বান্দরবানে সেতু নির্মাণের শুরুতে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকৃতিগতভাবে বর্ষায় পানির উৎসগুলোয় স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। এর মধ্যে পাহাড়ি এলাকার পানির উৎসগুলোয় বিপজ্জনক স্রোত দেখা দেয়।

প্রকৃতিগতভাবে বর্ষায় পানির উৎসগুলোয় স্রোতের তীব্রতা বেড়ে যায়। এর মধ্যে পাহাড়ি এলাকার পানির উৎসগুলোয় বিপজ্জনক স্রোত দেখা দেয়। এ বাস্তবতায় পাহাড়ি এলাকায় সাবলীলভাবে সড়ক যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর স্থাপনা হলো নদী, খাল, ঝিরিসহ পানির উৎসের ওপরে নির্মিত সেতু। বান্দরবান সদর উপজেলার ময়নাতলী এলাকায় ঙেমে খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণকাজ চলছে। তবে শুরুতেই নির্মাণের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এভাবে নির্মাণ হলে আয়ুষ্কালের আগেই সেতুতে ফাটল ধরার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন প্রকৌশলীরা।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি জানান, শুরুতে ঙেমে খালের দুই পাড়ে বিশেষ কৌশলে মাটির গভীরে ফাঁপা কাঠামো বসানো বা ব্রিজের ওয়েল ভিত্তি করা হয়। একটি খালের উত্তর দিকে ও অন্যটি দক্ষিণ দিকে বসানো হয়। দক্ষিণ দিকের ওয়েল বা গহ্বরের তুলনায় উত্তর দিকের ওয়েলের গভীরতা কিছুটা কম। দক্ষিণ দিকের গহ্বরের গভীরতা কমবেশি ৩০ ফুট। তবে দুটি ওয়েলের মধ্যে উত্তর দিকের ওয়েল বা ফাঁপা কাঠামোর গহ্বরে বালির পরিবর্তে মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়। অবশ্য গহ্বরটির ওপরের অংশে কয়েক গাড়ি বালিও ভরাট করা হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ দিকের ওয়েলের গহ্বরেও রাত হলে মাটি ও দিনে অল্প কয়েক গাড়ি বালি ভরাট করা হয়েছে। দুটি গহ্বরের কোনোটিতেই দেয়া হয়নি পানি ও কমপ্যাক্টশন (গহ্বরের মাটিকে চেপে ধরা)।

তবে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে প্রাক্কলন ব্যয় ও চুক্তিমূল্য, ওয়েল ফাউন্ডেশনের গভীরতার পরিমাপসহ সেতু নির্মাণ সম্পর্কিত কোনো তথ্য জানাতে পারবেন না বলে জানান সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ বান্দরবানের উপসহকারী প্রকৌশলী আরিফুর রহমান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে পড়াশোনা করে যা শিখেছি, তা এক মুহূর্তে আপনাকে কেন শেখাব?’ কোনো প্রয়োজন হলে নির্বাহী প্রকৌশলী সাখাওয়াতের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম হয়নি বলেও দাবি তার।

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবান সদর উপজেলার ময়নাতলী এলাকায় ঙেমে খালের ওপর ৩১ দশমিক ৮২৮ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতুটি নির্মাণ করা হচ্ছে। ৮ কোটি ৯৮ লাখ ৯৩ হাজার টাকা চুক্তিমূল্যে টেন্ডারে কাজটি পেয়েছে রিমি নির্মাণ লিমিটেড নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কাজটি তত্ত্বাবধান করছে সওজ বিভাগ।

নির্মাণকাজের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োজিত প্রকল্প প্রকৌশলী মো. নাঈম মাটি দিয়ে উত্তর দিকের ওয়েল ভরাটের বিষয় স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ দিকের ওয়েলে কেন ভরাট করতে দিচ্ছে না বুঝতে পারছি না। তবে নির্মাণাধীন সেতুর কাছাকাছি জায়গা থেকে বালির খোঁজ করা হচ্ছে। দুটি ওয়েলের গভীরতা সমানে সমান। দক্ষিণ দিকের ওয়েল ভরাট করার কাজও শুরু হবে।’

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে সওজের কয়েকজন প্রকৌশলী জানান, ওয়েল ভিত্তি হলো পানির নিচে বড় সেতুর ভার বহনকারী পিয়ার বা অ্যাবুটমেন্ট। এটি রড, সিমেন্ট, বালি ও পাথরের কংক্রিটের মিশ্রণে তৈরি একটি বড় ফাঁপা কাঠামো, যা মাটির উপরিভাগে ঢালাই-পরবর্তী বিশেষ কৌশলে মাটির গভীরে বসানো হয়। যা ভার বহনের ক্ষমতা বাড়ানো এবং মাটির ক্ষয় থেকে রক্ষা করার জন্য কার্যকর পদ্ধতি। এটি মূলত ভারকে মাটির গভীরে ছড়িয়ে দেয় এবং অনুভূমিক চাপ প্রতিরোধ করে। ওয়েল ভিত্তির ভেতরে বালি ভরার পদ্ধতি হলো স্তর-স্তর করে বালি ফেলা এবং প্রতিটি স্তরকে পানি ও কম্প্যাক্টর দিয়ে ভালোভাবে চেপে শক্ত করা। যাতে ভার বহনের ক্ষমতা বাড়ে এবং ভিত্তি সুদৃঢ় হয়। এজন্য প্রথমে ভালো মানের বালি ব্যবহার করা হয়। পানির সাহায্যে বালিকে থিতু করে কাজটি করা হয়। যা কাঠামোর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। আধুনিক নকশা, নির্মাণসামগ্রী ও প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি একটি ভালো মানের কংক্রিট সেতুর আয়ুষ্কাল ১০০-১২০ বছর পর্যন্ত ডিজাইন করা হয়। তবে সেতুর ওয়েল ভিত্তি ভরাটে অনিয়ম হলে ভেতরে মাটির ফাঁকা স্থানগুলো ভরাট হবে না, ফলে লোড ঠিকমতো স্থানান্তরিত হবে না। আয়ষ্কালের আগেই ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাবে। ফলে ভিত্তি ডেবে যাবে, ফাটল ধরবে, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নষ্ট হবে। যা সেতুর কাঠামোগত ব্যর্থতা। এ কারণে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।

সেতুটির দুটি ওয়েল ফাউন্ডেশনের প্রতিটির গভীরতা ১০ মিটার বলে জানিয়েছেন ঢাকায় দাপ্তরিক প্রশিক্ষণে থাকা সওজ বান্দরবানের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন। মুঠোফোনে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টেন্ডারে সেতুর কাজটি পেয়েছে রিমি নির্মাণ লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান।’ তবে শুরুতে নির্মাণ ত্রুটির বিষয়টি তিনি এড়িয়ে যান।

আরও