চট্টগ্রাম-৮

গণঅভ্যুত্থানে সরব থাকলেও জোট-নিজ দলের আনুকূল্যে নেই এনসিপির প্রার্থী

জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর এই আচরণ ঐক্যের মূলমন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা বলে জানিয়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম-৮ আসন জোটের সমঝোতায় এনসিপিকে দেয়া হলেও একই আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী ডা. আবু নাসের নির্বাচন থেকে সরে যায়নি। এতে এই আসনের ভোটের হিসাব পাল্টে যায়। এনসিপি প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি জানালেও কাজে আসেনি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) সংসদীয় আসনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমেই জটিল রূপ নিচ্ছে। ১১ দলীয় জোটের আসন সমঝোতা অনুযায়ী আসনটি নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জন্য বরাদ্দ দেয়া হলেও বাস্তবে নির্বাচনী মাঠে দলটির প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফ দল-জোট কারও আনুকূল্য পাচ্ছেন না। মূলত কোট সংস্কার নিয়ে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অংশগ্রহণ সত্ত্বেও দল গঠন, নির্বাচনে চট্টগ্রাম অঞ্চলের জোট ও দল থেকেও মনোযোগ পাচ্ছে না এখানকার সংগঠকরা।

মূলত চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসন জোটের সমঝোতায় এনসিপিকে দেয়া হলেও একই আসনে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে যায়নি। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু নাসের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় এই আসনের ভোটের হিসাব পাল্টে যায়। শুরুতে প্রকাশ্যে প্রচারণায় না নামলেও এনসিপির পাশাপাশি ডা. আবু নাসের নিজেও সরাসরি প্রচারণায় নেমেছেন। এনসিপি প্রার্থী সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ জানানোর পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী ও নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিষয়টি জানালেও কাজে আসেনি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল গঠনের পর দলটির কার্যক্রম জাতীয় শীর্ষ নেতৃত্বকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করার পর শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে ভাঙন, ভাঙন পরবর্তী বেশ কয়েকজন শীর্ষনেতার বিএনপিতে যোগদান এমনকি প্রভাবশালী নেতৃত্বের স্বতন্ত্র প্রতীকে নির্বাচনের পর প্রান্তিক অঞ্চলের নেতৃত্বের দিকে মনোযোগ নেই। যার কারণে সমঝোতা অনুযায়ী দেশব্যাপী জোট থেকে ২৭ আসনে এনসিপিকে আসন ছেড়ে দেয়া হলেও চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ভিন্ন আচরণ করছে জামায়াতে ইসলামী।

এদিকে ১১ দলীয় জোটের অভ্যন্তরে আসন বণ্টন নিয়ে সমন্বয়হীনতা রয়েছে বলে দাবি করেছে এনসিপির একাধিক নেতৃত্ব। তাদের দাবি-সমঝোতা অনুযায়ী চট্টগ্রাম অঞ্চলের মধ্যে চট্টগ্রাম-৮ ও নোয়াখালীর হাতিয়া আসনটি এনসিপিকে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে নিজ দলের নেতৃবৃন্দও উদাসীন। ফলে সংবাদ সম্মেলন করেই বিষয়টি নিয়ে সুরাহা চেয়েছেন চট্টগ্রাম-৮ এর এনসিপি প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফ।

সম্প্রতি নগরীর বহদ্দারহাট এলাকায় এ বিষয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফ অভিযোগ করেন, জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে এনসিপির প্রার্থী নির্বাচন করার কথা ছিল। কিন্তু জামায়াতের প্রার্থী সরে না দাঁড়ানোয় ভোটের মাঠে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তিনি আরো অভিযোগ করে বলেন, জোটের ঐক্য বজায় থাকলে ভোটারদের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা দেয়া সম্ভব হতো। কিন্তু জোটের অন্যতম শরীক দলের প্রার্থী নির্বাচন থেকে সরে না গিয়ে এখন প্রকাশ্যে প্রচারণায় আছে। এতে জোট প্রার্থী হিসাবে এনসিপির নির্বাচনী প্রচারণা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোটাররা বিভ্রান্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এই আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। এনসিপির জোটপ্রার্থী থাকায় এই আসনে বিএনপির প্রার্থী শুরুতে অনেকটা নির্ভার ছিলেন। কিন্তু মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আবু নাসের প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করায় পুরো হিসাব বদলে যায়।

জোটের আরেক শরিক খেলাফত মজলিসের নেতা মোহাম্মদ এনায়েত উল্লাহও অভিযোগ করে জানান, তিনি নিজে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে এনসিপির প্রার্থীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। জোটের অন্য শরিক দলগুলো সমঝোতা অনুযায়ী প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে জোটপ্রার্থীর প্রচারণায় থাকার কথা ছিল। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর এই আচরণ ঐক্যের মূলমন্ত্রের সঙ্গে প্রতারণা বলে জানিয়েছেন তিনি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিএনপি ও জামায়াত দুই দলেরই এই আসনে দীর্ঘদিনের শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে পরিচিত এবং পূর্বে জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থী ডা. আবু নাসের জাতীয় নির্বাচনে নতুন মুখ হলেও স্থানীয়ভাবে চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাসেবা, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের কারণে বোয়ালখালী ও চান্দগাঁও এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় একটি সমর্থক গোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। বিপরীতে এনসিপির প্রার্থী জোবায়রুল হাসান আরিফ এই আসনের স্থায়ী বাসিন্দা নন। আবার এনসিপির মধ্যে নানান ভাঙন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপস্থিতি না থাকায় নির্বাচনে বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের অংশীদার প্রার্থী হয়েও নির্বাচনে অনেকটা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন তিনি।

চট্টগ্রাম-৮ আসনে এবার মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৫৬ হাজার ৭২৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৪ হাজার ৬০৬ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৭২ হাজার ১২২ জন। মোট ১৭৯টি ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ভোটারের পাশাপাশি ভৌগোলিক অর্থনৈতিক গুরুত্বের কারণে এই আসনের ফলাফল নিয়ে উদগ্রীব প্রার্থী ও ভোটাররা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম-৮ সংসদীয় আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এনসিপির জোবায়রুল হাসান আরিফ বণিক বার্তাকে বলেন, সমঝোতার মাধ্যমে চট্টগ্রাম-৮ আসনটি এনসিপির জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করে কিছুদিন নিরব থাকলেও হঠাৎ করেই জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী প্রচারণায় নেমেছেন। জামায়াতের সমাবেশেও দলটির কেন্দ্রীয় আমির ডা. শফিকুর রহমানও জোট প্রার্থী হিসাবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজ দলের প্রার্থী জোটের ঐক্যের বিরুদ্ধে গিয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রচারণায় নেমে নির্বাচনের মূল স্পিরিট বিনষ্ট করছেন বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।

নির্বাচন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জোটের সমঝোতায় সারা দেশে কোন দলের প্রার্থী নির্বাচন করবে সেটি যেকোনো দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। এর ব্যত্যয় হলে কেন্দ্র থেকেই জোটের শীর্ষ নেতৃত্ব সমাধান করবে। কিন্তু চট্টগ্রাম-৮ আসনের ক্ষেত্রে এনসিপির প্রার্থী নিজ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে এই সংকটের কোনো সুরাহা পায়নি। যার কারণে সংবাদ সম্মেলন করে সৃষ্ট জটিলতায় বিষয়ে অভিযোগ জানাতে হচ্ছে। আবার এনসিপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দের অনেকেই নিজ নিজ নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত থাকায় আসন সমঝোতার অন্যান্য আসন নিয়ে ভাবার সময় পাচ্ছেন না। আবার চট্টগ্রাম-৮ আসনকে জোটের আসন হিসাবে গুরুত্বহীন ভাবায় এখানে ত্রিমুখী নির্বাচনী লড়াই সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

আরও