ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (মমেক) হাসপাতালের নতুন আটতলা ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতালের লিফটের কন্ট্রোল রুম থেকে গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে এ আগুন লাগে। ধোঁয়া দেখে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করলে পড়ে গিয়ে ও পদদলিত হয়ে অন্তত ২০ জন আহত হয়। ময়মনসিংহ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
এ ঘটনায় পদদলিত হয়ে ছয়জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, হাসপাতালে প্রতিদিনই কিছু রোগী মারা যায়। এ মৃত্যুগুলোও তেমনই। অবশ্য তাদের মৃত্যুর কারণ জানতে পুলিশ তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বিভাগীয় কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবির সরকার।
যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে তাদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় জানা গেছে হাসপাতাল সূত্রে। এরা হলেন নেত্রকোনার পূর্বধলার হাজেরা বেগম (৫০); ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ার শাহজাহান (৪০), রমজান (৩৮) ও জাহানারা (৫০) এবং তারাকান্দার কুলসুমা (৩৫)। এছাড়া এক বছর বয়সী শিশুর মৃত্যু হলেও পরিচয় মেলেনি। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, পদদলিত হয়ে এ ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে তারা জানতে পেরেছেন। তবে তাদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত করা হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সন্ধ্যার দিকে ভবনের আটতলায় আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন ওয়ার্ডে থাকা রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। প্রাণভয়ে সবাই একসঙ্গে অপ্রশস্ত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামার চেষ্টা করলে হুড়োহুড়ি ও ধাক্কাধাক্কির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে অনেকেই পা পিছলে পড়ে যান এবং নিচে চাপা পড়ে আহত হন।
পরবর্তীতে ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলে পৌঁছে হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, স্টাফ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সহায়তায় দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। ভবনটিতে প্রয়োজনীয় উদ্ধার কার্যক্রম সম্পন্ন করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
ময়মনসিংহ সদর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার জুলহাজ উদ্দিন জানান, সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনে হঠাৎ আগুন লাগার খবর পাওয়া যায়। পরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) ফায়ার স্টেশন থেকে একটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চালায়। তবে এ সময় ভবনের ভেতরে প্রচণ্ড ধোঁয়া জমে যায়। রোগী ও স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। একসময় ময়মনসিংহের পাঁচটি স্টেশনের মোট ১০টি অগ্নিনির্বাপক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে বাড়তি ইউনিটগুলো ফিরিয়ে নেয়া হয়। তবে সার্বিক পরিস্থিতি তদারকির জন্য ঘটনাস্থলে চারটি ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
একই কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী। অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে তিনি জানান, নতুন ভবনের লিফটের কন্ট্রোল রুমে থাকা মেশিনের সঙ্গে সংযুক্ত বোর্ডে অতিরিক্ত উত্তাপ ও বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষে প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে। তিনি বলেন, ‘আগুনের তীব্রতা খুব বেশি না হলেও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রচুর ধোঁয়া ভবনের বিভিন্ন তলায় ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করে।’
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, ‘আগুনে হাসপাতালের চিকিৎসা ওয়ার্ডগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। বৈদ্যুতিক সংযোগে কোনো ধরনের অভ্যন্তরীণ ত্রুটি ছিল কিনা তাসহ দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।’
এদিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গতকাল রাত পৌনে ১১টার দিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিভাগীয় কমিশনার এসএম হুমায়ুন কবির সরকার। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে পদদলিত হয়ে কেউ মারা গেছেন—এমন কোনো তথ্যের প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাইনি। এ ধরনের কোনো প্রমাণ থাকলে আমাকে দেখান, আমি যাচাই করে দেখব। আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তবে সে তথ্যও সঠিক কিনা, তা যাচাই করা হচ্ছে।’
নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ বা প্রচার বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের জরুরি বিভাগের যে তালিকা আমাকে দেখানো হয়েছে, সেখানে ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য নেই। আমার কাছে আরো একটি তালিকা আছে, সেটিও যাচাই করে দেখব। মর্গের তথ্যও নেয়া হয়েছে। তবে মর্গের তথ্যের সঙ্গে পাওয়া অন্য তথ্যের মিল নেই। সব তথ্য মিলিয়ে দেখার পরই প্রকৃত সংখ্যা ও পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।’
এরপর রাত ১১টার দিকে ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা বিভিন্ন তালিকা যাচাই করছি এবং যাদের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাদের স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। তবে এখনো আমাদের হাতে কোনো কনক্রিট এভিডেন্স আসেনি।’
ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য কীভাবে এসেছে—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আপনারা যেভাবে শুনেছেন, আমরাও সেভাবেই শুনেছি। এখন সে তথ্যই যাচাই করার জন্য সবাই সরজমিনে এসে তদন্ত করছি। তথ্য নিশ্চিত হলে গণমাধ্যমকে জানিয়ে দেয়া হবে।’
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, হাসপাতালের নতুন ভবনে দুর্ঘটনার সময় দ্রুত বের হওয়ার জন্য এবং বাইরে থেকে উদ্ধারকাজে আসার জন্য কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ভবনটির একটি সিঁড়ি খোলা ছিল। অন্য চারটি সিঁড়ি থাকলেও সেগুলো সবসময় তালা বন্ধ করে রাখা হয়।