ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন

টিকিট বিক্রির অর্থ পাঠাতে আর্থিক ক্ষতিতে বিদেশী এয়ারলাইনস

আন্তর্জাতিক রুটের ক্ষেত্রে যাত্রার কয়েক মাস আগে থেকেই টিকিট বিক্রি শুরু করে এয়ারলাইনসগুলো। টিকিটের মূল্য কম পেতে যাত্রীরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস আগেই টিকিট সংগ্রহ করেন। বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর হয়ে বাংলাদেশে টিকিট বিক্রির কাজটি করে তাদের নিয়োজিত জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ)। অন্যদিকে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি বাবদ যে অর্থ জমা হয় সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে প্রতি তিন মাস ...

আন্তর্জাতিক রুটের ক্ষেত্রে যাত্রার কয়েক মাস আগে থেকেই টিকিট বিক্রি শুরু করে এয়ারলাইনসগুলো। টিকিটের মূল্য কম পেতে যাত্রীরাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুই-তিন মাস আগেই টিকিট সংগ্রহ করেন। বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর হয়ে বাংলাদেশে টিকিট বিক্রির কাজটি করে তাদের নিয়োজিত জেনারেল সেলস এজেন্ট (জিএসএ) অন্যদিকে যাত্রীদের কাছে টিকিট বিক্রি বাবদ যে অর্থ জমা হয় সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে প্রতি তিন মাস অন্তর এয়ারলাইনস সদর দপ্তরে পাঠায় জিএসএগুলো। তবে গত দুই মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় সংকটে পড়েছে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো।

বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো বলছে, বর্তমানে টিকিট বিক্রির অর্থ নিজ দেশে নিতে ডলারপ্রতি ১০-১৫ টাকা পর্যন্তও লোকসান হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো বিদেশী এয়ারলাইনস যদি ডলারপ্রতি এক্সচেঞ্জে ১০ টাকা লোকসান দেয়, তাহলে মিলিয়ন ডলার পাঠাতে তার ক্ষতি হচ্ছে প্রায় কোটি টাকা। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশে যেসব এয়ারলাইনসের ফ্লাইট বেশি তাদের ক্ষতির পরিমাণও বেশি।

এয়ারলাইনস-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমানে প্রতি ডলারের বিপরীতে ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের (আয়াটা) বেঁধে দেয়া এক্সচেঞ্জ রেট হচ্ছে ৮৬ টাকার কিছু বেশি। কারণে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো যেসব টিকিট বিক্রি করে তার বিপরীতে এয়ারলাইনসগুলো আয়াটা থেকে কমিশন বাদ দিয়ে ডলারপ্রতি পায় প্রায় ৮৬ টাকা। কিন্তু টিকিট বিক্রির অর্থ যখন জিএসএগুলো বিদেশে পাঠাতে যায় তখন মার্কেটে যে এক্সচেঞ্জ রেট থাকে তাতেই কিনতে বাধ্য হয়। গত মাসে জিএসএগুলোকে বিদেশে টিকিট বিক্রির অর্থ পাঠাতে হয়েছে ডলারপ্রতি ৯০ টাকা এক্সচেঞ্জ রেটে। সে সময়ই ডলারপ্রতি - টাকা করে লোকসান দিতে হয়েছে তাদের। চলতি মাসে লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আরো বেশি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতি ডলার কিনতে ১০০ টাকারও বেশি প্রয়োজন হয়েছে জিএসএগুলোর। সেক্ষেত্রে প্রতি ডলারের বিপরীতে লোকসান হচ্ছে ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত দুই মাসে ডলারের বিপরীতে বাংলাদেশী মুদ্রার রেকর্ড অবমূল্যায়ন হয়েছে। মে মাসের শুরুতেও প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল ৮৬ টাকা। আর গত বৃহস্পতিবার প্রতি ডলার প্রায় ৯৪ টাকায় বিক্রি হয়েছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত দামে দেশের কোথাও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ১০৪ টাকা দামেও ডলার কিনছে দেশের অনেক ব্যাংক। স্বল্প সময়ে টাকার এত বড় অবমূল্যায়ন বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম।

ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নে বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি আমলে নিয়েছে বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয়ও। বিষয়টি সমাধানে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, এয়ারলাইনস রিপ্রেজেনটেটিভ বোর্ডের সমন্বয়ে ২৭ জুলাই একটি বৈঠকেরও সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে যোগ দিতে এরই মধ্যে গতকাল (২৪ জুলাই) চিঠি পাঠানো হয়েছে।

বেসামরিক বিমান পরিবহন পর্যটন মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রোকসিন্দা ফারহানা স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়েছে, ডলারের বিক্রয়মূল্য এবং বিদেশী এয়ারলাইনস কর্তৃক অর্জিত লভ্যাংশ প্রেরণের ক্ষেত্রে প্রকৃত ডলারের মূল্যের পার্থক্যের কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি পর্যালোচনা এবং বিদ্যমান সমস্যা সমাধানের জন্য বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে।

বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী ওমানের এয়ারলাইনস সালাম এয়ারের কান্ট্রি ম্যানেজার শাহাবুদ্দিন প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, গত দুই মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন হওয়ায় মারাত্মক ক্ষতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনাকারী বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো। দুই মাস আগে এয়ারলাইনসগুলো যখন টিকিট বিক্রি করেছিল তখন এক্সচেঞ্জ রেট ছিল ৮৬ থেকে ৮৮ টাকার মধ্যে। বিদেশী এয়ারলাইনসগুলো সাধারণত দুই-তিন মাস পর পর টিকিট বিক্রির অর্থ রেমিট করে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। দুই মাস আগে যে এক্সচেঞ্জ রেটে টিকিট বিক্রি করা হয়েছিল, সেটি এখন আর নেই। বর্তমানে রেমিট করতে গিয়ে ডলারপ্রতি ১৫-২০ টাকা পর্যন্ত ক্ষতি হচ্ছে এয়ারলাইনসগুলোর। যে এয়ারলাইনস যত বেশি টিকিট বিক্রি করেছে তার ক্ষতির পরিমাণও তত বেশি।

বেবিচক তথ্য অনুসারে, বর্তমানে বাংলাদেশী তিনটিসহ ৩৩টি বিদেশী এয়ারলাইসন দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব এয়ারলাইনস দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার যাত্রী পরিবহন করে। এর সিংহভাগই বিদেশী এয়ারলাইনসগুলোর দখলে।

আরও