ব্যাংকঋণে বেঁধে দেয়া ৯ শতাংশের সর্বোচ্চ সুদসীমা উঠিয়ে দেয়ার ঘোষণা আসে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে। ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সঙ্গে সমন্বয় করে বাজারভিত্তিক সুদহার নির্ধারণ করায় বর্তমানে ঋণের সুদহার ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ১০ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আর ঋণের সুদহার বাড়ার কারণে বেড়ে যাবে ব্যবসা ব্যয়ও। বিশেষ করে যেসব কোম্পানির ঋণের পরিমাণ বেশি তাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়বে সবচেয়ে বেশি। এমনিতেই বিভিন্ন ধরনের ব্যয় বৃদ্ধির চাপে আছেন ব্যবসায়ীরা।
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে যেগুলোর ইকুইটির তুলনায় বেশি ঋণ রয়েছে—এমন বেশকিছু কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করেছে বণিক বার্তা। এক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ সমাপ্ত প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। ইকুইটির তুলনায় ঋণ কম থাকা কোম্পানির জন্য ভালো। এক্ষেত্রে ইকুইটির এক গুণ বা তার কম ঋণ থাকা নিরাপদ। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রেটিং প্রতিষ্ঠানগুলো ইকুইটির দেড় গুণ পর্যন্ত ঋণকে সহনীয় হিসেবে বিবেচনা করে।
এ বছরের ১৮ জুন চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকঋণের সুদহার নির্ধারণে এসএমএআরটি (সিক্স মান্থ মুভিং অ্যাভারেজ) বা স্মার্ট নামে একটি পদ্ধতি চালু করে। এ পদ্ধতিতে ছয় মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের গড় হার ধরে রেফারেন্স রেট ঠিক করা হবে। এ রেফারেন্স রেটের সঙ্গে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ পর্যন্ত যোগ করে ব্যাংকগুলো এবং ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো (এনবিএফআই) সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ যোগ করে সুদের হার নির্ধারণ করতে পারবে। জুলাইয়ে সুদের রেফারেন্স রেট ছিল ৭ দশমিক ১০। এতে ব্যাংকঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার ১০ দশমিক ১০ শতাংশ এবং এনবিএফআইয়ের ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার দাঁড়ায় ১২ দশমিক ১০ শতাংশে। ব্যাংকঋণের সুদহার বাড়ায় বেশি ঋণ রয়েছে এমন কোম্পানির আর্থিক ব্যয় বিশেষ করে সুদ ব্যয় আরো বাড়বে। অন্যান্য খাতের ব্যয় না কমলেও এতে কোম্পানিগুলোর কর-পরবর্তী নিট মুনাফায়ও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ইস্পাত খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি জিপিএইচ ইস্পাত লিমিটেডের এ বছরের মার্চ শেষে ইকুইটির তুলনায় ঋণ রয়েছে ৪ দশমিক ৩ গুণ। এ সময়ে কোম্পানিটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১৮৭ কোটি ১০ লাখ টাকা। ওষুধ খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানি এসিআই লিমিটেডের ইকুইটির তুলনায় ঋণ রয়েছে ৪ দশমিক ১ গুণ। এ বছরের মার্চ শেষে কোম্পানিটি স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং অন্যান্য দায় মিলিয়ে ৫ হাজার ৯২০ কোটি ১৫ লাখ টাকা।
নির্মাণ খাতের কোম্পানি মীর আকতার হোসেন লিমিটেডের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এবং অন্যান্য দায় মিলিয়ে এ বছরের ৩১ মার্চ শেষে ১ হাজার ৯৭৭ কোটি ৭০ লাখ টাকার ঋণ ছিল। কোম্পানিটির ইকুইটির তুলনায় ঋণের পরিমাণ ৩ দশমিক ৪ গুণ।
আফতাব অটোমোবাইলস লিমিটেডের ইকুইটির তুলনায় ঋণ রয়েছে ৩ দশমিক ২ গুণ। এ বছরের ৩১ মার্চ শেষে কোম্পানিটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি মিলিয়ে মোট ঋণ রয়েছে ১ হাজার ৭৬৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
বহুজাতিক ইলেকট্রনিকস ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের স্বল্পমেয়াদি ঋণ ও অন্যান্য দায় মিলিয়ে এ বছরের ৩১ মার্চ শেষে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮২৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির ইকুইটির তুলনায় ২ দশমিক ৩ গুণ ঋণ ছিল। বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশন লিমিটেডের ইকুইটির তুলনায় ঋণ রয়েছে ১ দশমিক ৯ গুণ। এ বছরের মার্চ শেষে কোম্পানিটির স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও অন্যান্য দায় মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, নতুন সুদহার আরোপ করে সেটির বাস্তবায়ন শুরু করে দেয়া হয়েছে। এখন মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখাই ব্যবসায়ীদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আর মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো সুদের হার বাড়াতে হবে। এটা ইকোনমিক থিওরি। অর্থাৎ সুদহার বাড়ার ফলে ঋণের চাহিদা কমে মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়তা করবে। তবে উল্টো পিঠে এটাও সত্য, সুদের হার বাড়ানোর ফলে ব্যবসা পরিচালনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। উদ্যোক্তারা বেশি ঋণ পেলে সেই ঋণ বিনিয়োগ করে মূলধনি যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে ব্যয় করে উৎপাদন ব্যবস্থায় ভারসাম্য ধরে রাখে। এমনিতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিসহ বর্তমানে নানামুখী চাপে সব দিক থেকেই উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।
জানতে চাইলে এ বিষয়ে এনার্জিপ্যাক পাওয়ার জেনারেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন রশীদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকগুলো ব্যবসাকে সহায়তা করার জন্য খুব বেশি এগিয়ে আসছে না কিংবা এগিয়ে আসতে পারছে না। এতে আমাদের চলতি মূলধনের ওপর যে প্রভাব সেটি নেতিবাচকভাবে আসছে এবং আমাদের ব্যবসায় ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কভিডের প্রভাব, সরবরাহ শৃঙ্খলে চ্যালেঞ্জ, পণ্য জাহাজীকরণের ব্যয়, বিনিময় হারের প্রভাবে ব্যয় বেড়েছে। ইউ পাস এলসি নিষ্পত্তি করার সময় ব্যয় বেড়েছে ২১ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত।’ হুমায়ুন রশীদ বলেন, ‘আমাদের ব্যবসা মূলত ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও বিদ্যুৎ খাতকে ঘিরে। গত ৪১ বছর আমরা প্রবৃদ্ধি করেছি। হঠাৎ এ ধরনের সুনামির (বর্তমান বৈশ্বিক) জন্য আজকে আমাদের এ চ্যালেঞ্জটা মোকাবেলা করতে হচ্ছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি ঘুরে দাঁড়ানোর মতো আমাদের কাছে পণ্য, প্রযুক্তি ও সম্পদ আছে। বর্তমান এ সংকটকালীন আমরা যদি ব্যাংকের মাধ্যমে এলসি খুলে কাঁচামাল এনে পণ্য উৎপাদন করতে পারি, তাহলে দেশের বাজারে পণ্য বিক্রির মাধ্যমে নগদ প্রবাহকে সচল রাখতে সক্ষম হব। পাশাপাশি আগামীতে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পণ্য রফতানির উদ্দেশ্যে তৈরি করব। এতে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হবে এবং সামনের দিনগুলোতে ডলারের সংকট অব্যাহত থাকলে এটি আমাদের ব্যবসায়িক পুনরুদ্ধারের জন্য সহায়ক হবে।’