সেখানে পানি জমে কাঁদায় রাস্তাঘাট একাকার হয়ে গেছে। রিকশা, ভ্যান, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল উল্টে প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। পথ চলতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে পড়েন পথচারী। এতে পানি ও কাঁদায় নষ্ট হয় তাদের কাপড়-চোপড়। কোনো কোনো সড়কে আবার পিচের চিহ্ন বিলীন হয়ে গেছে। তবে শহরের ক্ষতিগ্রস্ত ৬৫টি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের স্কিম বিশ্বব্যাংকের আরইউটিডি প্রকল্পে জমা দিয়েছে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ।
গোপালগঞ্জ আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বণিক বার্তাকে জানান, গত জুলাইয়ে গোপালগঞ্জে ২৬ দিন বৃষ্টি হয়েছে। এ ২৬ দিনে মোট ৬৩৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এটি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
সরজমিনে ঘুরে দেখা যায়, টানা বৃষ্টিতে পৌরসভার রাস্তাঘাট, বিশেষ করে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপাড়া এবং লাল মিয়া সিটি কলেজ ও মাদরাসাসংলগ্ন সড়কের অবস্থা ভয়াবহ। পিচ-পাথর উঠে গিয়ে ইট-খোয়া বেরিয়ে পড়া এসব সড়কে পানি ও কাঁদা জমেছে। স্থানভেদে পিচের চিহ্ন পর্যন্ত বিলীন হয়ে খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। জানা গেছে, এসব সড়ক দিয়ে কলেজ, মাদরাসা, জেলখানা ও ডায়াবেটিস হাসপাতালে যাতায়াতকারী পথচারীরা অনেক সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যান।
শিক্ষার্থী নাসির উদ্দিন শেখ বলেন, ‘লাল মিয়া সিটি কলেজ ও মাদরাসার পাশের রাস্তাটি জঘন্যভাবে ভেঙে আছে। এ রাস্তা দিয়ে কলেজ, মাদরাসা, জেলখানা, ডায়াবেটিস হাসপাতাল ও বিভিন্ন গ্রামে হাজার হাজার মানুষ যাতায়াত করে। যাতায়াত করতে গিয়ে তারা দুর্ভোগে পড়ছেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়কটি দ্রুত সংস্কারের জন্য পৌর প্রশাসনের নজর দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
পৌরসভার ৭ নং ওয়ার্ডের ইসলামপাড়া এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘শহরের মধ্যে ইসলামপাড়ার অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। একটুখানি বৃষ্টি হলে সড়ক ডুবে যায়। চলাচল করা যায় না। এছাড়া সড়কের অবস্থাও নাজুক।’
ইসলামপাড়ার বাসিন্দা মো. দ্বীন ইসলাম শেখ বলেন, ‘আমাদের এলাকায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। আমরা নিয়মিত ট্যাক্স পরিশোধ করি। কিন্তু নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত। সড়কে চলতে গিয়ে আছড়ে পড়তে হয়। পানি কাঁদায় পোশাক-পরিচ্ছদ নষ্ট হয়। যানবাহনে অতিরিক্ত ঝাঁকির মধ্যে চলাচল করলে কোমরসহ শরীর ব্যথা হয়ে যায়। আমরা এ দুর্ভোগ থেকে মুক্তি চাই।’
রিকশাচালক মো. নাসির মোল্লা বলেন, ‘শহরের অধিকাংশ সড়ক রিকশা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এসব সড়ক দিয়ে রিকশা চালাতে গিয়ে উল্টে পড়ছে। এছাড়া গাড়ির টায়ার টিউব নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত ঝাঁকির কারণে যাত্রীরা রিকশায় উঠতে চায় না। আমাদের আয় রোজগার কমে গেছে।’
ইজিবাইকচালক কাবিল মিয়া বলেন, ‘ভাঙাচোরা রাস্তায় বেশি গাড়ির এনার্জি লস হয়। প্রতিদিন একটি গাড়ি ফুল চার্জ হলে ৫০-৬০ কিলোমিটার চলার কথা। কিন্তু ভাঙা সড়কে ৩০-৪০ কিলোমিটারের বেশি যায় না। গাড়ি গর্তে পড়লে দ্রুত চার্জ শেষ হয়ে যায়। এ কারণে দিনে দুবার চার্জ দিতে হচ্ছে। চার্জ খরচ বেড়েছে। তাই আয় নেমেছে অর্ধেকে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’
গোপালগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ রুবাইয়াত জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের দেশের পিচঢালা রাস্তা মানসম্পন্ন ৬০-৭০ বিটুমিন দিয়ে তৈরি করা হয়। পিচঢালা রাস্তায় বৃষ্টির পানি বেশিদিন জমে থাকলে বিটুমিন আঠা ছেড়ে দেয়। তখন বিটুমিন পাথর, খোয়া ধরে রাখতে পারে না। কার্পেটিং উঠে যায়। ছোট-বড় গর্ত সৃষ্টি হয়। এছাড়া হাটবাজার এলাকার সড়কে তেল-মবিল পড়ে। অনেক সময় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশের সড়কে পানি ও আবর্জনা ফেলা হয়। এছাড়া বিভিন্ন কারণে পিচঢালা রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পৌর এলাকায় ইউনিব্লক ও আরসিসি সড়ক নির্মাণের দিকে ঝুঁকতে হবে।
গোপালগঞ্জ পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি যাত্রা শুরু করে পৌরসভাটি। ১৯৯৬ সালে এটি প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হয়। ২০২১ সালে ৯ ওয়ার্ডের এ পৌরসভার আয়তন বেড়ে ১৫টি ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ পৌরসভায় ২ লাখ ৯ হাজার ৪৫০ জনের বসবাস। এখানে কাঁচাপাকা সব মিলিয়ে সড়ক রয়েছে ১৭৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ৬৫টি সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারের স্কিম বিশ্বব্যাংকের আরইউটিডি প্রকল্পে জমা দিয়েছে পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ।
আগে শহরের আয়তন ছিল ১৩ বর্গকিলোমিটার। এখন বেড়ে ৩০ দশমিক ৭০ বর্গমিটার হয়েছে। শহরে ১৭৩ দশমিক ২৫ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে পাকা সড়ক ১১৩ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার, কাঁচা সড়ক ২৫ দশমিক ৫ কিলোমিটার, এইচবিবি (হেরিং বোন বন্ড) সড়ক ১৪ কিলোমিটার, ডাবলুবিএম (ওয়াটার বন্ড ম্যাকাডাম) সড়ক ১০ কিলোমিটার, ব্রিকস সোলিং ১০ কিলোমিটার রয়েছে।
গোপালগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান জানান, বর্ধিত অংশে আমরা তেমন কোনো উন্নয়ন করতে পারিনি। এডিবি থেকে ১৮৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। এরই মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করে ঠিকাদার নিয়োগ করেছি। কার্যাদেশ দেয়ার পর ঠিকাদাররা পাঁচটি সড়কের কাজ শুরু করেছে। এসব কাজ চলামান রয়েছে। এছাড়া আরইউটিডি নামে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নতুন প্রকল্প শুরু হচ্ছে। সেখানে ৬৫টি সড়কের স্কিম জমা দেয়া হয়েছে। অচিরেই এ প্রকল্প রান করবে। সড়ক নির্মাণ ও সংস্কার হলে জনদুর্ভোগ কমে আসবে।