১৪ মে চট্টগ্রামে কালুরঘাট সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। তবে ফলকে নাম দিতে চাচ্ছেন না প্রধান উপদেষ্টা। ফলে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারীর নাম না দিয়েই ফলক তৈরি করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। প্রধান উপদেষ্টার ব্যস্ত সূচির কারণে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুবক্তগীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর বহুল আকাঙ্ক্ষিত রেল ও সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে ১৪ মে। পূর্বের ন্যায় এবারো ফলকে কারো নাম না লিখতে নির্দেশনা পেয়েছি আমরা। এটা দেশের প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি নজিরবিহীন ও প্রশংসনীয় ঘটনা। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে নির্দেশনা মতো আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।’
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১৪ মে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম ভ্রমণ করবেন। মূলত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পঞ্চম সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন। প্রধান উপদেষ্টার চট্টগ্রাম সফর উপলক্ষে কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর রেল ও সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ওই দিন বেলা ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সেতুটির ভিত্তিপ্রস্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালে একনেকে অনুমোদন পাওয়া প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এতে ৮টি দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়ার পর এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) ডাকা হয়েছে। দুই ধাপে এ নিয়োগ সম্পন্ন করতে প্রায় ছয় মাস সময় লাগবে। এরপর জমি অধিগ্রহণ ও প্রকল্পের ডিটেইলস ডিজাইন চূড়ান্ত করে ২০২৬ সালের মাঝামাঝিতে ভৌত কাজ শুরু করবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যের (মূল সেতু) সেতুটি ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষ করতে চাইছে রেলওয়ে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, প্রধান উপদেষ্টা কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর নির্মিতব্য এক্সট্রা ডোজড রেল ও সড়ক সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সম্মতি প্রদান করেন। শুরুতে প্রধান উপদেষ্টার নামসহ ফলকও প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী কারো নাম ফলকে না লিখতে বলা হয়েছে। শুধুমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ের নাম লিখেই ফলক তৈরি করা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজার পর্যন্ত ট্রেন সার্ভিস চালু হলেও প্রায় শতবর্ষী কালুরঘাট রেল সেতু দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে। সাময়িক মেরামত করে ভারী ইঞ্জিন ও দীর্ঘতম ট্রেন চালানো হলেও ভবিষ্যতে এ রুটে ট্রেন সংখ্যা বাড়াতে একটি নতুন সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল রেলের। কিন্তু রেলসেতুর সঙ্গে সড়ক যান চলাচলের সুবিধা রাখার বিষয়ে জটিলতা, সেতুর উচ্চতা নিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের আপত্তিসহ অর্থায়ন জটিলতায় সেতু নির্মাণ কাজ শুরু করতে বিলম্ব হয়। বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ১২ দশমিক ২ মিটার উঁচু সেতু নির্মাণে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির পর সেতুটির দৈর্ঘ্য ও নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যায়। সর্বশেষ একনেক সভায় ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকার অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৪ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা দিচ্ছে সরকার, আর বাকি ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা আসবে কোরিয়ান ঋণ থেকে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, সেতুটির মোট দৈর্ঘ্য হবে ১১ কিলোমিটার ও প্রস্থ ১০০ ফুট। তবে নদীর ওপর মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে মাত্র ৭০০ মিটার। উভয় পাশে সাড়ে ৪ কিলোমিটার করে ভায়াডাক্ট নির্মাণ হবে। এক্সট্রা ডোজ টাইপ সেতুটির এক পাশে দুটি ডুয়েলগেজ রেলপথ ছাড়াও অপর পাশে স্ট্যান্ডার্ড মানের দুই লেনের (প্রতিটি লেন ১৮ ফুট) সড়ক ছাড়াও উভয় পাশে সার্ভিস লেন (৫ ফুট করে) সহ পথচারী পারাপারের সুব্যবস্থা রাখা হবে। সেতুটির নদীর অভ্যন্তরে ৫টি সহ মোট ৭টি স্প্যান থাকবে।
বর্তমানে পুরনো একলেন সেতুর কারণে যানবাহন পারাপারে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রেলসেতু দিয়ে হালকা যানবাহন চলাচল করলেও ভারী যানবাহনগুলো চলাচল করে ফেরি দিয়ে। ৯৩ বছরের পুরনো এ সেতুটি কক্সবাজারগামী ট্রেন চলাচলের সুবিধার্থে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালে সংস্কার করা হয়। ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সংস্কার করা সেতুটি ট্রেন ও যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকার দেশের একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কিংবা উদ্বোধনের সময় ফলকে কারো নাম রাখেনি। সর্বশেষ চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপে প্রথমবারের মতো ফেরি সার্ভিস উদ্বোধনের সময় ফলকে কারো নাম না দিয়ে প্রশংসিত হয়েছেন। শুধুমাত্র ‘কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর উপর রেল ও সড়ক সেতু নির্মাণ’ ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন লিখে বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বাংলাদেশ রেলওয়ের নাম ফলকে লিখে আরেকটি নজির সৃষ্টি করছে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়।