প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর সরকারের অত্যধিক নির্ভরতা বেসরকারি খাতের বিনিয়োগে বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে সতর্ক করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, সরকার যদি ব্যাংক খাত থেকে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, তবে বাজারে তারল্য সংকট তৈরি হবে এবং ঋণের সুদের হার আরও বেড়ে যেতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
আজ শুক্রবার রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে বাজেট-পরবর্তী পর্যালোচনায় সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন এসব তথ্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমানসহ অন্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অর্থনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটটি এমন একটা সময় এসেছে যখন অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। গত প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। বর্তমানে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, সেখানে আগামী অর্থবছরের জন্য ৭ দশমিক ৫ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি অর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে যদি না সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির পাশাপাশি খাদ্যের সরবরাহ ও জ্বালানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা যায়।
বাজেটে ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা নিয়ে সতর্ক করে ড. ফাহমিদা বলেন, সরকার যদি ব্যাংক থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়, তবে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রবাহ কমে যেতে পারে এবং সুদের হার আরো বাড়তে পারে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার অভাব তৈরি হবে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন নিম্ন ঝুঁকি থেকে ‘মডারেট রিস্ক’ বা মধ্যবর্তী ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছে, যা ঋণ স্থায়িত্বের জন্য চিন্তার বিষয়। বৈদেশিক ঋণের স্থায়িত্ব নিশ্চিতে ঋণের সুচারু ব্যবহার অপরিহার্য বলে মনে করেন তিনি।
রাজস্ব আদায়ের বিশাল লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হয়েছে, যা অর্জন করতে হলে ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমান প্রশাসনিক দক্ষতা ও অটোমেশনের অভাব বিবেচনায় এটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী।
বাজেটের ব্যয়ের খাত নিয়ে তিনি বলেন, সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো থোক বরাদ্দে ৯৯৮ দশমিক ৪ শতাংশের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। নির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়া এ বিশাল পরিমাণ অর্থের ব্যয় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সংকটে পড়তে পারে এবং অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) নিয়ে সিপিডির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, পাঁচটি প্রধান খাত এডিপির ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ বরাদ্দ পেলেও কৃষি খাতে বরাদ্দ ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ করা হয়েছে। ড. ফাহমিদা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি খাতকে সবসময় অগ্রাধিকার দেয়া উচিৎ। এখানে বরাদ্দ কমে যাওয়া আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়।
ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার করমুক্ত সীমা পর্যাপ্ত নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবে এ সীমা আরো বাড়ানো উচিত ছিল । অন্যদিকে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ রাখা হয়েছে, যা করের ন্যায্যতা নষ্ট করে এবং সৎ করদাতাদের জন্য একটি 'মোরাল হ্যাজার্ড' বা নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। তবে স্বাস্থ্যখাতে কিডনি ডায়ালিসিস ফিল্টারের শুল্ক প্রত্যাহার এবং সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর অব্যাহতির প্রস্তাবকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন।
সামাজিক সুরক্ষা খাতে ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ বরাদ্দ বৃদ্ধিকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের আওতায় ৪১ লাখ উপকারভোগীকে আনার পরিকল্পনা এবং এতে নারী প্রধান পরিবারগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া অত্যন্ত ইতিবাচক। এটি দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নে ভূমিকা রাখবে। তবে ডিজিটাল পেমেন্ট ও স্বচ্ছ তালিকা নিশ্চিত না করলে এ সুফল যোগ্যরা পাবে না।
তিনি বলেন, বাজেটের আকার বড় হওয়া কোনো সমস্যা নয়। বরং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই হবে সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।