দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতির চিত্র তুলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, ‘মূল্যস্ফীতির হার কমার প্রবণতা দেখা গেলেও এর গতি শ্লথ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল বিনিয়োগ, ব্যাংক খাতে অস্থিরতা এবং রফতানিতে মন্থরতার কারণে অর্থনীতি এখন চাপে রয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে হলে দ্রুত ও কার্যকর কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই।’
আজ সিপিডি ও ডেইলি স্টার আয়োজিত ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনা: নবনির্বাচিত সরকারের স্বল্প ও মধ্যমেয়াদি অগ্রাধিকার’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।
ফাহমিদা খাতুন জানান, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। শিল্প ও সেবা খাতে গতি কমে যাওয়া এবং বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা এ পতনের বড় কারণ। তবে ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৪ দশমিক ৫০ শতাংশে উঠেছে। এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধীরে ধীরে গতি ফেরার ইঙ্গিত দিলেও তা এখনো স্থায়ী পুনরুদ্ধার বলা যাচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন, ‘উচ্চ মূল্যস্ফীতি গত দুই বছরে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। ২০২৪ অর্থবছরের জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তা কমে ৮ দশমিক ৬৬ শতাংশে নেমেছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমায় পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে।’
কিন্তু একই সময়ে মজুরি বৃদ্ধির হার জানুয়ারিতে ৮ দশমিক ১২ শতাংশে স্থির রয়েছে। ফলে প্রকৃত আয় বাড়েনি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু মূল্যস্ফীতি কমলেই হবে না, মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ানোর উদ্যোগও নিতে হবে। মূল্যস্ফীতির হার কমার প্রবণতা দেখা গেলেও এর গতি শ্লথ। বিপরীতে মজুরি বৃদ্ধির হার প্রায় স্থবির অবস্থায় রয়েছে; যা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করে সিপিডি।
গোলটেবিল আলোচনায় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসি) ভাইস প্রেসিডেন্ট এ কে আজাদ বলেন, ‘ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে দেশের অর্থনীতি ভালো অবস্থায় ফিরে আসবে না। বর্তমানে গড় ঋণখেলাপির হার ৩৬ শতাংশ ও সরকারি ব্যাংকগুলোতে তা প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে।’
তিনি বলেন, ‘এই টাকাগুলো কারা নিয়েছে? যারা উইলফুল ডিফল্টার, তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি এক্সিট পলিসি দিয়েছে, আমরা সেটাকে সমর্থন করি। কিন্তু যারা টাকা নিয়ে ব্যবসায় বিনিয়োগ করেনি, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হতে হবে। না হলে অর্থনীতি ভালো জায়গায় আসবে না।’
ড. ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজীজ রাসেল, ডিসিসিআইর সাবেক সভাপতি শামস মাহমুদ, বেসিসের সাবেক সভাপতি সৈয়দ আলমাস কবীর, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আসিফ ইব্রাহিম, বেসিসের সাবেক সভাপতি ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, পলিসি রিসার্চের ভাইস চেয়ারম্যান ড. সিদ্দিক আহমেদ, ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আক্তার মালা ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ।