সরকারের সবচেয়ে বড় পাঁচ বিভাগই ভঙ্গুর ও অদক্ষতায় পরিপূর্ণ

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩১ জন প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কর্মরত।

সরকারের ১৪ লাখ ৬৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর অর্ধেকের বেশি নিয়োজিত পাঁচটি খাতে। প্রাথমিক শিক্ষা, পুলিশ, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও রেল—নাগরিকের গড়ে ওঠা, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ সেবার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এসব খাতে কর্মরত সরকারি জনবলের সংখ্যা প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার। কিন্তু বেশি জনবল কর্মরত থাকলেও এ পাঁচ খাতই কাঠামোগত দুর্বলতা, ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতা ও সেবা প্রদানে বিভিন্নমুখী ঘাটতিতে জর্জরিত। বিপুল জনবল ও অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে নাগরিক সেবায় প্রত্যাশিত দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়ায় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে এসব বিভাগ কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বিশ্লেষক ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে।

চার লাখেরও বেশি কর্মী নিয়োজিত থাকা প্রাথমিকে শিশুদের মৌলিক শিক্ষা অর্জনের মান অনেক দিন ধরেই নিম্নমুখী। এ পর্যায়ে শিক্ষকদের দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রাথমিকের দুর্বলতা পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পুলিশের বিরুদ্ধে রয়েছে পেশাগত অদক্ষতা, জবাবদিহির ঘাটতি ও ক্ষমতা অপব্যবহারের অভিযোগ। স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বিপুল জনবল নিয়োজিত থাকার পরও চিকিৎসাসেবা নিয়ে নাগরিকের ভোগান্তি কাটছে না। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে দেখা দিয়েছে সেবা ও সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ধরনের সংকট। আর বিপুল রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ ও জনবল নিয়েও রেল পরিচালিত হচ্ছে ধারাবাহিক লোকসান ও ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতার বোঝা নিয়ে।

নিম্নমানের সেবা, অদক্ষতা, হয়রানি ও ঘুস-দুর্নীতির মতো অভিযোগ থেকে এখনো সরকারের বিভিন্ন সেবা বিভাগ কাঙ্ক্ষিত উত্তরণ ঘটাতে পারেনি। সম্প্রতি সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ সরকারের বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ কো‌টি টাকা। নতুন বেতন কাঠামোয় এ খাতে সরকারের ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বাড়বে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। সরকারের বর্ধিত এ ব্যয় জনগণকে জোগান দিতে হবে। এমন প্রেক্ষাপটে ভঙ্গুর ও অদক্ষতায় আক্রান্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে জনগণ কতটা কার্যকর সেবা পাবে তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিশ্লেষক মহলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমস্যার সমাধান কেবল জনবল ও বেতন-ভাতা বাড়ানোয় হওয়ার নয়; বরং জরুরি প্রয়োজন কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ। একই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার প্রশাসন ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এতে সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা এবং জনগণের মানসম্মত সেবা পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন ১৪ লাখ ৬৪ হাজার ৩৫০ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩১ জন প্রাথমিক শিক্ষা খাতে কর্মরত। বিশ্বব্যাংকের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে সংস্থাটির বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন শিক্ষা মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাও তীব্র। দেশের প্রাথমিক শিক্ষা বড় ধরনের লার্নিং ক্রাইসিসে (শিখন ঘাটতি) রয়েছে। ১০ বছর বয়সী শিশু শিক্ষার্থীদের ৫১ শতাংশই তাদের বয়স উপযোগী সাধারণ বাংলা-ইংরেজি লেখা পড়তে ও বুঝতে পারে না। পাশাপাশি তারা শ্রেণী উপযোগী গাণিতিক দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির পেছনে যেসব কারণ রয়েছে, তার অন্যতম দুর্বল পাঠদান পদ্ধতি ও দক্ষ-প্রশিক্ষিত শিক্ষকের ঘাটতি। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক। তা সত্ত্বেও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় এক লাখ শিক্ষক প্রশিক্ষণবিহীন, যা মোট শিক্ষকের ২৫ শতাংশ। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমির (নেপ) তথ্য বলছে, অনেক সময় শিক্ষকদের দক্ষতা থাকলেও তার শ্রেণীকক্ষে তা প্রয়োগ করতে পারছেন না।

চলতি বছর নেপ প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ডিজিটাল শিক্ষা ও একুশ শতকের দক্ষতা প্রয়োগে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন দেশের শিক্ষকরা। প্রায় ৬০ শতাংশ নিজেদের দক্ষ দাবি করেন। তবে বাস্তবে শ্রেণীকক্ষে তা দেখাতে পারছেন কেবল এক-চতুর্থাংশ শিক্ষক। আট বিভাগের ১৬টি উপজেলার ১৩ হাজারের বেশি শিক্ষকের তথ্য বিশ্লেষণ করে ‘সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ২১ শতকের দক্ষতার উপলব্ধি এবং বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জসমূহ অনুসন্ধান’ বিষয়ক প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রাথমিকসহ সব শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধি দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। নতুন পে-স্কেলে তাদের বেতন বাড়তে যাচ্ছে। কিন্তু বেতন বৃদ্ধি মানেই সেবার মান বৃদ্ধি পায়—বিষয়টি এমন নয়। সেবার মান বৃদ্ধির জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষত শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষকের বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন যথাযথ প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের ক্ষেত্রে তাদের সেই দক্ষতার প্রয়োগ নিশ্চিত করা। শিক্ষকরা শ্রেণীকক্ষে সঠিকভাবে পাঠদান করছেন কিনা সে বিষয়টি যেমন দেখতে হবে, তেমনি কোথাও তাদের ভুলত্রুটি হলে সেখানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বেতন বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সব খাতের সরকারি চাকরিজীবীদের আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ এবং জনসাধারণের জন্য তা উন্মুক্ত রাখা প্রয়োজন।’

জানতে চাইলে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মানসম্মত পাঠদানের জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং দক্ষ শিক্ষক নিয়োগে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। দীর্ঘদিনের ভেঙে পড়া রাষ্ট্র কাঠামোর অংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থাও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। শিক্ষকরা যেন আকর্ষণীয় কনটেন্টের মাধ্যমে ছবি, ভিডিও, ডকুমেন্টারি, গান, মিউজিকের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারেন—সেজন্য “‍ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব” প্রোগ্রাম শুরু হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোয় মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম নির্মাণ করা হচ্ছে।’

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নিয়োজিত রয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশে। সংস্থাটির বর্তমান সদস্য সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজার ৫০০। এছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে ৭৯ হাজার ৮৫৪ জন, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরে ৩৬ হাজার ৯৩৬ ও বাংলাদেশ রেলওয়ের অধীনে ২৫ হাজার ৫২২ জন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০১০ সালে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্য সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার। বর্তমানে এ সংখ্যা ২ লাখ ২০ হাজারের ওপরে। অর্থাৎ দেড় দশকে বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। এ সময়ে বাহিনীতে কয়েকটি ইউনিটও যুক্ত হয়েছে—পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ট্যুরিস্ট পুলিশ, নৌ-পুলিশ, অ্যান্টি-টেরোরিজম ইউনিট (এটিইউ) এবং ম্যাস র‍্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) পুলিশ। বর্তমানে বাহিনীতে কনস্টেবল রয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজারের বেশি।

জনবল বৃদ্ধির অনুপাতে বাড়েনি পুলিশের আবাসন ও যানবাহনসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। বর্তমানে বাহিনীর মাত্র ১০ শতাংশ সদস্য আবাসন সুবিধা পান। প্রয়োজনের তুলনায় যানবাহনের সংকট ৬ হাজার ১৬০টি। যানবাহন সংকটে অনেক থানায় নিয়মিত টহল কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

অবকাঠামোগত সংকটের মধ্যেও পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়িয়েছে বিভিন্ন সরকার। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম এক বছরে বাহিনীতে মোট ১৫ হাজার ৮৫১ জন নতুন সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগ ছিল ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি)। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর নতুন করে পুলিশে আরো ১৪ হাজার সদস্য নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।

সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বাহিনী হলেও দক্ষতা ও পেশাদারত্বে পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের (আইইপি) ২০২৬ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় বাংলাদেশ ১৬৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম অবস্থানে রয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ।

ইন্টারন্যাশনাল পুলিশ সায়েন্স অ্যাসোসিয়েশন এবং ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিসের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত সর্বশেষ ‘ওয়ার্ল্ড ইন্টারনাল সিকিউরিটি অ্যান্ড পুলিশ ইনডেক্স’ অনুযায়ী, বৈশ্বিক পুলিশিং কার্যকারিতার তালিকায় বাংলাদেশ পুলিশ ১০০তম স্থানে রয়েছে। ১২৫টি দেশের পুলিশ বাহিনীকে বিভিন্ন সূচকের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন বা র‍্যাংকিং করা হয়।

শুধু সদস্য সংখ্যা বাড়ালেই পুলিশের সক্ষমতা ও সেবা প্রদানের পেশাদারত্ব বাড়বে না বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) প্রধান উপদেষ্টা নূর খান লিটন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে নজর না দিয়ে সরকার শুধু পুলিশের সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দিচ্ছে। নতুন নিয়োগের আগে বাহিনীর যানবাহন, আবাসন, সরঞ্জাম ও অন্যান্য অবকাঠামোগত ঘাটতি চিহ্নিত করে সেগুলো পূরণের উদ্যোগ নিতে হবে। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ছাড়া অতিরিক্ত সদস্য নিয়োগ দিলে তাদের কর্মপরিবেশ আরো সংকটপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এবং প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।’

পুলিশের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আবাসনসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইচ্ছামতো পুলিশের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সে তুলনায় তাদের আবাসন ব্যবস্থা করা হয়নি। আবাসন সুবিধা না থাকায় ঢাকায় কর্মরত পুলিশ সদস্যদের অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হয়। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে থাকা সদস্যদের জন্য এ সংকট আরো তীব্র। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে নৈতিক চর্চা প্রতিফলিত হওয়া খুবই কঠিন। পুলিশের কাছ থেকে নৈতিক ও পেশাদার সেবা পেতে হলে অবশ্যই তাদের আবাসন সুবিধা বাড়াতে হবে।’

কর্মীর সংখ্যার দিক থেকে তৃতীয় স্থানে থাকা বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতও ভঙ্গুর। বিশেষ করে সরকারি হাসপাতালে মানসম্মত সেবা প্রাপ্তি নিয়ে অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এক্ষেত্রে অবকাঠামো, যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং কর্মী ব্যবস্থাপনার সংকটের বড় দায় রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, বাংলাদেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ (ইউএইচসি) সার্ভিস কাভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫৪ (১০০ স্কোরে), অর্থাৎ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার কাভারেজে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। ২০২৫ সালে দেশের ৪১ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ, অর্থাৎ প্রায় সাত কোটি, চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে আর্থিক সংকটে পড়েছে। একই সময়ে স্বাস্থ্য ব্যয়ের বড় অংশই বহন করতে হচ্ছে রোগী ও পরিবারকে। অন্যদিকে রয়েছে গুরুতর রোগের চিকিৎসাসেবায় সুযোগের ঘাটতি।

ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেডিকেল এডুকেশনের (ডব্লিউএফএমই) সাবেক জ্যেষ্ঠ পরামর্শক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে জনবল সমস্যার সমাধানে সঠিক কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত জরুরি। দেশে বর্তমানে প্রায় দুই লাখ জনবল থাকলেও স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিংয়ের অভাবে এ খাতের উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে। জনসংখ্যা ও রোগের ধরন কেমন—তা পর্যালোচনা করে ১০ বছরের একটি “‍মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা” থাকা দরকার। এটি জানা থাকলে অ্যাডহক ভিত্তিতে নিয়োগের প্রয়োজন হতো না।’

ডা. মোজাহেরুল হক আরো বলেন, ‘যত্রতত্র সরকারি-বেসরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হলেও সেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয়সংখ্যক রোগী নেই। ফলে মানহীন ডাক্তার তৈরি হচ্ছে এবং চিকিৎসা শিক্ষা ও সেবার মান শোচনীয় পর্যায়ে নেমেছে। স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে কেবল নিয়োগ দিলেই হবে না; বরং প্রয়োজনীয় শিক্ষক, হাসপাতালের বেড ও আধুনিক যন্ত্রপাতির ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষাগত ও প্রশিক্ষণগত মান বাড়াতে কঠোর নজরদারি দরকার। একইভাবে নার্স ও প্যারামেডিকদের ক্ষেত্রেও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক।’

দেশে একদিকে ভয়াবহ হাম বিপর্যয়, অন্যদিকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে দীর্ঘদিনের সরবরাহ সংকট—স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। চলতি বছরের মার্চ থেকে শুরু হওয়া হাম প্রাদুর্ভাবে ৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১ লাখ ৮০ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যু প্রায় এক হাজারের কাছাকাছি। এর মধ্যেই পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে রয়েছে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সংকট। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ সংকট তীব্র হয়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিলে দেশের ৩৯৪টি উপজেলায় সরকারি কনডম, ৩৩৫টি উপজেলায় জন্মনিয়ন্ত্রণের খাবার বড়ি এবং ৩৯৫টি উপজেলায় আইইউডির সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। কনডম বিতরণ এক বছরে ৪ লাখ ৫৯ হাজার থেকে নেমে প্রায় ৫০ হাজারে এবং খাবার বড়ি বিতরণ ২ লাখ ৫১ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজারে নেমে যায়। পরিবার পরিকল্পনায় সামগ্রীর ঘাটতি অব্যাহত থাকায় নারী ও পরিবারগুলোর প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ প্রতিরোধে ঝুঁকি বেড়েছে।

এরই মধ্যে দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেড়েছে। ইউনিসেফ ও বিবিএসের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ২ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৪ হয়েছে, যা জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞদের মতে বড় উদ্বেগের কারণ।

কর্মীর সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ রেলওয়ে দেশের শীর্ষ পাঁচটি সরকারি সংস্থার একটি। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ২৫ হাজার ৫২২ জন কর্মী কর্মরত রয়েছেন। বিপুল জনবল থাকা সত্ত্বেও রেলের সেবা ও পরিচালন দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ট্রেন ও স্টেশনের নোংরা পরিবেশ, টিকিটের কালোবাজারি, অতিরিক্ত দামে খাবার বিক্রি, ইঞ্জিন বিকল, লাইনচ্যুতি এবং অনিয়মিত সময়সূচি সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবার এ নিম্নমানের নেপথ্যে কর্মীদের অদক্ষতা, অপেশাদারত্ব ও কার্যকর জবাবদিহির অভাবই প্রধান কারণ।

অনুমোদিত কাঠামোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কাজের ধরন বদলালেও রেলের পদগুলো পুরোপুরি আধুনিকায়ন হয়নি। ব্রিটিশ আমলে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালে নতুন জনবল কাঠামো প্রণয়ন করা হয়। সে সময় ১৯৫টি ক্যাডার পদ ও ৫ হাজার ২৭৮টি অস্থায়ী পদ সৃষ্টির পাশাপাশি ৪০ হাজার ৭২৮টি পদ বিলুপ্ত করা হয়। ফলে অনুমোদিত পদ দাঁড়ায় ৪৭ হাজার ৬৩৭টিতে। পদ সংখ্যা কমানো হলেও কর্মীদের কার্যক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতা বাড়াতে দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি।

দক্ষতার এ ঘাটতি সরাসরি প্রভাব ফেলছে রেলের আর্থিক খাতে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রেলের পরিচালন ব্যয় দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের চেয়ে ৬৫২ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু একই সময়ে সংস্থার আয় ৮০ কোটি টাকা কমে মোট ১ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। আয় ও ব্যয়ের এ ব্যবধান ‘অপারেটিং রেশিও’ বা পরিচালন দক্ষতায় স্পষ্ট ধরা পড়ে। ১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে ১ টাকা আয় করতে রেলের খরচ হতো ৯৫ দশমিক ৯ পয়সা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ টাকা আয় করতে রেলের ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৪০ পয়সায়।

বিগত সাড়ে ১৫ বছরে নতুন রেলপথ নির্মাণ, ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহ ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়নে প্রায় ৮৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। বিপুল অর্থ ঢালা হলেও ট্রেনের ধীরগতি, লাইনচ্যুতি কিংবা কর্মীর অভাবে স্টেশন বন্ধ থাকার সংকট থেকে বেরিয়ে আসা যায়নি। বুয়েটের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামানের মতে, কর্মীসংকটের অজুহাত থাকলেও বাস্তবে পরিচালন ব্যয় কমেনি। কেনাকাটায় অপচয়, অবহেলা ও দুর্নীতির ফলেই ব্যয়ের এ বোঝা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো প্রতিষ্ঠানে, যেখানে ১ টাকা আয়ের বিপরীতে প্রায় আড়াই টাকা ব্যয় হয়, সেখানে কাজের দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে কেবল বেতন বা কর্মী বাড়ালে তা রাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্বের ৫০টিরও বেশি দেশ রেলভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ভর করে এগিয়ে চললেও আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে রেল অনেক পিছিয়ে। শুধু বেতন-ভাতা বাড়ালেই কোনো প্রতিষ্ঠান স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষ বা প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে না। বরং সঠিক নিয়োগ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতেই প্রকৃত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা তৈরি হয়।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন, উন্নত বিশ্বে পারফরম্যান্সের ওপর ভিত্তি করেই কর্মীদের বেতন ও ইনক্রিমেন্ট নির্ধারিত হয়। ঢালাওভাবে সবার বেতন বাড়ালে প্রতিষ্ঠানের কাজের মান উন্নত হয়ে যাবে—এ ভাবনার মধ্যে বড় গলদ রয়েছে। রেলকে আধুনিক করতে হলে জনবলের দক্ষতা, কাজের মান ও সঠিক পারফরম্যান্স মূল্যায়নকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

আরও