জুলাই ঘোষণাপত্রে দাবি

ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করেছে এক-এগারোর সরকার

শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করেছে এক-এগারোর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা—এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। যদিও সেই সরকারকে বৈধ এবং সংস্কারের পথ সুগমকারী হিসেবেই দাবি করে আসছেন সে সরকারসংশ্লিষ্ট অনেকে।

শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করেছে এক-এগারোর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা—এমনটা উল্লেখ করা হয়েছে জুলাই ঘোষণাপত্রে। যদিও সেই সরকারকে বৈধ এবং সংস্কারের পথ সুগমকারী হিসেবেই দাবি করে আসছেন সে সরকারসংশ্লিষ্ট অনেকে। সেই সঙ্গে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনকে সবচেয়ে সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবেও মূল্যায়ন করেছেন এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবং সমন্বয় কমিটির সংশ্লিষ্টরা।

গতকাল বিকালে ঘোষণা করা জুলাই ঘোষণাপত্রের ৬ নম্বর দফায় বলা আছে, ‘যেহেতু দেশী-বিদেশী চক্রান্তে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়ায় এক-এগারোর ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থার মাধ্যমে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতা, আধিপত্য ও ফ্যাসিবাদের পথ সুগম করা হয়।’

এর আগের দিন অর্থাৎ সোমবার, ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় অন্তর্বর্তী সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি থেকে দেয়া এক পোস্টে লেখেন, ‘এক-এগারোর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে!’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ স্ট্যাটাস কৌতূহলী আলোচনার জন্ম দেয়। কিছুক্ষণ পর মাহফুজ আলম তার স্ট্যাটাসে ‘তবে, জুলাই জয়ী হবে। জনগণের লড়াই পরাজিত হবে না।’ লাইনটি যুক্ত করেন।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিল, তাতে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। বর্তমানে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সেই সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ছিলেন মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান। তিনি বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব সামলেছেন।

এদিকে গতকাল সকালে রাজধানীর বিজয়নগরে আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির উদ্যোগে জুলাই অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতা না হলে এবং বিভেদ ও অনৈক্যজনিত ভুল অব্যাহত থাকলে দেশ অনিবার্যভাবে ওয়ান-ইলেভেনের দিকে যাবে।’

এরপর গতকাল রাতে জুলাই ঘোষণাপত্রে এক-এগারো সরকার বিষয়ে উল্লেখ প্রসঙ্গে আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেহেতু শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের উৎসমুখ হিসেবে ধরা হয় এক-এগারোকে এবং এটা যে ভারতীয় যোগসাজশে একটা আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ছিল তা এখন অত্যন্ত পরিষ্কার। পরবর্তী সময়ে ভারতের রাষ্ট্রপতির লেখা বইসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ লোকদের ভাষ্যে তা উঠে এসেছে। এ ইস্যুটা ঘোষণাপত্রে থাকা তাই ইতিহাসের শিক্ষার জন্য যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি।’

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির মধ্য দিয়ে সেনাবাহিনীর সমর্থনে ক্ষমতায় এসেছিল ড. ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার। সেই সরকারে বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা দায়িত্ব পালন করেন। এদের মধ্যে আইন উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন। এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে হোসেন জিল্লুর রহমান এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ে বেগম গীতিআরা সাফিয়া চৌধুরী উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।

এক-এগারোর সরকারকে ফ্যাসিবাদের পথ সুগমকারী হিসেবে দেখতে নারাজ সে সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মহিলা ও শিশুবিষয়ক এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করা রাশেদা কে চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘এক-এগারো নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। দ্বিমত থাকতে পারে। কিন্তু এত বছর পর এসে এটি নিয়ে বিতর্ক তোলার কোনো সুযোগ নেই। এক-এগারো সরকারের সঙ্গে এখানে কোনো বিরোধ তো আর নেই। ওটাও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়েছে। ২০০৮ সালের যে নির্বাচন সেটি “‍ওয়ান অব দ্য বেস্ট ইলেকশন” বলে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। সেই নির্বাচন শুধু মেনে নিয়েছিল তা নয়; শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছিল। কোনো ঝামেলা হয়নি। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো তখন ভুয়া ভোটার, এনআইডি কার্ডসহ নানাভাবে আর্মি সহায়তা করেছিল, যা নিয়ে দেশের ভেতরে ও বাইরে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। প্রশ্ন যেহেতু ওঠেনি তার মানে ধরে নিতে হবে এটি গ্রহণযোগ্য ছিল। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে ক্ষমতার লোভে পরবর্তী সময়ে এটিকে কলুষিত করা হলো। তার জন্য এক-এগারোকে দায়ী করে লাভ নেই।’

এ বিষয়ে কথা বলতে চাইলে অস্বীকৃতি জানান এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।’

এক-এগারোর সরকারে ক্যাবিনেট সেক্রেটারির দায়িত্ব পালনকারী আলী ইমাম মজুমদারের (অন্তর্বর্তী সরকারের খাদ্য ও ভূমি উপদেষ্টা) সঙ্গে যোগাযোগ করলে এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না বলে বণিক বার্তাকে জানান।

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ক্ষমতা গ্রহণকারী ‘‌ওয়ান-ইলেভেনের’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি-অনিয়মবিরোধী অভিযানের জন্য গঠিত ‘গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত জাতীয় সমন্বয় কমিটির’ প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পেয়েছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ২০২৩ সালের ২১ অক্টোবর বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এক-এগারোর সরকারকে বৈধ বলাসহ বেশকিছু বিষয়ে মন্তব্য করেন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একটা কথা প্রায় বলি, ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার টিএন সেশান এ উপমহাদেশে একটি উজ্জ্বলতম দৃষ্টান্ত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারও চেয়েছিল তেমনই একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করতে, যে নির্বাচন কমিশন মেরুদণ্ড সোজা রেখে কথা বলতে পারে। এর ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক নেই। যারা হেরেছেন তারা বলতে পারছেন না যে তাদের কারচুপি করে হারানো হয়েছে। অন্যদিকে যারা জিতেছেন তাদের নিয়েও কেউ বলতে পারছেন না যে তারা কারচুপি করে জিতেছেন। এর মানে নির্বাচনটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ ছিল, যা দেশে ও বিদেশে গ্রহণযোগ্য ছিল।’

এক-এগারোর সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন কেন সম্ভব হয়নি এমন প্রশ্নে সেই সরকার দীর্ঘায়িত হলে ভালো হতো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একটা বিষয় হলো মানুষ কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। দুই বছর স্বাভাবিকভাবেই খুব কম সময় ছিল। এ সিস্টেমটা যদি পাঁচ-দশ বছর চলত, তাহলে একটি প্রজন্ম শিখে ফেলত যে আমরা দুর্নীতির মধ্য দিয়ে যাব না।’

এক-এগারোর শুরুর দিনগুলোয় ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্বে ছিলেন সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্মকর্তা চৌধুরী ফজলুল বারী। এছাড়া ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি জরুরি অবস্থা ঘোষণার সময় তিন বাহিনীর প্রধানসহ অন্যদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। চলতি বছরের ২ জুন বণিক বার্তাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যদি সংস্কারে গুরুত্ব দিত তাহলে তো ১৬ বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সুযোগই পেত না। দুইবার যদি প্রধানমন্ত্রী না হওয়ার সিদ্ধান্ত হতো তাহলে তো হতোই। সেই ২০০৮-এ ছিল, এরপর আবার হলো। এর আগে আরো একবার ছিল। এরপর তো এতবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ থাকত না তার। ওই সময়ে যদি ওই সংস্কারগুলো হতো তাহলে বড় একটা বিপদ থেকে মানুষ বাঁচতে পারত।’

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর একটি সাক্ষাৎকারে এক-এগারো বিষয়ে বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত বছর ২৫ নভেম্বর বণিক বার্তায় তার একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশ হয়েছিল। এতে তার কাছে একটি প্রশ্ন ছিল ‘বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারে এক-এগারোর অনেকে আছেন। বিএনপি মাইনাসের কোনো শঙ্কা কাজ করে আপনাদের মধ্যে?’ জবাবে মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘আমি সেটা মনে করি না। বিএনপি মাইনাস করার ক্ষমতা কারো নেই। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বিএনপি একটি রিয়েলিটি (বাস্তবতা)। তার রাজনীতির কারণেই বিএনপি সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল। আপনারা আমার সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন। মোটা দাগে দুটি কারণ বলা যায়, একটা হচ্ছে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতন্ত্র; আরেকটা হচ্ছে জাতিগত স্বকীয়তার ধারণা। আমরা আলাদা জাতি, এ অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আলাদা অস্তিত্ব আছে আমাদের। আমরা পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা বা আসাম নই, আমরা বাংলাদেশ। আমাদের এই স্বাতন্ত্র্যকেই ধারণ করে বিএনপি। একই সঙ্গে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিএনপি আপসহীন।’

জুলাই ঘোষণাপত্রের এক-এগারোর ব্যবস্থার নেতিবাচক মূল্যায়ন যুক্ত হওয়া এবং এ বিষয় সেই সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একজন উপদেষ্টার প্রতিবাদ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সিনিয়র সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এক-এগারো যে একটি ষড়যন্ত্রমূলক ব্যবস্থা ছিল তা জুলাই ঘোষণাপত্রের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো সবার সামনে এসেছে বিষয়টি এমন নয়। ওই সরকার গঠনের পর খুব অল্প মানুষই এর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ নিজেও এ সরকারকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছে। যেখানে বিএনপির অবস্থানও একই। তখন রাজনীতিতে নেতৃত্বশূন্য করার যে প্রচেষ্টা হয়েছিল তা আমাদের দেশের একটি কালো অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। যার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো সম্মিলিতভাবে এক-এগারোর এ ব্যবস্থাকে ঘোষণাপত্রে যুক্ত করেছে।’

আরও