দফায় দফায় সংঘর্ষ, পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ কর্মসূচি ও উত্তেজনার পর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) ক্যাম্পাসে দেখা গেল ভিন্ন এক দৃশ্য। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের আয়োজিত আনন্দ শোভাযাত্রা, বৃক্ষরোপণসহ নানান কর্মসূচিতে এক মঞ্চে মিলিত হন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এ সময় মঞ্চে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী।
এদিন সকাল থেকে পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আয়োজিত কর্মসূচিতে উপাচার্য, বিভিন্ন অনুষদের ডিন, বিভাগীয় শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এ সময় বৃষ্টি উপেক্ষা করে ক্যাম্পাসের প্রধান সড়ক ও আবু সাঈদ চত্বর প্রদক্ষিণ করে আনন্দ শোভাযাত্রা। এছাড়াও জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে বৃক্ষরোপণ করা হয়।
গত সোমবার সন্ধ্যা থেকে ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে দণ্ডিত নেতাদের একটি ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। এরপর একই স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেয় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। এতে নতুন করে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থান নেয়। বেরোবি প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৪৪ ধারা জারির আবেদনও করা হয়েছিল।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচিতে দুই ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের একই মঞ্চে দেখা যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। তাদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মতের ভিন্নতা থাকতে পারে, তবে তা যেন কোনোভাবেই সহিংসতায় রূপ না নেয়।
বেরোবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মো. আব্দুর রাকিব মুরাদ বলেন, ছাত্রদল কোনো প্রোগ্রাম করেছে আর আমরা বাধা দিয়েছি, এমন কোন ঘটনা নেই। আমরা আগেও যেমন বাধা দেইনি, এখনও দেইনা। আমরা চাই ক্যাম্পাসে দুপক্ষের সহাবস্থান থাকুক, স্থিতিশীল পরিবেশে থাকুক। আমরা আশা করি, তারা যে শিবিরমুক্ত ক্যাম্পাস লিখেছে, এটা দুপুরের মধ্যে মুছে দেবে।
ছাত্রদল সভাপতি ইয়ামিন ইসলাম বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণীর ঐক্যবদ্ধ চেষ্টায় আমরা ত্রাসের রাজনীতি থেকে মুক্তি পেয়ে সুন্দর একটা বাংলাদেশ পেয়েছি। জুলাই যেমন আমাদের ঐক্যবদ্ধ করেছিল, সেই ঐক্যবদ্ধভাবেই নতুন বাংলাদেশে গড়তে হবে। মতবিরোধ দ্বন্দ্ব রাখা যাবে না। তা নাহলে আবারো ফ্যাসিবাদীরা ফিরে আসবে। বিশৃঙ্খলা মতবিরোধ সহিংসতা পরিহার করি। আসুন সুন্দর একটা বাংলাদেশ গড়ি।
অনুষ্ঠানে বেরোবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. শওকাত আলী বলেন, আজ আমাদের আনন্দের দিন। ছাত্র-জনতা যেভাবে ২৪ এর জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থান করেছিল তারই ফলশ্রুতিতে আজকে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরে এসেছে। আমরা আশা করি, আর যেন কোনো স্বৈরাচার কিংবা আওয়ামী লীগ না আসতে পারে। সেজন্য তারুণ্যের অহংকার তরুণরা যেভাবে একত্রিত হয়ে কাজ করেছে, এখনো তাদের মধ্যে যে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ আছে, সেটা আজ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়ে দিয়েছে। আমরা যে বর্ণাঢ্য র্যালি করলাম সেখানেও কিন্তু সর্বস্তরের শিক্ষার্থী, ছাত্রদল, ছাত্রশিবির সবাই একসঙ্গে সম্পন্ন করলাম। এছাড়াও আমরা বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিও পালন করলাম।
দিবসটি উপলক্ষে এদিন সকালে নগরীর জুলাই চত্বর স্মৃতিস্তম্ভে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জুলাই শহীদদের স্মরণে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এ সময় রংপুর বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ), সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
পরে নগরীর শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা প্রদান এবং দিবসের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।