কয়েক দশক ধরে দেশে আবহাওয়া ও জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে গম উৎপাদন কয়েক বছর ধরেই কমতির দিকে রয়েছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশে প্রথম ব্লাস্ট রোগ দেখা দেয়ার পর গম উৎপাদন বৃদ্ধি চ্যালেঞ্জের মধ্যে পড়ে। তাই ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব বাড়ে। শিগগিরই এ রোগ প্রতিরোধী জাত সারা দেশে জনপ্রিয় করা হবে। বারি গম-৩৩, ডব্লিউএমআরআই গম-২ ও ডব্লিউএমআরআই গম-৩ দেশের গম আবাদ ও উৎপাদন বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
গতকাল দিনাজপুরের নশিপুরে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে গম ও ভুট্টার চলমান গবেষণা মাঠ পরিদর্শনে গিয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী উচ্চফলনশীল নতুন জাতের মাধ্যমে দেশে গম চাষ ও উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে। বাংলাদেশের আবহাওয়া গম চাষের জন্য খুব উপযোগী না হওয়ায় চাহিদার পুরোটা দেশে উৎপাদন করা সম্ভব নয়। দেশে আগে গমের অনেকগুলো জাত জনপ্রিয় হয়েছিল, কিন্তু সেগুলো সহজেই ব্লাস্টসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতো। নতুন উদ্ভাবিত জাত বারি গম-৩৩সহ আরো কয়েকটি জাত ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী। উচ্চফলনশীল এ জাতগুলোর সম্ভাবনা অনেক বেশি। দিনাজপুরে জাতগুলোর উন্নত বীজ উৎপাদন করে সারা দেশে চাষে ব্যবহূত হবে। ফলে দেশের বিরাট এলাকা গম চাষের আওতায় আসবে এবং উৎপাদন বহুগুণ বাড়বে।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. মো. এছরাইল হোসেন কর্মশালায় গম ও ভুট্টা উৎপাদন, গবেষণা ও উন্নয়নের সার্বিক চিত্রের ওপর মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বলেন, এ পর্যন্ত ৩৬টি উচ্চফলনশীল গমের জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে গমের ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী ও জিংক সমৃদ্ধ জাত বারি গম-৩৩ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ইনস্টিটিউট কর্তৃক ২০১৯ সালে ডব্লিউএমআরআই গম-১ এবং সম্প্রতি ডব্লিউএমআরআই গম-২ (ব্লাস্ট রোগসহনশীল) ও ডব্লিউএমআরআই গম-৩ (ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী) জাত অবমুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া এ পর্যন্ত ভুট্টার ১৯টি হাইব্রিড জাত ও সাতটি ওপেন পলিনেটেড কম্পোজিট জাত উদ্ভাবিত হয়েছে।
ভুট্টার ফল আর্মিওয়ার্ম পোকার আক্রমণ প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী বলেন, সিমিট ও দেশের বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় এটি মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আছে। এটি নিয়ে তীব্র কোনো সমস্যা নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তনসহ ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় গম ও ভুট্টার নতুন জাত ও লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং সেগুলো কৃষকের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশনা দেন তিনি। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে কৃৃষিমন্ত্রী বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে ‘বঙ্গবন্ধু কর্নার’ উদ্বোধন করেন।
বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী গমের মধ্যে বারি গম-৩৩, ডব্লিউএমআরআই গম-২ ও ডব্লিউএমআরআই গম-৩ উল্লেখযোগ্য। বারি গম-৩৩-এর বৈশিষ্ট্য হলো এটি ব্লাস্ট রোগপ্রতিরোধী, পাতার মরিচা ও পাতা ঝলসানো রোগপ্রতিরোধী। জাতটি তাপসহিষ্ণু কাণ্ড শক্ত, সহজে হেলে পড়ে না। জীবত্কাল ১১০-১১৫ দিন। গড় ফলন হেক্টরপ্রতি ৪ দশমিক ৬ থেকে পাঁচ টন। দানা বড়, সাদা, চকচকে ও জিংক সমৃদ্ধ (৫০-৫৫ পিপিএম)। ব্লাস্টপ্রবণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চাষের জন্য বেশি উপযোগী। জাতটি ২০১৭ সালে অবমুক্ত করা হয়।
অন্যদিকে ডব্লিউএমআরআই গম-২ জাতটি ব্লাস্টসহনশীল, পাতা ঝলসানো ও পাতার মরিচা রোগপ্রতিরোধী। তাছাড়া তাপসহিষ্ণু এবং জাতটি আগাম। স্বল্পমেয়াদি জীবত্কাল ১০৬-১১২ দিন। ফলন হেক্টরপ্রতি সাড়ে চার থেকে সাড়ে পাঁচ টন। ডাব্লিউএমআরআই গম-৩-এর বৈশিষ্ট্য হলো ব্লাস্ট প্রতিরোধী, পাতা ঝলসানো, পাতার মরিচা রোগপ্রতিরোধী ও তাপসহিষ্ণু। জীবত্কাল ১০৮-১১৪ দিন। খাটো জাতের ৯৬-১০৬ সেন্টিমিটার উচ্চতা। হেক্টরপ্রতি ফলন চার থেকে সাড়ে চার টন।