জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণকৃত অধিকাংশ জমি ছিল তিন ফসলি। একসময় ধানখালী ও চম্পাপুর ইউনিয়ন তরমুজের জন্য বিখ্যাত ছিল। এখানে উৎপাদিত তরমুজ ঢাকাসহ সারা দেশে পৌঁছে যেত। এছাড়া আউশ, আমন ও বোরো তিন মৌসুমে ধান, রবিশস্য ও বিভিন্ন সবজি উৎপাদন হতো। এসব আবাদি জমি প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করার ফলে কলাপাড়ায় কৃষিজমির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমে গেছে। মৌসুমি কৃষি শ্রমিকরা কাজ হারিয়েছেন। কৃষি বৈচিত্র্য ও উৎপাদন কমেছে।
বরিশাল বিভাগীয় পরিবেশ ও জনসুরক্ষা ফোরামের সমন্বয়কারী শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ‘কলাপাড়ায় মেগা প্রকল্পের কারণে ইলিশ প্রজননসহ প্রাণ-প্রকৃতিরও ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী রাখাইনদের ২৩৯ বছরের পুরনো ছয়ানীপাড়া পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়েছে।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুতাসিম বিল্লাহ বলেন, ‘এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় খুবই উন্নত। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এটির কারণে পরিবেশগত সমস্যাসহ নানাবিধ স্বাস্থ্যঝুঁকি রয়েছে।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কয়লা পোড়ানোর ফলে সালফার ডাই-অক্সাইড বা কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত হয়, সেটি খুবই গুরুত্বসহ রিমুভ করতে হবে। তা না হলে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশ এলাকার পানি-মাটিসহ পুরো পরিবেশেরই ক্ষতি হবে।’
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের ডিন প্রফেসর ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, ‘পটুয়াখালীর কলাপাড়ার পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও বরগুনার তালতলীর তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র ইকোলজিক্যালি সেনসিটিভ একটি জায়গায়। এ রকম স্থানে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করাই উচিত হয়নি। এতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ১৪ কিলোমিটারের মধ্যে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। বিশেষ করে কয়লা থেকে যে সালফার নিঃসরণ হবে সেটি পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দ্বিতীয় সুন্দরবন খ্যাত টেংরাগিরি বনের জীববৈচিত্র্য ও বন ধ্বংস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে যে শব্দদূষণ হয় এর ফলে এ এলাকায় পাখির অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। আবহাওয়ারও পরিবর্তন দেখা দেবে।’
পরিবেশ-প্রতিবেশের ক্ষতি হচ্ছে না বলে দাবি করছেন পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শাহ আব্দুল হাসিব। তিনি বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্র মনিটরিং করে। বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে ৯৯ শতাংশ ছাই সরানো হয় নিয়মিত। এছাড়া ৯৩-৯৪ শতাংশ সালফার সরানো হয়।’
আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষণ রোধের দাবি করা হলেও মূলত প্রযুক্তির মাধ্যমে দূষণ সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ কমানো যায় বলে মনে করেন অনেক গবেষক।
এছাড়া ক্রমাগত নদীদূষণের মধ্যেও বিপুল পরিমাণ মানুষের নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা প্রদানে কোনো উদ্যোগ নেই। বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভাগীয় কার্যালয়ে একটি ল্যাব নামমাত্র স্থাপন করলেও তার জন্য আনা যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়ে গেছে প্যাকেটবন্দি অবস্থায়ই। পানির গুণগত মান পরীক্ষা না করার ফলে পটুয়াখালী জেলার উপকূলীয় আন্ধারমানিক, পায়রা, রাবনাবাদ ও বরগুনার বিষখালী, পায়রা, বলেশ্বরসহ বরিশাল বিভাগের মধ্য দিয়ে বয়ে চলা মেঘনা, কালাবদর, তেঁতুলিয়া, কীর্তনখোলা, হরিণঘাটা, ইলিশা, আড়িয়লখাঁ, পায়রা, রাবনাবাদ, আগুনমুখা, বুড়ীশ্বর, গলাচিপা, বলেশ্বরী, জয়ন্তী, বিশখালী ও কচা, কারখানা, সন্ধ্যা, সুগন্ধা, নয়াভাঙ্গলী ও শাহবাজপুর চ্যানেলের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে রয়েছে।
বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল বিভাগীয় অফিসে ২০১০ সালে প্রথম ল্যাব স্থাপন করা হয়। ২০২০ সালে নথুল্লাবাদে নতুন ভবনে অফিস স্থানান্তরের পরই দেখা দেয় বিপত্তি। সেই থেকে বন্ধ রয়েছে ল্যাবের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট গোলাম কিবরিয়া বলেন, ‘যন্ত্রপাতি না থাকায় পানির প্যারামিটার টেস্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। আশা করি শিগগিরই এ সমস্যার সমাধান হবে।’
এ বিষয়ে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পানির গুণগত মান পরীক্ষার যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকায় ল্যাবটি দীর্ঘদিন বন্ধ। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। যন্ত্রপাতি এলেই আমরা ল্যাবটি চালু করে বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন পয়েন্টের পানির গুণগত মান পরীক্ষা শুরু করব।’