রাজনৈতিক অস্থিরতা কাটিয়ে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকরা। জ্বালানি ও অবকাঠামোতে বড় সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরলে তাতে সম্মত হন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ।
বুধবার বিকালে চতুর্থ 'স্টেট অব ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট' শীর্ষক ওয়েবিনারে বক্তারা দেশের ইতিবাচক অর্থনৈতিক সূচক ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো তুলে ধরেন। এতে আরো যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুনসহ অনেকে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, দেশ ইতিবাচক জিডিপি প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে, মুদ্রাস্ফীতি হ্রাস পেয়েছে এবং রেমিট্যান্স রেকর্ড পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি, বাজারভিত্তিক মুদ্রাব্যবস্থায় টাকা স্থিতিশীল রয়েছে এবং শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আশিক চৌধুরী জানান, বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে ৩২টি সংস্কার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয়েছে, ৬টি চলমান, ৭টিতে কিছু বিলম্ব হচ্ছে এবং একটি ২০২৬ সাল পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির মধ্যে রয়েছে বিডার ওয়েবসাইট আন্তর্জাতিক মানে উন্নীতকরণ, বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠন, চীনে প্রথম প্রতিনিধি অফিস স্থাপনের পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য 'সিঙ্গেল-পয়েন্ট কন্টাক্ট' বা ইনভেস্টর রিলেশনশিপ ম্যানেজমেন্ট টিম চালু করা।
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানান, পরিবহন খাতের দক্ষতা বাড়াতে একটি সমন্বিত মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিদ্যমান সড়ক, রেল ও নদীপথের নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করে কোথায় অবকাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে, তা শনাক্ত করে সেখানে বিনিয়োগ করা হবে। এ পরিকল্পনার প্রাথমিক খসড়া আগস্ট মাসে প্রস্তুত হবে এবং সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ব্যবসায়ী মহল ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।
জ্বালানি খাতের সংস্কার সম্পর্কে তিনি বলেন, এরই মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০২৫ অনুমোদিত হয়েছে। খুব শিগগিরই মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি চালু করা হবে, যার মাধ্যমে বেসরকারি উৎপাদনকারীরা সরাসরি গ্রাহকদেরকে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেন। সৌর বিদ্যুৎ খাতে প্রণোদনা হিসেবে কর ছাড় ও ১৫ বছরের করমুক্ত সুবিধা দেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, সব সরকারি অফিস, স্কুল, কলেজ ও হাসপাতালের ছাদে সৌর প্যানেল স্থাপনের একটি জাতীয় প্রোগ্রাম হাতে নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো জানান, ৫০টি গ্রাউন্ড-বেইজড সোলার প্ল্যান্টের জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে এবং গ্রিড স্থিতিশীল রাখতে ব্যাটারি এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (বিইএস) চালু করা হবে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দেশীয় গ্যাসের মজুদ কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গত বছর ৮৪টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল, এবার তা বাড়িয়ে ১০৪টি কার্গো আমদানি করার প্ল্যান করা হয়েছে। এছাড়া, অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অদক্ষ ক্যাপটিভ জেনারেটর বন্ধ করে গ্যাস সাশ্রয়ের পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
এছাড়া ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) জন্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। বিদ্যমান পেট্রোল পাম্প ও গ্যাস স্টেশনগুলোতেই ইভি চার্জিং পয়েন্ট স্থাপন করা হবে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের সহায়তায় ৪৫০টি ইলেকট্রিক বাস আনা হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের একটি ইন্টিগ্রেটেড মাস্টার প্ল্যান হালনাগাদ করা হচ্ছে, যা ডিসেম্বর মাসের মধ্যে শেষ হবে। এই পরিকল্পনায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, কয়লা উত্তোলন, এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য শক্তিকে গুরুত্ব দেয়া হবে বলেও জানান তিনি।