কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিল কবে

অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করে যেকোনো সময় যে কেউ নির্দিষ্ট হারে কর ও জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করতে পারেন। এ বিধান থাকার পরও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে বিভিন্ন সরকার। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ১৫ শতাংশ কর পরিশোধের শর্তে একই সুযোগ দিয়েছে সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ বৈধ করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ। বাজেট পাসের আগে এ বিষয়ে বেশ সমালোচনার

অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করে যেকোনো সময় যে কেউ নির্দিষ্ট হারে কর ও জরিমানা দিয়ে তা বৈধ করতে পারেন। এ বিধান থাকার পরও কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে বিভিন্ন সরকার। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও ১৫ শতাংশ কর পরিশোধের শর্তে একই সুযোগ দিয়েছে সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগ সরকার। অথচ বৈধ করদাতাদের সর্বোচ্চ করহার ২৫ শতাংশ। বাজেট পাসের আগে এ বিষয়ে বেশ সমালোচনার পাশাপাশি এ সুযোগ বাতিলের দাবি উঠলেও কর্ণপাত করা হয়নি। 

সম্প্রতি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। দেশের দায়িত্ব নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ছাত্র আন্দোলনটির মূল দাবি—বৈষম্য নিরসন, রাষ্ট্র সংস্কার ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া সংবিধান পরিপন্থী। আর এখন যেহেতু ছাত্র-জনতার সরকার, এ কালাকানুন বাতিল করা জরুরি হয়ে পড়েছে।  

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক সদস্য (শুল্ক ও মূসক) মো. ফরিদ উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করা সংবিধান পরিপন্থী, মৌলিক নীতির পরিপন্থী এবং ছাত্রদের বৈষম্যবিরোধী ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সম্পূর্ণরূপে পরিপন্থী। ছাত্র-জনতার এ সরকার যদি এটা চলমান রাখে, তাহলে এটা ছাত্রদের আন্দোলনের মূল দাবির প্রতি অন্যায় করা হবে। কেননা এটা তাদের আন্দোলনের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ।’

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বলা হয়েছে, কালো টাকা ১৫ শতাংশ কর দিয়ে বিনা প্রশ্নে বৈধ বা সাদা করা যাবে। একইভাবে জমি, ফ্ল্যাট, অ্যাপার্টমেন্ট কিনেও এলাকাভেদে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে। সেক্ষেত্রে বর্গমিটার অনুসারে নির্দিষ্ট হারে কর দিতে হবে। 

বেশ সমালোচিত কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বাতিলের আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনও। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ওয়ালে এক পোস্টের মাধ্যমে তিনি এ বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জাহিদ হোসেন বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার যে সুযোগ এ অর্থবছরের বাজেটে দেয়া আছে, সেটি বাতিল করা হোক। সর্বোচ্চ আয়করের সঙ্গে ৫-১০ শতাংশ জরিমানা যোগ করে সীমিত সময়ের (তিন থেকে ছয় মাস) জন্য এ সুযোগ পুনর্বহাল করার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।’

বিশ্লেষকদের অভিযোগ, কালো টাকা সাদা করার এ কালাকানুনের মাধ্যমে মূলত অসৎ করদাতাদের পুরস্কৃত করা হচ্ছে। আর সৎ করদাতাদের প্রতি করা হয়েছে অবিচার। 

বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়াকে অসাংবিধানিক উল্লেখ করে দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড প্রসিকিউশন) মঈদুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২০-এ বলা হয়েছে, অনুপার্জিত আয় কেউ ভোগ করতে পারবে না। এটা করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সফল হওয়া যাবে না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স বলে আবার দুর্নীতির সম্পদে ১৫ শতাংশ কর দিলে হালাল! এটা তো দ্বিমুখী নীতি। এতে অবৈধ আয় করাকে উৎসাহিত করা হবে। অবৈধ আয় যারা করে তাদের সুরক্ষা দেয়া হবে। আর সরকার ১৫ শতাংশ কর নিলে নিক, কিন্তু প্রশ্ন কেন করা যাবে না? উৎস তো জানতে হবে।’

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ায় বাজেটের পর উদ্বেগ প্রকাশ করে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ঢাকা (এমসিসিআই)। এ ব্যবস্থার ফলে নিয়মিত করদাতারা নিরুৎসাহিত হবেন বলে জানায় ব্যবসায়ীদের এ সংগঠন। তাদের দাবি, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নিয়মিত কর প্রদানকারীদের জন্য একটি শাস্তি। প্রকৃত অনুশীলনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ হারে কর আরোপসহ জরিমানার বিধান প্রবর্তনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা প্রচলন করলে নিয়মিত করদাতারা উৎসাহিত হবেন।

এনবিআরের সাবেক সদস্য (কর জরিপ ও পরিদর্শন) রঞ্জন কুমার ভৌমিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ স্ববিরোধী। পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনার সুযোগ যে বছর দেয়া হয়েছিল, সেই বছর তেমন সাড়া মেলেনি। যারা অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করতে চান, তারা নিয়মিত করহারে প্রদর্শন করবেন। জরিমানাও দেবেন। সেটাই তো যথেষ্ট। সেটাই তো ভালো।’

এনবিআর সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে সব মিলিয়ে অপ্রদর্শিত প্রায় ৪৭ হাজার কোটি টাকা সাদা করা হয়েছে। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের ১৫ বছরে মাত্র ৯৫ কোটি টাকা সাদা হয়। আওয়ামী লীগের শেষ তিন মেয়াদে (২০০৯-২৩) প্রায় ৩৩ হাজার কোটি টাকা সাদা হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে এযাবৎকালের সর্বোচ্চ ২০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা সাদা হয়।

এর আগে ২০০৬-০৭ সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ার পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। প্রকাশ করা হয়েছিল সন্দেহভাজন দুর্নীতিবাজদের তালিকা। তখন প্রায় ৩২ হাজার করদাতা ১১ হাজার ১০৭ কোটি টাকা সাদা করেন। মূলত ভয়েই তখন প্রচুর মানুষ সুযোগটি নেয়।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার বিষয়টি নিয়মিত আইনেই রাখা জরুরি। সে অনুযায়ী কেউ তার অপ্রদর্শিত আয় প্রদর্শন করে নিয়মিত হারে কর প্রদান করবে এবং ১০ শতাংশ করে জরিমানা দেবে।’

আরও