৫০০ শয্যার কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে একটি বড় মাইলফলক হলেও ১০ বছরেও শেষ হয়নি এর নির্মাণকাজ। এর মধ্যে তিনবার ব্যয় বাড়িয়ে ২৭৫ কোটি টাকার কাজ নিয়ে যাওয়া হয়েছে ৬৮২ কোটি টাকায়। অন্যদিকে কোনো স্থাপনার কাজ শেষ না করেই ক্রয় করা ৭০ কোটি টাকার বিদেশী চিকিৎসা সরঞ্জাম এখন নষ্টের পথে।
মেডিকেল কলেজের স্টোর অফিসার মুসফিকুর রহমান জানান, সরঞ্জামগুলো পড়ে রয়েছে। সময়মতো ব্যবহার করা না হলে এর কার্যক্ষমতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কার কথাও তিনি জানান।
এদিকে মেডিকেল কলেজটি স্থায়ী ক্যাম্পাসে ফিরতে না পারলেও ক্লাস করছেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে ছয়টি ব্যাচ বিদায়ও নিয়েছে এমবিবিএস সার্টিফিকেট নিয়ে। অনেকেই লেখপড়ার শেষ দিকে। তারা ডাক্তার হয়েছেন অথচ সেখানে হাসপাতালই ছিল না। একটি জেনারেল হাসপাতালে তারা ইন্টার্ন করেছেন।
এ বছরেই শেষ হয়ে যাবে লেখাপড়া এমন এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তাদের সঙ্গে যথেষ্ট তামাশা করা হয়েছে। যেখানে সরকারের অর্থ বরাদ্দে কোনো সমস্যা ছিল না। শুধু নির্মাণকাজে গড়িমসি করে কাটিয়ে দেয়া হয়েছে ১০টি বছর। তৃতীয় বর্ষের মীর্জা রাকিবুল হাসান জানান, অনেকের মতো তিনিও ভাবছেন, এভাবেই হয়তো তাকেও বিদায় নিতে হবে।
তবে সবদিক বিবেচনা করে চলতি বছরের মধ্যেই মেডিকেল কলেজটি স্থায়ী ক্যাম্পাসে ফিরবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ দেলদার হোসেন।
মেডিকেল কলেজ সূত্র জানায়, বৃহত্তর কুষ্টিয়া অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নে একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী এ দাবি প্রথম বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয় ১৯৭৯ সালে। ওই কুষ্টিয়া শহরের হাউজিং এলাকায় প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের। কিন্তু নির্মাণের কোনো উদ্যোগ ছিল না। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মেডিকেল কলেজটি অনুমোদন পায়। এরপর আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে সরকার গঠন করার পরপরই মেডিকেল কলেজ বাস্তবায়নে উদ্যোগ গ্রহণ করে। কোনো রকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই ২০১২-১৩ অর্থবছরকে অর্থসাল ধরে ২০৬ কোটি টাকা প্রাক্কলন ব্যয় ধরা হয়। পরে ২০৬ থেকে বাড়িয়ে ২৭৫ কোটি টাকা ধরে শুরু হয় কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ। তখনো জমি বরাদ্দ, জমি অধিগ্রহণ কিছুই সম্পন্ন ছিল না। এমনকি মেডিকেল কলেজ স্থাপনে সরকারের নির্ধারিত সব প্রতিষ্ঠানকে অন্তর্ভুক্ত না করেই একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ শুরু করা হয়। কাজ শেষ করার সময়সীমা দেয়া হয় ২০১৫ সাল। ২০১৩ সালের ৫ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুষ্টিয়া সফরে এলে প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কাজ শুরুর পর প্রথম দফায় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে, দ্বিতীয় দফায় ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাড়ানো হয় মেয়াদ। এরপর থেকে একের পর এক জটিলতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম একসময় আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়। ২০১৯ সালে নির্মাণাধীন হাসপাতাল ভবনের ছাদ ধসে এক শ্রমিকের মৃত্যু হলে আবার বাধাগ্রস্ত হয় কাজ। এরপর ২০২১ সালের ৫ অক্টোবর একনেক সভায় প্রকল্পের সংশোধিত ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল (ডিপিপি) অনুমোদন হয়। তখন প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৬৮২ কোটি টাকা। সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় ২০২৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ৬৮২ কোটি টাকার প্রকল্পটির মধ্যে একাডেমিক ভবন, ছাত্রছাত্রী হোস্টেল এবং ডরমিটরিসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ছয়টি ব্লকে বিভক্ত হাসপাতাল চত্বরটিও দৃশ্যমান। তবে ১৯টি লিফট স্থাপনসহ বিদ্যুৎ, পানির রিজার্ভ ট্যাংক, মেডিকেল গ্যাস প্লান্ট, সেন্ট্রাল এসি, সীমানা দেয়াল, বর্জ্য অপসারণ ট্যাংক ও জরুরি বিভাগের সামনে পাকা সড়ক নির্মাণসহ আনুষঙ্গিক কিছু কাজ বাকি আছে। চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণকাজ সম্পন্ন করছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ কাজ করছে মেসার্স জহিরুল লিমিটেড।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জহিরুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রকল্পটি ২০০৮ সালে অনুমোদন পেলেও নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৩ সালে।’ নির্মাণকাজে ঢিলেমির অভিযোগে তিনিও পাল্টা অভিযোগ তোলেন, এ প্রকল্পে সময়মতো অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় নির্মাণকাজে গতি কমেছে। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ দেরিতে শুরু হওয়ায় ব্যয় কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।’
আরেক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজের মালিক এসএম শামীম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের কাজে কোথাও কোনো ত্রুটি নেই। একটি বিল সাবমিট করার কতদিন পর বিল দেয়া হয়েছে সেটা একবার খোঁজ নেন। বিল না পাওয়ায় অনেক কাজ সময়মতো এগিয়ে নেয়া যায়নি।’
এদিকে ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতাও এখনো নিরসন হয়নি। প্রায় তিন বিঘা জমি নিয়ে একটি মামলা চলমান আদালতে। এ কারণে ওই জমিতে এখনো শুরু করা যায়নি ভবন নির্মাণকাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, মামলা শেষ না হলে ওই জমিতে নির্ধারিত ভবন নির্মাণ সম্ভব হবে না। তবে সেটা কী ধরনের ভবন সেটা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।
এছাড়া ভবন নির্মাণ শেষ না হলেও ২০১৪ সালের করা একটি দরপত্রে প্রায় ৭০ কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয় করা হয়েছে। পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে একটি এমআরআই মেশিন, একটি সিটি স্ক্যান মেশিন, তিনটি অত্যাধুনিক সিয়াম এক্স-রে মেশিন এবং তিনটি জীবাণুমুক্তকরণ অটোক্লেভ মেশিনসহ অন্যান্য সরঞ্জাম। ওয়ার্ড ও কেবিনের শয্যা, ১৬টি অপারেশন থিয়েটার, সিসিইউ-আইসিইউ, অর্থোপেডিক, নিউরোলজি, নেফ্রোলজি, কার্ডিওলজি, গাইনি, চক্ষু ও নাক-কান-গলাসহ অন্যান্য বিভাগের জন্য এসব সরঞ্জাম আনা হয়েছে।
তবে মেডিকেল কলেজের কয়েকজন কর্মকর্তা বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরে দাবি করেছেন এখনো অনেক কাজ বাকি। কবে শেষ হবে তা নিশ্চিত নয়। নির্মাণবিধি লঙ্ঘন ও অবহেলার অভিযোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একাধিকবার পত্র ও জরিমানাও করা হয়েছে। যদিও কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগ বলছে, কাজের প্রায় ৮৫ শতাংশ শেষ।
কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম বিভিন্ন জটিলতার কথা স্বীকার করেন। তবে তিনি দাবি করেন, এরই মধ্যে ৮৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজগুলো চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করা সম্ভব হবে।
যদিও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রকল্প পরিচালক ডা. সরয়ার জাহান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করা খুবই বিরক্তিকর একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে এখন। কাজটি অন্তত শেষ করাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এখন আর কোনো কথা বলতে ইচ্ছা করে না।’ তবে তিনিও মনে করেন এ বছরের মধ্যেই ভালো কিছু হবে।
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নির্মাণে ধীরগতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই অনিয়ম ও অবহেলা সেখানে সংঘটিত হয়েছে। কারা এগুলোর সঙ্গে জড়িত, তা খতিয়ে দেখা উচিত ছিল। কারা গণপূর্ত বিভাগের কালোতালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিল, এসব অদৃশ্য শক্তি খুঁজে বের করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’