রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্পকে ২০১৭ সালে স্থানান্তর করা হয় সাভারের হেমায়েতপুরের চামড়া শিল্প নগরীতে। ৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে স্থাপিত সেন্ট্রাল এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (সিইটিপি) পুরোপুরি প্রস্তুত না হওয়ায় দূষিত পানি যাচ্ছে সরাসরি ধলেশ্বরী নদীতে। বিগত সরকারের সময়ে পরিবেশ আন্দোলন কর্মীদের নানা অভিযোগ ও আন্দোলনের পরও এ খাতের দূষণ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই আন্দোলনকারীদের কয়েকজন বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। কিন্তু তারা দায়িত্ব নেয়ার নয় মাসেও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
এ শিল্পের বর্জ্য অব্যবস্থাপনার কারণে মরণদশায় ধলেশ্বরী নদী। নদীর তীরে উন্মুক্ত স্থানে বিশেষ করে ক্রোমিয়ামযুক্ত কঠিন বর্জ্য ফেলা হয়, যা পানি ও মাটি দুটোই দূষিত করছে। অন্যদিকে এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন মূলধনের অভাবে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ করতে পারছেন না কারখানাগুলোতে।
এদিকে সিইটিপি পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় ট্যানারি প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। ফলে এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক রফতানিতে। বর্তমানে সাভারে সিইটিপি প্রায় ১৮ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের সক্ষমতা রয়েছে। তবে ঈদুল আজহার সময়ে অন্তত ৪৫ হাজার কিউবিক মিটার বর্জ্য শোধনের প্রয়োজন পড়ে।
সরজমিন দেখা যায়, ধলেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে সিইটিপি প্লান্ট। যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের ১৭টির মধ্যে মাত্র তিনটি পুরোপুরি পূরণ করতে পেরেছে ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেড। বাকি ১৪টি ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতে না পারায় প্লান্ট থেকে দূষিত পানি সরাসরি ফেলা হচ্ছে ধলেশ্বরী নদীতে। এছাড়া বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলা হয়েছে ল্যান্ডফিল। যেখানে পর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার অভাবে বৃষ্টির পানিতে বর্জ্য ধুয়ে সরাসরি গিয়ে পড়ছে নদীতে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে নিয়োজিত শ্রমিকদেরও দেখা গেছে কোনো নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই কাজ করতে। গ্লাভস-মাস্ক ব্যবহারের কোনো বালাই নেই। মারাত্মক দূষিত এসব বর্জ্য তারা খালি হাতেই ফেলছেন ভাগাড়ে। সেখান থেকে তা চুইয়ে পড়ছে নদীতে। চামড়া শিল্পে ব্যবহৃত পানির পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থাও নেই।
এ বিষয়ে ঢাকা ট্যানারি এস্টেট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. গোলাম শাহনেওয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শুরু থেকেই এখানে সলিড ওয়েস্টের রিসাইকেল ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। আমরা এর মধ্যে আটটি প্রতিষ্ঠানকে কাঁচা চামড়ার টুকরো (বর্জ্য) রফতানি ও প্রক্রিয়াজাতের অনুমতি দিয়েছি। এটা একটা সমাধান। আরেকটি হচ্ছে ক্রোম সেভিয় ডাস্ট। এটারও কোনো সমাধান ছিল না। এটিও একটি বিদেশী কোম্পানিকে রফতানির অনুমতি দেয়া হয়েছে। তারা এরই মধ্যে ৩৫০ টন নিয়ে গেছে। এখানে মোট সলিড ওয়েস্টের ৩০ শতাংশ আমরা পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে পেরেছি। এরই মধ্যে আমরা রেকটিফিকেশনের জন্য সরকারের কাছে ফান্ড চেয়েছি। এতে বর্জ্যের বাকি সমস্যাগুলোও সমাধান করা যাবে। এছাড়া আমরা বেশকিছু প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিগতভাবে সিইপিটি তৈরির অনুমতি দিচ্ছি। সেটি হয়ে গেলে এ খাতে আরো উন্নতি ঘটবে।’
তৈরি পোশাকের পরই চামড়া শিল্প থেকে আসে দেশের সর্বোচ্চ রফতানি আয়। পর্যাপ্ত নিজস্ব কাঁচামাল, সস্তায় শ্রমিক ও সহজে রফতানি সুবিধা অর্জনের সুযোগ থাকার পরও ধসে পড়ার উপক্রম দেশের চামড়া শিল্প খাতের। কাঁচামালের প্রাপ্যতা সত্ত্বেও নীতি-উদ্যোগ ও সমন্বয়হীনতার কারণে পিছিয়ে আছে এ খাত। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা উদ্যাগ এবং ব্যবসায়ী ও সরকার যৌথভাবে কাজ করেও বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিপুল রফতানি সম্ভাবনা সত্ত্বেও এ খাত যেন গলার কাঁটা হয়ে উঠছে দিন দিন। পরিবেশ রক্ষায় সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ঢাকার সাভারে গড়ে ওঠা চামড়া শিল্প নগরী বন্ধের সুপারিশও করা হয়। এরপর কোনো উন্নতি হয়নি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) বলছে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য থেকে আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ ১২ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয় করতে হলে প্রতি বছর এ খাতের প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৪০ শতাংশ হারে। সেজন্য এ খাতের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) চেয়ারম্যান মো. শাহীন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের বাজার হচ্ছে প্রায় ৬৫০ বিলিয়ন ডলারের। সেখানে বাংলাদেশ মাত্র এক বিলিয়ন ডলার কন্ট্রিবিউশন করতে পারে। এটা দশমিক ৫-এর মধ্যেও পড়ে না। তার মানে এখানে কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। এটির জন্য কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে হবে। অর্থাৎ এখানে বাধাগুলো দূর করতে হবে। এখন এলডব্লিউজির শর্ত যদি পূরণ না করি তাহলে সনদ পাব না, আর তখন আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রবেশ করতে পারব না। আমাদের এখানে ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের ঘাটতি আছে। এখানে রি-ফাইন্যান্সিং দরকার। বিগত সাত-আট বছর আমরা ব্যবসা করতে পারিনি। ফলে ব্যবসায়ীদের হাতে এত টাকা নেই যে সব কমপ্লায়েন্স নিজেরাই ঠিক করে নেবে। আর এখানে অনেক টাকার দরকার। আমাদের কমপ্লায়েন্স নিশ্চিতের জন্য সফট লোনের ব্যবস্থা এবং যেসব প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিইটিপি করার চিন্তা করছে, জমি আছে তাদের জন্যও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা। আমরা গভর্নরকে বলেছি, গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ড আছে সেখান থেকেও আমাদের ঋণ দেয়া যায় কিনা, কিন্তু সেটিও হয়নি।’
চামড়া খাতের বৈশ্বিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ অর্জনের জন্য মোট ১ হাজার ৭১০ নম্বরের মধ্যে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১৫০ নম্বর নির্ধারিত রয়েছে। বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলোর কাছে ভালো দামে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য বিক্রি করতে হলে এলডব্লিউজির সনদ থাকতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে মাত্র আটটি প্রতিষ্ঠানের এলডব্লিউজি সনদ রয়েছে। এর মধ্যে সাভার ট্যানারি শিল্প এলাকায় নিজস্ব সিইটিপি স্থাপন করে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক এ সনদ অর্জন করতে পেরেছে। বাংলাদেশ মূলত এমন সব বাজারে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি করে যেখানে ব্র্যান্ড মূল্য নেই। ফলে দেশের রফতানিকারকরা পণ্যের দাম কম পান।
বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) তথ্য অনুসারে, এলডব্লিউজি সনদ না থাকায় বাংলাদেশ চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে বছরে প্রায় ৫০ কোটি ডলার আয় হারাচ্ছে। এলডব্লিউজি তথ্য বলছে, এলডব্লিউজি সার্টিফিকেট পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইতালির রয়েছে ৯৫২টি, ভারতের ৩৩৪টি, চীনের ২৬৩টি, পাকিস্তানের ৬২টি, তাইওয়ানের ২৪টি, ভিয়েতনামের ২৭টি আর বাংলাদেশে মাত্র আটটি।
অন্যদিকে এলডব্লিউজি সনদের জন্য বিদেশে বড় মার্কেটগুলোয় রফতানি করতে না পারলেও আফ্রিকাসহ বেশকিছু বাজার রয়েছে যেখানে সনদের প্রয়োজন হয় না। আবার দেশের বাজারেও চাহিদা অনুযায়ী চামড়াজাত পণ্যের হিস্যা বাড়ছে না। দেশের বাজারের সিংহভাগ অংশই দখল করে আছে বিদেশী পণ্য।
এ বিষয়ে বিটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৮ কোটি মানুষ। আমাদের এখানে বলার মতো নিজেদের কোনো চামড়াজাত পণ্য নেই। এক এপেক্স ছাড়া তো কোনো ব্র্যান্ড তৈরি হয়নি। হয়নি বলতে সেভাবে চেষ্টাও হয়নি। বিদেশী কোম্পানিগুলো এখানে কিন্তু ঠিকই ব্যবসা করছে। বিদেশ থেকে অনেক কৃত্রিম লেদারের পণ্য আসে। কিন্তু আমাদের এখানে চামড়া আছে পর্যাপ্ত। এগুলো স্বাস্থ্যসম্মত এবং ভোক্তা চাহিদা বেশি। কিন্তু আমরা সেই জায়গটি ধরতে পারছি না নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে। এ জায়গায় সরকারের আরো গুরুত্ব দেয়া উচিত।’
চামড়া শিল্পের অগ্রগতিতে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে একটি করণীয় বিষয়ক প্রতিবেদন তৈরি করে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। কিন্তু সংস্থাটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, এ প্রতিবেদনের পর আর কোনো অগ্রগতির তথ্য সংস্থাটির কাছে নেই।
বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) ইঞ্জিনিয়ার মো. মিজানুর রহমান চামড়া শিল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। চামড়া শিল্পের অগ্রগতি না হওয়া এবং এ খাতে নানা উদ্যোগ ব্যর্থ হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চামড়া শিল্পে সফলতা না আসার কারণ একটাই, আমরা কমপ্লায়েন্স অর্জন করতে পারিনি। সবাই মিলে যে কাজগুলো করার কথা ছিল আমরা সেটি করতে পারিনি। যেমন আমরা যাদের সাভারে কারখানা করার জন্য প্লট দিয়েছি, সেখানে কমপ্লায়েন্স অর্জনের জন্য তাদের যে কাজগুলো করার কথা ছিল সেটি তারা করতে পারেনি। আবার আমরা (বিসিক) সেখানে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যে সিইটিপি প্লান্ট করার কথা ছিল সেখানে সামান্য ঘাটতি আছে। অতএব উদ্যোগের অভাবে আমরা কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাইনি। তবে আমি আশা করছি খুব দ্রুত এখান থেকে ভালো ফলাফল আমরা পাব।’
প্রতি বছর কোরবানির ঈদের সময় প্রচুর পরিমাণে পশু জবাই হয়। তখন বিপুল পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ করে কোম্পানিগুলো। কিন্তু ১৫ বছর ধরে কাঁচা চামড়ার দাম অন্তত ৫০ শতাংশ কমেছে। পর্যাপ্ত রফতানি না হওয়া এবং রফতানিতে ভালো দাম না পাওয়া, বিনিয়োগ করে কাঙ্ক্ষিত লাভ না হওয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা কাঁচা চামড়া কেনার ক্ষেত্রে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে ক্রমেই কমছে এর দাম। গরু ও ছাগলের কাঁচা চামড়ার দাম (পাইকারি) কমার হার গত ১৫ বছরে ৫০ শতাংশের বেশি।
আরব লেদারের স্বত্বাধিকারী মো. ইলিয়াসুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল সাভারে গেলে ভালো দামে চামড়া বিক্রি করতে পারব, বিদেশী ক্রেতারা আসবে। কিন্তু এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে ব্যবসাই বন্ধ হওয়ার পথে।’ কেন চামড়া শিল্প সাভারে দাঁড়াতে পারেনি এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিসিক ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প নিয়ে কাজ করে। কিন্তু চামড়া শিল্প কখনই ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের আওতায় পড়ে না। আমাদের একেকটি মেশিনের দামই ২-৫ কোটি টাকা। একটি কারখানা স্থাপন করতে হলে অন্তত ১৫-২০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। এটা কোনোভাবেই ক্ষুদ্র শিল্প নয়। বৃহৎ শিল্প যদি ক্ষুদ্র শিল্পের পরিকল্পনা দিয়ে চলে, তাহলে সেটা কখনই সফল হতে পারে না। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।’
১৯৫০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত রাজধানীর হাজারীবাগ ছিল ট্যানারি শিল্পের বৃহৎ ঠিকানা। কিন্তু ট্যানারি শিল্প এলাকায় ছিল না আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। আবার লোকালয়ের কাছে হওয়ায় এর দূষণ বিপর্যস্ত করছিল স্থানীয়দের, দূষিত হচ্ছিল বুড়িগঙ্গা। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প সরাতে ২০০৩ সালে সাভার চামড়া শিল্পনগরীর প্রকল্প হাতে নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। মোট ১২ দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ১ হাজার ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হয় এ নগরী।