রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত মেট্রোরেলের পুরোটাই তৈরি করা হচ্ছে বিদ্যমান সড়কের ওপর দিয়ে। মেট্রোর ভায়াডাক্ট বা উড়ালপথের জন্য পিলার গড়ে তোলা হয়েছে সড়কের মাঝ বরাবর। সড়ক বিভাজকের মধ্যে থাকায় এসব পিলার অবশ্য স্বাভাবিক যানবাহন চলাচলে তেমন সমস্যা করছে না। তবে ব্যতিক্রম ঘটেছে ফার্মগেট এলাকায়। খামারবাড়ীর সামনে দিয়ে প্রায় ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে মেট্রোর উড়ালপথ প্রবেশ করেছে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউতে। বড় বাঁক থাকায় ফার্মগেট মোড়ের পাশে মেট্রোর উড়ালপথের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে পোর্টাল ফ্রেমের পিলার, যার একটি দেয়া হয়েছে ফুটপাতে। আরেকটি পিলার পড়েছে সড়কের বিজয় সরণিমুখী লেনের মাঝখানে। পিলারটির কারণে বিঘ্নিত হচ্ছে যানবাহন চলাচল। নিয়মিতই তীব্র আকার ধারণ করে যানজট, বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ একটু সচেতন হলেই রাস্তার মাঝখানের পিলারটি এড়াতে পারত। অন্যান্য জায়গার মতো এটিও রাখা যেত সড়ক বিভাজকের মধ্যেই। কিন্তু তা না করে পিলারটি দিয়ে কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউর স্থায়ী ক্ষতি করে ফেলা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তারা। অন্যদিকে রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) কর্মকর্তারা বলছেন, নকশা অনুযায়ীই তৈরি করা হয়েছে পিলারটি। তবে এটি সড়ক বিভাজক বরাবর নির্মাণ করতে না পারার জন্য তারা ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পকে দায়ী করছেন।
উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলের উড়ালপথ ও স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে তিন ভাগে। এর মধ্যে যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠা ‘পি-৪৪৮’ নম্বর পিলারটি পড়েছে ‘প্যাকেজ-৫’-এর মাধ্যমে নির্মাণ করা আগারগাঁও থেকে সোনারগাঁও হোটেল অংশে। কাজটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আব্দুল মোনেম লিমিটেড, জাপানের টেক্কেন করপোরেশন ও আবেনিক্কো কোম্পানি লিমিটেড (টেক্কেন-এএমএল-আবেনিক্কো জেভি)।
প্রকৌশলীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত শহর এলাকায়, বিশেষ করে যেখানে জায়গার স্বল্পতা রয়েছে, সেখানে কোনো উড়ালপথ তৈরির জন্য ‘ক্যান্টিলিভার’ পিলার ব্যবহার করা হয়। এর সুবিধা হলো সরু হওয়ার কারণে জায়গা লাগে কম। যান চলাচলে কোনো অসুবিধা হয় না। উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলেও ব্যবহার করা হয়েছে ক্যান্টিলিভার পিলার। তবে মেট্রোরেলের গতিপথে বড় বাঁক রয়েছে খামারবাড়ি, ফার্মগেট, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড় ও প্রেস ক্লাব মোড়ে। এসব মোড়ে ক্যান্টিলিভারের বদলে ব্যবহার করা হয়েছে ‘পোর্টাল ফ্রেম’ পিলার।
সরজমিন মেট্রোরেল প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খামারবাড়ি, টিএসসি, দোয়েল চত্বর, হাইকোর্ট মোড় ও প্রেস ক্লাবে মোড়ে মেট্রোরেলের উড়ালপথের জন্য যেসব পোর্টাল ফ্রেমের পিলার ব্যবহার করা হয়েছে, সেগুলোর একটি অংশ রাখা হয়েছে সড়ক বিভাজকে, আরেকটি অংশ পড়েছে সড়কের ধারে। ফলে এসব এলাকায় যানবাহন চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তবে ফার্মগেট এলাকায় নির্মাণ করা ‘পি-৪৪৮’ নম্বরের পোর্টাল ফ্রেমের পিলারটির একটি অংশ সড়কের মাঝখানে পড়ে যাওয়ায় যান চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। সড়কটির এ অংশে গাড়ির একটু চাপ বাড়লেই প্রকট হয়ে উঠছে যানজট।
পিলারটি ঢাকার ব্যস্ততম ‘ভিআইপি রোডের’ স্থায়ী ক্ষতি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এখন কিন্তু চাইলেই পিলারটি অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া যাবে না। অন্যদিকে ফার্মগেট এলাকায় সড়কের দুই পাশে রয়েছে সব স্থায়ী অবকাঠামো। ফলে সড়কটির গতিপথ বদলে নেয়াও কার্যত অসম্ভব। পিলারটি তৈরির আগে নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষের আরো সচেতন হওয়া উচিত ছিল।’
মেট্রোরেলের এ পিলার অপরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে উল্লেখ করে এ যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘রাস্তার মাঝখানে থাকায় পিলারটি দুভাবে সমস্যা তৈরি করবে। প্রথমত, সকালে অফিস শুরুর সময় এবং বিকালে অফিস শেষের সময় যখন গাড়ির চাপ বেড়ে যাবে তখন রাস্তার এ পিলার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে। এমনিতেই ফার্মগেট এলাকাটি যানজটপ্রবণ। পিক আওয়ারে এ যানজট আরো প্রকট করে তুলবে পিলারটি। দ্বিতীয়ত, অফ পিক আওয়ার বা রাতে সড়ক ফাঁকা থাকায় সাধারণত ফার্মগেটের এ অংশে যানবাহন দ্রুতগতিতে চলাচল করে। এমন অবস্থায় রাস্তার মাঝখানে থাকা এ পিলার প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে। কর্তৃপক্ষ চাইলেই পিলারটিকে সড়ক বিভাজকের ওপরে রাখতে পারত।’
মেট্রোরেলের ফার্মগেট অংশে সম্প্রতি সড়ক বিভাজক তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। ‘পি-৪৪৮’ নম্বর পিলারটি সড়কের যে লেনে নির্মাণ করা হয়েছে, সড়ক বিভাজক তৈরি হচ্ছে তার উল্টো পাশের লেনে। মাঝরাস্তায় মেট্রোরেলের পিলার নির্মাণের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক কোনো মন্তব্য না করে এমআরটি লাইন-৬-এর অতিরিক্ত প্রকল্প পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) আব্দুল বাকী মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। যোগাযোগ করা হলে আব্দুল বাকী মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফার্মগেটের পিলারটি আমরা ঠিক জায়গায়ই দিয়েছি। কিন্তু এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, তারা যে ফুটওভার ব্রিজ করেছে সেটা আপনারা দেখেন। আমরা হিসাব করে যে জায়গায় পিলার নির্মাণ করা দরকার, সেখানেই করেছি। একেবারে শতভাগ লেন রেখে করা হয়েছে। কিন্তু এফডিইই (ফার্স্ট ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে) যে ফুটওভার ব্রিজ করেছে, সেটা কীভাবে করেছে জানি না। তারা আমাদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেনি।’