বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা ও বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ এ পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। জেলার বিভিন্ন এলাকায় সড়কের ধারে থাকা শিরিষ, মেহগনি, রেইনট্রি ও নিমগাছ ও অন্যান্য প্রজাতির গাছের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে। ডালপালা মরে যাচ্ছে এবং অনেক গাছ এরই মধ্যে সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে পড়েছে। এতে সরকারিভাবে গড়ে তোলা বনায়ন প্রকল্প এখন চরম সংকটে। একদিকে অজ্ঞাত রোগ ও পোকামাকড়ের আক্রমণে শত শত গাছ মরে যাচ্ছে, অন্যদিকে অপরিকল্পিতভাবে মাটি খনন ও ঘের তৈরির ফলে ধসে পড়ছে নারকেল ও তালগাছ। এর জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০১ সালের দিকে ডুমুরিয়া উপজেলার নয়টি প্রধান সড়কের পাশে বন বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অর্থায়নে বনায়ন কর্মসূচি শুরু হয়। সড়কের দুপাশে রোপণ করা হয় শিরিষ, মেহগনি, রেইনট্রি ও নিমগাছ। এছাড়া বপন করা হয় বাবলার বীজ। দুই দশকে এসব গাছ বড় হওয়ায় পুরো এলাকায় এক দৃষ্টিনন্দন ও শীতল পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি একের পর এক গাছ শুকিয়ে যেতে থাকায় সড়কের সৌন্দর্য যেমন কমছে, তেমনি পরিবেশগত ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে মাটির লবণাক্ততা বাড়ায় গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড়ের আক্রমণ, যা গাছের পাতা ও কাণ্ডের ক্ষতি করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, ২০২২ সালের মার্চ থেকে হঠাৎ গাছগুলোর ডাল-পাতা শুকাতে শুরু করে। পর্যায়ক্রমে গাছের ছাল শুকিয়ে মরে যাচ্ছে। সরজমিনে দেখা যায়, কৈয়া-মোস্তর মোড়, শৈলমারী-শরাফপুর, শাহাপুর-ফুলতলাসহ নয়টি সড়কের পাশে এখন শুধু মরা ও মৃতপ্রায় গাছের সারি। ডুমুরিয়া সদরের প্রবীণ সাংবাদিক ও অবসরপ্রাপ্ত কলেজ শিক্ষক আবদুল কাদের খান বলেন, ‘অজ্ঞাত রোগে শত শত গাছ মরে গেছে। অনেক গাছ আধামরা অবস্থায় আছে। দেখভালের কেউ না থাকায় সুযোগসন্ধানীরা এসব মরা গাছের গোড়া কেটে নিয়ে যাচ্ছে।’
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইনসাদ-ইবনের মতে, একধরনের পোকা কাণ্ডের নরম অংশ খেয়ে ফেলায় গাছগুলো পুষ্টিহীন হয়ে মারা যাচ্ছে। এছাড়া নোনাপানির প্রভাব ও ভাইরাসের আক্রমণকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। ডুমুরিয়া উপজেলা সামাজিক বন কর্মকর্তা মো. লিয়াকাত আলী খান জানান, আক্রান্ত গাছগুলো রক্ষায় বালাইনাশক ছিটানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে এবং মৃত গাছগুলো নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার উপপরিচালক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বাবলা গাছে সাধারণত পোকামাকড়ের আক্রমণ তেমন হয় না। এ গাছ নোনাপানির প্রভাবেও সহজে মরে যায় না। ফলে সড়কের পাশে কেবল এ গাছগুলো টিকে গেছে।
সড়ক বনায়নের দায়িত্বে থাকা এলজিইডি ও পাউবোর মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা মড়কের বিষয়টি নিয়ে অন্ধকারে থাকলেও এখন খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিচ্ছেন।
অন্যদিকে সদর উপজেলার এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে সাজিয়াড়া-থুকড়া গফফার সড়কের দুই পাশ ঘেঁষে পাঁচ কিলোমিটার সড়কে ১ হাজার ২০০ নারকেল ও পাঁচ শতাধিক তালের চারা রোপণ করে এলজিইডি। রোপণ করা নারকেল ও তালগাছগুলো পাহারা ও পরিচর্যার জন্য ২০০৪-১০ সাল পর্যন্ত পাঁচজন নারী শ্রমিক নিয়োগ দেয়া হয়। ২০১১ সাল পর্যন্ত আট বছরে এ গাছ রক্ষণাবেক্ষণে ১২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সড়কের গা ঘেঁষে অপরিকল্পিতভাবে মাটি খনন করে মাছের ঘের তৈরি করায় পাড় ধসে পড়ছে। এতে গাছগুলোর গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়ে শিকড় উন্মুক্ত হয়ে নুয়ে পড়ছে।
সরজমিনে পরিদর্শন করে গাছগুলো রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার। এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মোহাম্মাদ দারুল হুদা জানান, দ্রুত সড়কের জায়গা নির্ধারণ করে গাছের গোড়ায় মাটি দেয়া ও পাহারাদার নিয়োগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।
সার্বিক ব্যাপারে খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত জানান, নতুন যোগদান করায় বিষয়টি সম্পর্কে জানেন না তিনি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।