রবীন্দ্রনাথের কাচারিবাড়ি এখন যেন গোয়ালঘর

বারান্দায় বাঁধা গরু ও ছাগল, উঠানজুড়ে গোবর ও খড়ের স্তূপ, ভবনের চারপাশে অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে হাঁস-মুরগি।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে এটি কোনো পরিত্যক্ত গ্রামীণ বাড়ি বা গোয়ালঘর। অথচ এটি বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দেয়া বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কাচারিবাড়ি। এ কাচারিবাড়ির অদূরেই রয়েছে কবির স্মৃতিধন্য কুঠিবাড়ি।

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর পদ্মাপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা এ ঐতিহাসিক স্থাপনার বর্তমান চিত্র শুধু দর্শনার্থীদের হতাশই করছে না, বরং দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলছে।

আরো বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাত্র দুই বছর আগে প্রায় ৯৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি সংস্কার করা হয়েছিল। এ সময় ভেঙে পড়া ছাদ মেরামত, ভবনের অবকাঠামো সংস্কার ও নান্দনিকতা ফিরিয়ে আনার কাজও সম্পন্ন হয়। কিন্তু সংস্কারের পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, নিরাপত্তা ও তদারকির অভাবে সেই জৌলুস খুব দ্রুতই ম্লান হয়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারে না কোনোমতেই।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগেও কাচারিবাড়িটি পরিচ্ছন্ন ছিল। কিন্তু বর্তমানে সেখানে নেই পর্যাপ্ত নজরদারি, নেই দৃশ্যমান নিরাপত্তা। এ সুযোগেই ভবনের বারান্দা ও আশপাশের জায়গা গবাদিপশু রাখার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রতিদিন কাচারিবাড়িতে গরু বেঁধে রাখেন এমন একজন হারুনুর রশীদ আসকারী। তার বাড়ির সঙ্গে এ কাচারিখানা। হারুনুর রশীদ জানান, বৃষ্টি-বাদলা এলে কোনো উপায় না পেয়ে তিনি সেখানে গরু রাখেন। তিনি দাবি করেন, এটা তিনি একাই করেন তা নয়, অনেকেই করেন।

কাচারিবাড়ির সরকারি কাস্টডিয়ান মোহাম্মদ আল-আমিন জনবল সংকটের কথা জানান। তার দাবি, প্রয়োজনীয় কর্মী ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা ও তদারকি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জানা গেছে, কাচারিবাড়ির সামনের কয়েক বিঘা জমি এখনো জেলা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ বা পর্যটকবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগও থমকে আছে। অর্থাৎ সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ হলেও সংরক্ষণের মৌলিক শর্তগুলো এখনো পূরণ হয়নি।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, বিশ্বকবির মতো একটি জাতীয় ঐতিহ্যের ক্ষেত্রে এ সমন্বয়হীনতার দায় নেবে কে? স্থানীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, নাকি সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক কর্তৃপক্ষ? ঐতিহ্য সংরক্ষণ কেবল ভবন মেরামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত নিরাপত্তা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা, দর্শনার্থী ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি।

এ অবস্থার নিন্দা জানিয়েছেন কুষ্টিয়ার কবি-সাহিত্যিক ও রবীন্দ্রপ্রেমীরা। তারা বলছেন, রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ শুধু কুষ্টিয়ার একটি স্থাপনা নয়; এটি বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের অমূল্য উত্তরাধিকার।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর ড. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘দেশ-বিদেশ থেকে আসা দর্শনার্থীরা যখন এ স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনায় এসে গোবর ও খড়ে ভরা উঠান আর গবাদিপশুর সারি দেখেন, তখন প্রশ্নটি শুধু একটি ভবনের নয়; বরং রাষ্ট্র তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় কতটা আন্তরিক সে প্রশ্ন সামনে চলে আসে।’

সম্মিলিত সামাজিক জোট কুষ্টিয়ার চেয়ারম্যান ড. আমানুর আমান বলেন, ‘কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করলেই একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষিত হয় না। সংস্কারের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পর্যাপ্ত জনবল, কার্যকর নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে এমন চিত্রই বারবার ফিরে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘এটা স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন প্রধান কাস্টডিয়ান, তার পরবর্তী প্রতিনিধি উপজেলা প্রশাসন।’

এ বিষয়ে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন।

আরও