রাজবাড়ীর পাঁচটি উপজেলায় দেখা দিয়েছে গরুর লাম্পি স্কিন (এলএসডি) রোগ। দিন দিন বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। ভাইরাসজনিত এ রোগে আক্রান্তের মধ্যে বাছুরের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকারিভাবে এ রোগের ভ্যাকসিন এখনো পাননি তারা। তবে বেসরকারিভাবে কিছু ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে। যদিও সেগুলোর দাম বেশি। এ অবস্থায় রোগটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় গরু নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন প্রান্তিক খামারিসহ কৃষকরা। অবশ্য গবাদিপশু রক্ষায় উঠান বৈঠক করে সংশ্লিষ্ট কৃষক ও খামারিদের করণীয় সম্পর্কে সতর্ক করছেন প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তারা।
গতকাল গোয়ালন্দ উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার ছোট ভাকলা ইউনিয়নের ছোট ভাগলপুর এলাকা থেকে আলেয়া নামে এক নারী লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত একটি বাছুর নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘২০ দিন ধরে বাছুরের শরীরে গোটা উঠেছে। চার-পাঁচদিনে বাছুরটি বেশি অসুস্থ হওয়ায় ডাক্তার দেখাতে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
উজানচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. গোলজার হোসেন মৃধা বলেন, ‘আমার একটি বাছুরের পা ফুলে গেছে। বিষয়টি পশু হাসপাতালের চিকিৎসককে জানালে তিনি এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে গেছেন। বাছুরটির শরীরে জ্বর আসতে শুরু করেছে। ডাক্তার দেখে বলেছেন, বাছুরটি এলএসডিতে আক্রান্ত। আমাদের গ্রামে গত এক সপ্তাহে লাম্পি স্কিন রোগে তিনজনের গরু মারা গেছে।’
উজানচরের মজলিশপুর চর গ্রামের কৃষক মোবারক খাঁ বলেন, ‘রাতের বেলায় ভালো গরু গোয়ালে রেখেছি, সকালে দেখি চামড়ায় প্রথমে গুটি বের হয়ে ফোসকা পড়েছে। পরে জ্বরের কারণে কাঁপুনি ও খাবার ছেড়ে দেয়ায় দুর্বল হয়ে গরু মারা যাচ্ছে। আমার গ্রামে একজনের গরু মারা গেছে।’
পশুরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯২৯ সালে সর্বপ্রথম আফ্রিকা মহাদেশের জাম্বিয়ায় রোগটি দেখা দেয়। ১৯৪৩-৪৫ সালের মধ্যে মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে এখন পর্যন্ত এর কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। মশা-মাছিবাহিত রোগটি মূলত মশার মাধ্যমেই বেশি ছড়ায়। আক্রান্ত গরু সুস্থ হতে দীর্ঘদিন সময় লাগে। দিন দিন গরু-বাছুর দুর্বল হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মারাও যায়। একটি খামারকে অর্থনৈতিকভাবে ধসিয়ে দিতে খুরা রোগের চেয়েও বেশি ভয়ংকর এটি।
বাংলাদেশে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রথম দেখা দেয় ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে। এর পরই মাঠে নামে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তদন্ত টিম। তখন দেশের ১২ জেলায় ৪৮ হাজার গরুর মধ্যে এ রোগের লক্ষণ খুঁজে পাওয়া যায়। মূলত এটি পক্স ভাইরাস বা লাম্পি স্কিন ডিজিজ ভাইরাসজনিত রোগ। ছাগল ও ভেড়ার পক্স ভাইরাসের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়। এ ভাইরাস গরু ছাড়া মহিষেও ছড়াতে পারে। এক গরু থেকে আরেক গরুতে ছড়িয়ে পড়ে। ছাগল ও ভেড়ায় প্রতিলিপি তৈরি করলেও এরা সাধারণত লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত হয় না। এছাড়া এ ভাইরাস মানুষকে আক্রমণ করে না। রোগটি প্রধানত বর্ষার শেষে, শরতের শুরু বা বসন্তের শুরুতে মশা-মাছির বেশি বিস্তারের সময় ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
তবে এ রোগের চিকিৎসা সহজ নয়। আগে রোগটির আক্রমণ হলেও এর ভ্যাকসিন সহজলভ্য নয়। তবে খামারের ভেতর এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রেখে মশা-মাছির উপদ্রব কমিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। আক্রান্ত গরুর খামারের শেড থেকে আলাদা করে অন্য স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখলে অন্য গরুতে সংক্রমণ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আক্রান্ত গাভির দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে মাটিচাপা দেয়া উচিত বলে জানিয়েছে চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘লাম্পি স্কিন রোগ ভাইরাসজনিত। মশা ও মাছির মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুর দেহে সহজে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারিভাবে আমরা এ রোগের কোনো ভ্যাকসিন এখনো পাইনি। তবে বেসরকারিভাবে কিছু ভ্যাকসিন পাওয়া গেলেও দাম বেশি। রোগটি সম্পর্কে এলাকার কৃষক ও খামারিদের সতর্ক করতে নিয়মিত উঠান বৈঠক করছি। সেখানে খামার, গোয়ালঘরসহ আশপাশের এলাকা সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মশারি ব্যবহারের পাশাপাশি গরু ও বাছুরকে ভিটামিনযুক্ত খাদ্য খাওয়ানোসহ বিভিন্ন পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’