বাংলাদেশী মধ্যবিত্ত অভিবাসনপ্রত্যাশীদের স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়া। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর গত ৮ আগস্ট পুনরায় দেশটিতে কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। তাই ভাগ্য বদলাতে অনেকেই দেখছেন নতুন স্বপ্ন। আর সেটিকে পুঁজি করে গণহারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে যাচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। জনপ্রতি ৭-১০ হাজার টাকা খরচ করে গত দুই মাসে পরীক্ষা করিয়েছেন অন্তত তিন লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশী। অথচ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে সাকল্যে আড়াই হাজার বাংলাদেশীকে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এমন দীর্ঘগতি চললে অনেকেরই কাজে আসবে না তিন মাস মেয়াদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন। তাই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কায় রয়েছেন নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত লক্ষাধিক কর্মী।
জানা গিয়েছে, অভিবাসনের ক্ষেত্রে অন্যান্য শ্রমবাজারের মতো মালয়েশিয়ায়ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশটিতে যেতে চাওয়া কর্মীদের জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ হাজার টাকা। পরীক্ষা করা হয় হেপাটাইটিস বি, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, সুগার লেভেল জানার জন্য বিলি রুমিং, এক্স-রে প্রভৃতি। এর জন্য প্রথম ধাপে ৬৮টি মেডিকেল সেন্টারের নাম প্রকাশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
অনুসন্ধানে জানা গিয়েছে, স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হলে মালয়েশিয়া যেতে এক ধাপ এগিয়ে থাকা যাবে—এ প্রলোভন দেখিয়ে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের গণহারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাচ্ছে বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সি। তাই এ কাজের জন্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে প্রতিদিন ঢাকায় ছুটছেন কয়েক হাজার লোক। অনেকের সঙ্গে আসছেন আত্মীয়স্বজনও। পরীক্ষার খরচ বাবদ তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ৭-১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। আবার পরীক্ষার পর রিপোর্টে অসংগতি আসতে পারে—সেই ভয় দেখিয়েও অসাধু দালাল চক্র গ্রামের সহজ-সরল এসব লোকের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করছে। এভাবে কেবল স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামেই মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক কর্মীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার বণিক বার্তাকে বলেন, মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশীদের অবাধে স্বাস্থ্য পরীক্ষার বিষয়টি আমরা অবগত। এরই মধ্যে তিন লাখের বেশি কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে বলেও আমাদের কাছে খবর আছে। যদিও সে অনুযায়ী ভিসা এখনো নিশ্চিত হয়নি। তাই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোকেই অতিরিক্ত কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করতে বলা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, মালয়েশিয়ায় ২০১৭-১৮ সালে বাংলাদেশী কর্মী গিয়েছিলেন ২ লাখ ৭৬ হাজার। অথচ সে সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছিল অন্তত ১০ লাখের বেশি লোকের। তাই সরকার যদি দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেয় তাহলে এবারো আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়বেন মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক লাখ লাখ অভিবাসনপ্রত্যাশী।
এদিকে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সঙ্গে সম্পৃক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো বলছে, প্রবাসী শ্রমিকদের ভিসা চূড়ান্ত হলে স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে মালয়েশিয়ায় অভিবাসনপ্রত্যাশী কর্মীদের অধিকাংশই গ্রামের দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ। এ অবস্থায় তাদের অজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছে একশ্রেণীর অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি। কেবল স্বাস্থ্য পরীক্ষার নামে তারা সাধারণ কর্মীদের প্রতারিত করছে।
মালয়েশিয়া যেতে ইচ্ছুক একাধিক অভিবাসনপ্রত্যাশী জানান, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো প্রথমে দুই মাসের মধ্যে ভিসার ব্যবস্থা করবে বলে নিশ্চয়তা দেয়। পরবর্তী সময়ে তাদের সঙ্গে নিবন্ধিত হলে প্রথমে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য চাপ দিতে থাকে। আর একবার পরীক্ষা হয়ে গেলে এজেন্সিগুলো তখন ভিসার জন্য নতুন নতুন ডেট দেয়া শুরু করে। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হচ্ছে—এমন তথ্য মানতে নারাজ মালয়েশিয়ায় সরাসরি কর্মী রফতানির সঙ্গে সম্পৃক্ত এজেন্সিগুলো। এ প্রসঙ্গে পাথফাইন্ডার ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী মাজাহারুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, একটি এজেন্সি মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের যে চাহিদাপত্র (ডিমান্ড লেটার) পায়, তার থেকে ২০ শতাংশ বেশি কর্মীর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে পারে। কারণ পরীক্ষার পর দেখা যায় অনেকেই কাজের জন্য ফিট না। আবার কারো কারো জটিল শারীরিক সমস্যাও ধরা পড়ে। তিনি আরো বলেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর সবকিছু ঠিক থাকালেও নির্দিষ্ট চাহিদাপত্রের কারণে যারা যেতে পারেন না, তাদের পরবর্তী চাহিদাপত্রের মাধ্যমে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়।
নানা কারণে ২০১৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ বন্ধের ঘোষণা আসে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে। দীর্ঘ আলোচনা ও যোগাযোগের পর গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা সই হয়। পরে গত জুনে ঢাকায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে শ্রমবাজার খোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে জুনের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ঘোষণা দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে। সব কাটিয়ে অবশেষে গত আগস্ট থেকে দেশটিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশী কর্মীরা।
গত ৫ জুলাই এক অফিস আদেশে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানায়, কর্মী হিসেবে মালয়েশিয়ায় যেতে একজন বাংলাদেশীর সর্বোচ্চ খরচ হবে ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। আকাশপথে মালয়েশিয়ায় ভাড়াসহ অন্যান্য খরচ বহন করবে ওই কর্মীকে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব গাজী মো. শাহেদ আনোয়ারের সই করা অফিস আদেশে বলা হয়, একজন মালয়েশিয়াগামী কর্মীর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যেসব ব্যয় হবে তা সংশ্লিষ্ট কর্মীকে বহন করতে হবে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী, বিমান ভাড়া, মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগের ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’, বীমা, মালয়েশিয়ায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স, করোনাভাইরাস পরীক্ষাসহ ১৫টি খাতের ব্যয়সংশ্লিষ্ট নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ বহন করবে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে মালয়েশিয়ায় যান ৯৯ হাজার ৭৮৭ জন কর্মী। পরের বছর যান প্রায় ১ লাখ ৭৬ হাজার কর্মী। তবে কর্মী রফতানির নামে দুই দেশের মধ্যে গড়ে ওঠে একটি চক্র। বাংলাদেশী ১০ রিক্রুটিং এজেন্সির গঠিত ওই চক্র হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। এ অভিযোগে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশী কর্মী নেয়া বন্ধ হয়ে যায়। ২০১৯ সালে দেশটিতে গিয়েছেন মাত্র ৫৪৫ জন। এছাড়া ২০২০ সালে ১২৫ জন ও ২০২১ সালে ২৮ জন কর্মী দেশটিতে যান।