দেশে ব্যাংক ঋণের সুদহার ৯ থেকে বেড়ে ১৬ শতাংশে ঠেকেছে। এত উচ্চ সুদেও প্রত্যাশা অনুযায়ী মিলছে না ঋণ। এ পরিস্থিতিতে ধুঁকতে থাকা বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য আরো কমিয়ে এক অংকের ঘরে নামিয়ে এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন মুদ্রানীতিতে এ খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ। যদিও দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ৮০ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। গত এক যুগেও বেসরকারি খাতে এত কম ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করতে দেখা যায়নি।
গতকাল ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, ‘মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় না আসা পর্যন্ত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অব্যাহত থাকবে।’ গত অর্থবছরের মুদ্রানীতিতেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রধান লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। যদিও সে লক্ষ্য অর্জনে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য থাকলেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (রেপো রেট) ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে বিশেষ রেপো বা স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) ঊর্ধ্বসীমা ও সুদহার করিডোরের নিম্নসীমা রিভার্স রেপো বা স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ)। বর্তমানে এসএলএফ ও এসডিএফের সুদহার যথাক্রমে ১০ ও ৭ শতাংশ। তারল্যর প্রয়োজনে বাণিজ্যিক ব্যাংক যখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ধার করে, তখন তার সুদহার ঠিক হয় রেপোর মাধ্যমে। আর রিভার্স রেপোর মাধ্যমে বাংকগুলো তাদের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা রাখে। রেপো রেটকে নীতি সুদহার নামে অভিহিত করা হয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ মুহূর্তে দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট হলো সুশাসনের তীব্র অভাব ও সীমাহীন অনিয়ম-দুর্নীতি। কিন্তু ঘোষিত মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেই। ব্যাংক খাত সংস্কার ও দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিষয়েও মুদ্রানীতিতে কিছু বলা হয়নি। এতে ব্যাংক খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি আরো বেশি উৎসাহিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন মুদ্রানীতিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গতানুগতিক মুদ্রানীতির ধারাবাহিকতা বলে অভিহিত করেছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেছেন, নতুন মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১ থেকে দেড় শতাংশ বাড়ানোর প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেটি করেনি। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নীতি সুদহার আরো বাড়ানোর দরকার ছিল। ডলারের বিনিময় হারের ক্রলিং পেগ সীমা ২ শতাংশে উন্নীত করতে পারত। কিন্তু এর কোনোটিই মুদ্রানীতিতে নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের মধ্যবর্তী দাম ১১৭ টাকা নির্ধারণ করে ১ টাকা কম-বেশি করার সুযোগ দিয়েছে। এটি ২ শতাংশ পর্যন্ত বর্ধিত করলে বাজার পরিস্থিতি আরো বেশি স্বাভাবিক হয়ে আসত।’
আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘দেশের ব্যাংক খাতের সবচেয়ে বড় সংকট এখন অনিয়ম-দুর্নীতি তথা করপোরেট গভর্ন্যান্সের তীব্র অভাব। মুদ্রানীতিতে এ বিষয়ে কোনো কথা নেই। ব্যাংক খাত সংস্কারের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে রোডম্যাপ আশা করেছিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে দুর্বল ব্যাংকগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এটি কখনো সমাধান হতে পারে না। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্পষ্ট ঘোষণা না এলে মূল্যস্ফীতি কমবে না।’
অর্থ সংকটে থাকা সরকার ঋণের জন্য দেশের ব্যাংক খাতনির্ভর হয়ে পড়েছে। চলতি অর্থবছরের ঘাটতি বাজেট পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। এ ঋণের জোগান দিতে সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আগামী জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হবে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ। আর সরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য হবে ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
মুদ্রানীতিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, বাংলাদেশ বর্তমানে বেশ কয়েকটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন। এসব সমস্যা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ চ্যালেঞ্জগুলো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক উভয় দিক থেকে উদ্ভূত। এটি নীতিনির্ধারকদের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। ক্রমাগত উচ্চ মূল্যস্ফীতির ফলে ক্রয়ক্ষমতা ও প্রকৃত আয় হ্রাস পাচ্ছে। এতে আয়বৈষম্য আরো বেড়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা মোকাবেলায় উৎপাদন বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কৃষি ও সিএসএমই খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
ডলার সংকট সামলাতে দুই অর্থবছর ধরে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য বেশির ভাগ পণ্য আমদানিতে শতভাগ মার্জিন রাখার বিধান জারি করা হয়েছিল। তবে নতুন মুদ্রানীতিতে এ নীতি থেকে কিছুটা সরে আসা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, আমদানি উদারীকরণের জন্য বিলাসবহুল পণ্য (যেমন গাড়ি, ফুল, ফল, প্রসাধনীসহ অনুরূপ অন্যান্য আইটেম) ব্যতীত অন্য সব পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় এলসি মার্জিন ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে। মুদ্রানীতিতে বলা হয়, ‘উচ্চ খেলাপি ঋণ আর্থিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করে। উৎপাদনশীল বিনিয়োগের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা সীমিত করে দেয়। বাংলাদেশ ব্যাংক স্বচ্ছতা, সুশাসন ও প্রায়োগিক দক্ষতার ওপর জোর দিয়ে খেলাপি ঋণ কমাতে পদক্ষেপ নিয়েছে।’
প্রতি অর্থবছরে দুবার সংবাদ সম্মেলন করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে মুদ্রানীতি উপস্থাপনের পাশাপাশি গভর্নরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দেয়া হতো। কিন্তু এবার গণমাধ্যমকর্মীদের এড়াতে কেবল সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতিসহ নানা ইস্যুতে গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার খুবই বিব্রত। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকে প্রবেশ ইস্যুতে সাংবাদিকরা গভর্নরকে বয়কট করে আসছেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে গভর্নর গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে আসতে চাননি। এ কারণে সংবাদ সম্মেলনের পরিবর্তে প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছে।’