‘যুব ব্যাংক’ খুলতে চায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় ব্যাংকের সংখ্যা বেশি। অনেক দিন ধরেই নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদরা ব্যাংকের সংখ্যা কমানোর কথা বলছেন।

সম্প্রতি ব্যাংকের সংখ্যা কমিয়ে আনার আলোচনা উঠেছে জাতীয় সংসদেও। তবে এসব আলোচনার মধ্যেই যুবকদের জন্য বিশেষায়িত একটি ব্যাংক খুলতে চায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়। বিশেষায়িত এ ব্যাংকের নাম প্রস্তাব করা হয়েছে ‘যুব ব্যাংক’।

গত ৭ মে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় বলা হয়, প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অনেক যুবক প্রয়োজনীয় জামানত, অভিজ্ঞতা বা আর্থিক সক্ষমতার অভাবে সহজে ঋণ সুবিধা পায় না। এর ফলে সম্ভাবনাময় অনেক উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ হারিয়ে যায়। এ পরিপ্রেক্ষিতে যুববান্ধব একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বারোপ করা হয়, যেখানে যুবকরা সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ করতে পারবে এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনায় আর্থিক সহায়তা পাবে। সভায় আরো বলা হয় এ ব্যাংক যুবদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সভায় উপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ‘যুব ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই, ব্যাংকের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় নীতিমালা, অর্থায়ন কাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

‘যুব ব্যাংক’ বিষয়ে জানতে চাইলে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে এক ধরনের ব্যাংকিং করি। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে যারা প্রশিক্ষণ নেয়, তাদেরকে সিড ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেয়া হয়। এ বিষয়টিকেই প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে নেয়ার জন্য একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। যারা স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা করতে বা উদ্যোক্তা হতে চায়, তাদেরকে সহায়তা করার জন্যই আমাদের এ উদ্যোগ। যদিও এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এখানে বিভিন্ন অংশীজনের পরামর্শ নেয়া হবে।’

বর্তমানে দেশে রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি বিশেষায়িত ব্যাংক আছে। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) এবং প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক (পিকেবি)। এর বাইরে আছে তফসিল-বহির্ভূত আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক। বিশেষায়িত এসব ব্যাংক মূলধন ঘাটতি, লোকসানসহ বহুমুখী সংকটে ভুগছে।

কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নের উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত কৃষি ব্যাংক নিজেই অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাওয়া বিশেষায়িত এ ব্যাংকটির মূলধন ঘাটতি ঠেকেছে ২৯ হাজার ২০৭ কোটি টাকায়। কেবল গত ছয় অর্থবছরেই এ ব্যাংকটি ১৯ হাজার কোটি টাকার বেশি নিট লোকসান গুনেছে। ব্যাংকটির ঋণখেলাপির চিত্রও উদ্বেগজনক। গত বছরের জুন শেষে বিতরণকৃত ঋণের ৪৯ দশমিক ৪৪ শতাংশই ছিল খেলাপির খাতায়।

একই অবস্থা বিশেষায়িত বাকি ব্যাংকগুলোরও। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ শেষে বিশেষায়িত সরকারি ব্যাংকগুলো মোট ৪৭ হাজার ৮৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছিল। এর মধ্যে ১৯ হাজার ১৭৫ কোটি টাকাই খেলাপির তালিকায় থেকে গেছে। সে হিসাবে এ ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪০ দশমিক ৭২ শতাংশ।

প্রবাসীদের কল্যাণের উদ্দেশ্যে ২০১০ সালে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক তৈরি করা হয়েছিল। যদিও প্রতিষ্ঠার দেড় দশকেও প্রবাসীদের কল্যাণে বড় কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না বিশেষায়িত এ ব্যাংকটি। সরকারি অন্য ব্যাংকগুলোর মতো এ ব্যাংকটিও লোকসান গুনছে। সীমিত পরিসরে কার্যক্রম পরিচালনার পরও গত অর্থবছরে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের লোকসান ছিল প্রায় শতকোটি টাকা। অথচ বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে ২০১৮ সালে এ ব্যাংকটিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তফসিলভুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর সংস্কার না করে আরেকটি সমজাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা কতটা কাজে দেবে সে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এভাবে খাত ধরে ধরে ব্যাংক তৈরি করার কোনো প্রয়োজন নেই। নাম ধরে ধরে ব্যাংক দেয়া আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। পৃথিবীর কোনো উন্নত দেশে এত ব্যাংক নেই। আমাদের দেশে ব্যাংকের স্বাস্থ্য খারাপ। আবার যে উদ্দেশ্যে ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়, সেটাও প্রতিপালিত হয় না। এরই মধ্যে দেশে অনেকগুলো বিশেষায়িত ব্যাংক তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যাংকগুলোর পরিস্থিতি কী, আমরা সবাই জানি। সেগুলোকে ঠিক না করে নতুন ব্যাংক তৈরি করলে আরো বোঝা বাড়বে। যে ধরনের চাহিদার জন্য নতুন নতুন ব্যাংক খোলা হয়, সে ধরনের সুযোগ-সুবিধা তো বিদ্যমান ব্যাংকগুলোও দিতে পারে।’

বিদ্যমান ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে বরং ব্যাংকের সংখ্যা কমানো দরকার বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘নতুন ব্যাংক তৈরি না করে বিদ্যমান যে ব্যাংকগুলো আছে সেগুলোকে একীভূত করে বরং আরো কার্যকর করে গড়ে তোলা উচিত। বিদ্যমান যে ব্যাংকগুলো আছে, সেগুলোই কর্মসংস্থান তৈরি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও ব্যক্তি খাতে সহযোগিতার চাহিদা পূরণ করতে পারবে। এজন্য বিশেষায়িত ব্যাংকের আর দরকার নেই।’

গত ২৮ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, ‘ব্যাংকের সংখ্যা কমাতে হবে। জনগণের টাকা দিয়ে ব্যাংকের ঘাটতি পূরণ করতে হয়। তাই জনগণের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ‘দেশে মাত্র ২৫-২৭ শতাংশ মানুষ ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় আছে। বাকি বিশাল জনগোষ্ঠী ব্যাংকিং সেবার বাইরে। তাদের জন্য যদি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়, তাহলে ভালো। কিন্তু আমাদের দেশে যে উদ্দেশ্যে ব্যাংক তৈরি করা হয়, সেগুলো মানা হয় না। দেশের অনেক ব্যাংকেরই আর্থিক সক্ষমতা ভালো নেই। নতুন করে ব্যাংক তৈরি করা হলে সেটাও যে দুর্বল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না, সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।’

দেশে বর্তমানে ৬২টি তফসিলি ব্যাংক রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ছয়টি। তফসিলভুক্ত বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে ৪৩টি ও বিদেশী ব্যাংক রয়েছে নয়টি। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংক রয়েছে তিনটি। এর বাইরে তফসিল-বহির্ভূত রয়েছে আরো পাঁচটি ব্যাংক।

আরও