শ্রীমঙ্গলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে পৌরসভার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ শিক্ষার্থীরা। দীর্ঘদিন ভাগাড়টি সরানোর দাবি জানিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা। কিন্তু কোনো কাজ না হওয়ায় বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তবু ভাগাড় সরানো হয়নি।
এদিকে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান একে অন্যের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা জানান, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পৌরসভা দীর্ঘদিন শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের ফটকের কাছে পৌরসভার ময়লা ডাম্পিং করে আসছে। কলেজ লাগোয়া আরো দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (দ্য বার্ডস রেসিডেনশিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও গাউছিয়া শফিকিয়া সুন্নিয়া দাখিল মাদ্রাসা) রয়েছে। ভাগাড় সরানোর দাবিতে মানববন্ধন, লাগাতার ক্লাস বর্জনসহ শিক্ষার্থীরা বিভিন্নভাবে আন্দোলন করে আসছেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয়রা।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী উম্মে নাফিসা মাইমুনাহ বলেন, ‘ময়লার উৎকট গন্ধে কলেজে ক্লাস করা মুশকিল। বৃষ্টি হলে দুর্গন্ধ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এর মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত বেড়েছে মশা-মাছি ও কুকুরের উৎপাত।’
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভাগাড়ের পাশে তিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ময়লার অসহনীয় দুর্গন্ধে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে। এর আগে ২০১৮ সালে ভাগাড়টি স্থানান্তরের দাবিতে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে নেমেছিলেন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। সে সময় তৎকালীন জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে আন্দোলন স্থগিত করলেও শিক্ষার্থীদের দাবি পাঁচ বছরেও পূরণ হয়নি।
শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ দীপ চাঁন কানু জানান, দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা দুর্গন্ধের কারণে চরম ভোগান্তিতে। শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ভাগাড়টি দ্রুত সরানোর দাবি জানান তিনি।
সরজমিনে দেখা যায়, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজলাগোয় ভাগাড়ে পৌরসভার ভ্যান ও গাড়ি বিভিন্ন স্থান থেকে ময়লা এনে ফেলছে। ডাম্পিং ঘরের কাছে কিছু শ্রমিক কাজ করছেন। ময়লার উৎকট গন্ধ এলাকাজুড়ে। মশা-মাছি উড়ছে চারপাশে। কলেজ রোড দিয়ে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা মুখ চেপে চলাচল করছেন।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভা সূত্র জানায়, ‘পৌরসভায় প্রায় আট হাজার পরিবারে ৫০ হাজার মানুষের বসবাস। ২ দশমিক ৫৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ পৌরসভার বাসা-বাড়ি ও শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিদিন প্রায় ১০ টন ময়লা জমা হয়। কলেজ রোডের ভাগাড়টি অনেক পুরনো। এখানে যখন ময়লা ফেলা শুরু হয় তখন আশপাশে কোনো বাসা-বাড়ি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না। পরবর্তী সময়ে এ এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থাপনা এবং জনবসতি গড়ে ওঠে।
ভাগাড়টি স্থানান্তরে ২০১৩ সালে বিদেশী অর্থায়নে উপজেলার সদর ইউনিয়নের জেটি রোড এলাকায় ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ২ দশমিক ৪৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। সে সময় জমিতে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের সময় এলাকার ফয়েজ উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি আদালতে মামলা করে। মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত ২০২৩ সালের ১৩ মে পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশের কারণে পৌরসভা থেকে উদ্যোগ নেয়া কলেজ সড়ক থেকে ময়লার ভাগাড় অপসারণের কাজটি বন্ধ হয়ে যায়।
সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল পৌরসভা লিখিত একটি প্রেসনোট দেয়। সেখানে বলা হয়- জেটি রোডের নতুন ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং এলাকাবাসী বাধা দেয়ায় পুরনো এ ভাগাড় স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। এজন্য পৌরসভা কর্তৃপক্ষ শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানের ওপর দায় চাপায়।
শ্রীমঙ্গল পৌর মেয়র মহসীন মিয়া বলেন, ‘শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর কথা বিবেচনা করে আমরা এখান থেকে ভাগাড় স্থানান্তরে জায়গা কেনার পর সেখানে ময়লা ফেলার সব ব্যবস্থা সম্পন্ন করি। কিন্তু তখনকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান (বর্তমানে উপজেলা চেয়ারম্যান) এবং স্থানীয় লোকজনের বাধার কারণে সেটি সম্ভব হয়নি।’
শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের তৎকালীন চেয়ারম্যান ও বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান ভানু লাল রায় বলেন, ‘জেটি রোডে যে জমি কেনা হয়েছে সেই এলাকাটি একটি পুরনো গ্রাম। অপরিকল্পিতভাবে জমি অধিগ্রহণের কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা এর প্রতিবাদ করেন। ভোগান্তি সমাধানের নামে আবার জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণ করা হলে সে এলাকার মানুষও ভোগান্তিতে পড়বে। এজন্য স্থানীয়রা পরিবেশ আইনে মামলা করেছেন। আমরা চাই কলেজ রোডের এ ভোগান্তির সমাধান হোক। জনবসতির বাইরে ভাগাড়ের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করা হোক। আর যদি জেটি রোডের জমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিদর্শন করে উপযুক্ত মনে করে সেখানে আমাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।’
মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসক ড. উর্মি বিনতে সালাম বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। স্থানীয়রা যাতে কষ্ট না পান সেজন্য সব পক্ষকে নিয়ে বসে বিষয়টি সমাধানে ব্যবস্থা নেব।’