জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি

সনদ বাস্তবায়ন হবে গণভোটে, জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। চারটি বিষয়ে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেছে সরকার। চারটি বিষয়ে একটি প্রশ্নে হবে গণভোট। এ গণভোটে পাস হলে আগামী জাতীয় সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। আর সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গতকাল ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ আদেশের গেজেট প্রকাশ করা হয়। এর আগে জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুমোদন দেয় উপদেষ্টা পরিষদ। রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর আগে আদেশের সারসংক্ষেপে স্বাক্ষর করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে তিনি জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।

গতকাল দুপুরে দেয়া ভাষণে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোট এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে বলে ঘোষণা দেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এ আদেশে আমরা গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিধান গ্রহণ করেছি। এর মধ্যে রয়েছে সনদের সংবিধান বিষয়ক সংস্কার প্রস্তাবনার ওপর গণভোট অনুষ্ঠান এবং পরবর্তী সময়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সিদ্ধান্ত।’

গণভোটের সময় নির্ধারণ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা সব বিষয় বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোটের আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ জাতীয় নির্বাচনের মতো গণভোটও ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে একই দিনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে সংস্কারের লক্ষ্য কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হবে না। নির্বাচন আরো উৎসবমুখর ও সাশ্রয়ী হবে। গণভোট অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে উপযুক্ত সময়ে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।’

জুলাই সনদের আলোকে গণভোটের ব্যালটে যে প্রশ্নটি উপস্থাপন করা হবে সেটিও নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ভাষণে প্রশ্নটি পড়ে শোনান প্রধান উপদেষ্টা। প্রশ্নটি হবে: আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?

ক) নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে।

খ) আগামী সংসদ হবে দুই কক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে।

গ) সংসদে নারীর প্রতিনিধি বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে।

ঘ) জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোটের দিন এ চারটি বিষয়ের ওপর একটি মাত্র প্রশ্নে আপনি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ ভোট দিয়ে আপনার মতামত জানাবেন।’

উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট “‍হ্যাঁ” সূচক হলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এ প্রতিনিধিগণ একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরিষদ তার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হতে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হওয়ার পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যানুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। এর মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।’

প্রধান উপদেষ্টা জানান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামা অনুসারে সংবিধানে জুলাই জাতীয় সনদ অন্তর্ভুক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে, যা অনুমোদিত আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘ প্রায় এক বছরের আলোচনা, সংলাপ ও তর্ক-বিতর্কের পর রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগগুলো নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্ত হয়। রাজনৈতিক দলগুলো এতে স্বাক্ষর করে ১৭ অক্টোবর। এরপর জুলাই সনদ বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধের কারণে ৩১ অক্টোবর জাতীয় ঐকমত্য পরিষদ সরকারের কাছে সুপারিশমালা জমা দেয়। জুলাই সনদ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বাদ দেয়া ও গণভোটের সময় নিয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এ অবস্থায় সরকার দলগুলোকে মতবিরোধ কাটিয়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে এক সপ্তাহ সময় দেয়। নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত দেয়ার দায়িত্ব বর্তায় অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল সরকারের তরফ থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন বিষয়ে আদেশ জারি করা হলো।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারির মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ কিছুটা মিটলেও জনগণের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটেনি বলে মনে করেন গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার ভাষণ ও জুলাই সনদে সব কুল রক্ষার চেষ্টা করা হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে বিএনপি ও জামায়াত দুই পক্ষই কিছু না কিছু পেয়েছে। কিন্তু সমস্যায় পড়বে জনগণ। কারণ যে অদ্ভুত পদ্ধতিতে গণভোট আয়োজনের কথা বলা হয়েছে, সেটি এর আগে পৃথিবীর কোথাও আমরা দেখিনি। চারটি প্রশ্নের দুটিতে যদি কেউ একমত হন, তাহলে তিনি কী করবেন, সেটি বলা নেই। এ পরিস্থিতিতে জনগণ বিভ্রান্ত হবেন। চারটি প্রশ্ন জনগণের ওপর জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ এখন ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’-এর পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানই সংস্কারের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।’

আলতাফ পারভেজ আরো বলেন, ‘ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সময়ে বিদেশীদের সঙ্গে কোনো চুক্তি হলে রাজনৈতিক দল ও জনগণের পক্ষ থেকে সেটি প্রকাশের দাবি উঠত। এখন অন্তর্বর্তী সরকারও চট্টগ্রাম বন্দরসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিদেশীদের সঙ্গে চুক্তি করছে। কিন্তু কী চুক্তি হচ্ছে, সেটির শর্তগুলো কী, সে বিষয়ে জনগণ অন্ধকারে রয়েছে।’

আরও