এনএসইউ গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের গবেষণা

দেশের ৮৮% স্ট্রোকের রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত

বাংলাদেশের অধিকাংশ স্ট্রোকের রোগীই দেরিতে হাসপাতালে আসেন। আবার যে হাসপাতালে প্রথমে চিকিৎসার জন্য যান সেখান থেকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করতেও বিলম্ব হয়।

বাংলাদেশের অধিকাংশ স্ট্রোকের রোগীই দেরিতে হাসপাতালে আসেন। আবার যে হাসপাতালে প্রথমে চিকিৎসার জন্য যান সেখান থেকে বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করতেও বিলম্ব হয়। এমনকি ওই হাসপাতালে পৌঁছার পর চিকিৎসা শুরু হতেই সময় লাগে গড়ে দেড় ঘণ্টা। ফলে দেশের ৮৮ শতাংশ স্ট্রোকের রোগী জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসা থ্রম্বোলাইসিস থেকে বঞ্চিত হন।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত ‘ইমার্জেন্সি মেডিকেল জার্নালে’।

দেশের পাঁচটি হাসপাতালে পরিচালিত এ গবেষণায় দেখা গেছে যে লক্ষণ দেখা দেয়ার পর থেকে হাসপাতালে ভর্তি হতে একজন স্ট্রোকের রোগীর গড়ে ১৪ ঘণ্টা সময় লেগেছে। তবে এসব রোগী যদি সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছতে পারতেন তাহলে থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হতো, যা রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিত। তবে এ সাড়ে ৪ ঘণ্টা অতিক্রম করলে এ চিকিৎসা পদ্ধতি আর প্রয়োগ করতে পারেন না চিকিৎসকরা। যদিও এ চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং চিকিৎসা পদ্ধতিতে যে ওষুধ ব্যবহার হয় তা ঢাকার বাইরের কোনো হাসপাতালে নেই।

বাংলাদেশের স্ট্রোকের রোগীরা কেন দেরিতে হাসপাতালে আসেন তার কারণ অনুসন্ধানে এ গবেষণা করে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং চিকিৎসকদের একটি দল। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাওলাদারের তত্ত্বাবধানে প্রধান গবেষক হিসেবে এতে কাজ করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী সার্জন ডা. এম আজমাইন ইকতিদার।

গবেষণায় উঠে আসে রোগীদের বিলম্বে হাসপাতালে আসার বেশকিছু কারণ। এর অন্যতম হলো স্ট্রোকের লক্ষণ সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব, হাসপাতালে যেতে সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়া, পরিবহনের ব্যবস্থার নাজুক অবস্থা এবং রোগী প্রথমে যে হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করতে বিলম্ব হওয়া। এছাড়া যেসব রোগী নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ করছেন এবং আগে স্ট্রোক হয়েছিল তাদের ক্ষেত্রেও দেরিতে হাসপাতালে পৌঁছার হার বেশি দেখা গেছে।

একজন রোগী স্ট্রোকের পর হাসপাতালে পৌঁছতে দেরি করেন গড়ে ১৪ ঘণ্টা। আবার রোগী হাসপাতালে পৌঁছার পর চিকিৎসা শুরু হতেই সময় লাগে দেড় ঘণ্টা। এরপর প্রাথমিক চিকিৎসা ও অন্যান্য ডায়াগনোসিস শেষে বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করতে সরকারি হাসপাতাল থেকে দেরি হয় ২০ ঘণ্টা, বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ১৫ ঘণ্টা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র ও নিবন্ধিত চিকিৎসক দেরি করেন সাড়ে ৮ ঘণ্টা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য উঠে আসে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে যেসব রোগী মারা যান তার মধ্যে ১৮ দশমিক ৭৪ শতাংশই স্ট্রোকে। দেশে প্রতি বছর স্ট্রোকের কারণে মৃত্যুর হার প্রতি ১ লাখে ৫৫ জন।

গবেষকরা জানান, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত তাড়াতাড়ি থ্রম্বোলাইসিস করা যায়, তত বেশি সম্ভাবনা থাকে মস্তিষ্কের ক্ষতি কম হওয়া এবং রোগীর পূর্ণ সুস্থতা ফিরে পাওয়ার। থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা পদ্ধতিতে জমাট বাঁধা রক্ত দ্রবীভূত করার জন্য বিশেষ ওষুধ ব্যবহার করা হয়। স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের রক্তনালিতে রক্ত জমাট বাঁধা। থ্রম্বোলাইসিস এ জমাট বাঁধা ভেঙে দেয় এবং মস্তিষ্কের রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক করে।

এ গবেষণায় সহগবেষক হিসেবে যুক্ত ছিলেন আইসিডিডিআর,বির স্টাডি ফিজিশিয়ান ডা. রিদওয়ানা মেহের মান্না, মেডিকেল অফিসার ডা. মুনতাসরিনা আখতার রিম্পি, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ডা. সীমান্ত রয়, ইউনিভার্সিটি অব ফ্লোরিডার ডা. আতিয়া শারমিন বন্যা, ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক ডা. শ্রেষ্ঠা চৌধুরী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) মেডিকেল অফিসার ডা. রেনেসাঁ ইউসুফ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডা. ফারজানা আহাম্মেদ মিমি, ডা. মো. সামি ইউ সাঈদ এবং ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার পিএইচডি গবেষক মিঞা মো. আকিফুল হক।

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে তিন বছর রিসার্চ ফিজিশিয়ান হিসেবে কাজ করেছেন ডা. মুনতাসরিনা আখতার রিম্পি। বর্তমানে আইসিডিডিআর,বির মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত এ চিকিৎক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সচেতনতা না থাকায় অনেকেই বুঝতে পারেন না স্ট্রোক হয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ খুবই কম। অনেক ক্ষেত্রেই বিভাগীয় পর্যায় ছাড়া বিশেষজ্ঞ নিউরোলজিস্ট নেই। ফলে ডায়াগনোসিস করতেই দেরি হয়ে যায়। ইসকেমিক (স্ট্রোকের এক ধরন) স্ট্রোকের রোগীকে যদি স্ট্রোকের সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয় তাহলে তার সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যদিও এ চিকিৎসা পদ্ধতিতে যে ওষুধ ব্যবহার হয় তা ঢাকার বাইরের কোনো হাসপাতালে নেই।’

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘একবার স্ট্রোকের একজন রোগী প্যারালাইজড হয়ে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালে আসেন। তিনি সাড়ে ৪ ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে আসায় থ্রম্বোলাইসিস চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হয়। ছাড়পত্র দেয়ার তিনদিন পর থেকেই তিনি স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে শুরু করেন। এটি সম্ভব হয়েছে দ্রুত হাসপাতালে আসার কারণেই। অন্যথায় তার বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতো।’

গবেষণায় দেখা যায়, যেসব রোগীর স্ট্রোক হয়েছে তাদের গড় বয়স ৬১ বছর এবং এর ৬৩ শতাংশই নারী। প্রায় অর্ধেক রোগীই নিম্ন আয়ের এবং বেশির ভাগই গ্রামে বসবাস করেন।

প্রধান গবেষক ডা. এম আজমাইন ইকতিদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্ট্রোকের লক্ষণগুলো সম্পর্কে বেশির ভাগ মানুষ এখনো সচেতন নন। তাই লক্ষণ শনাক্ত করে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতেই প্রথমত দেরি হয়। অনেকেই বাসায় চিকিৎসা করার চেষ্টা করেন, যেখানে মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। তাছাড়া আমাদের দেশে থ্রম্বোলাইসিসের সুযোগ আছে এমন হাসপাতাল হাতেগোনা, যার কারণে বিদ্যমান যাতায়াত ব্যবস্থায় যথাযথ সময়ের মধ্যে সঠিক হাসপাতালে পৌঁছানো দুঃসাধ্য।’

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘স্ট্রোকের রোগীরা বেশির ভাগ সময়ই হাসপাতালে আসতে দেরি করেন। কী কারণে দেরি হয় তা অনুসন্ধানের জন্য গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়। গ্রাম পর্যায়ে চিকিৎসা নেয়ার প্রবণতা কম। ফার্মেসি থেকে ওষুধ নিয়ে খান অনেকে। যখন অবস্থার অবনতি হয় তখনই হাসপাতালে আসেন রোগীরা। দ্রুত চিকিসকের শরণাপন্ন হওয়ার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। উন্নত চিকিৎসায় বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করতেও দীর্ঘ সময় বিলম্ব হচ্ছে। রোগীর সহায়ক ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম তৈরি করতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে বিভাগীয় পর্যায়ে স্ট্রোক সেন্টার প্রতিষ্ঠা করা দরকার।’

আরও