তাপমাত্রা বাড়াচ্ছে বিধিমালা না মেনে ইমারত নির্মাণ

আদর্শ একটি শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ বা উদ্ভিদ আচ্ছাদিত এলাকা থাকতে হয়। এটি শহরের ব্যস্ত নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও মানসিক প্রশান্তি রক্ষায় যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সবুজ আছে সাড়ে ৮ শতাংশেরও কম। আবার যেটুকু আছে, সেটুকু এলাকাও সীমানাপ্রাচীর দিয়ে এবং নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নগরবাসী এর সুবিধা পায় না।

আদর্শ একটি শহরের মোট আয়তনের অন্তত ২০ শতাংশ সবুজ বা উদ্ভিদ আচ্ছাদিত এলাকা থাকতে হয়। এটি শহরের ব্যস্ত নাগরিকদের স্বাস্থ্য মানসিক প্রশান্তি রক্ষায় যেমন ভূমিকা রাখে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও বজায় থাকে। কিন্তু রাজধানী ঢাকায় সবুজ আছে সাড়ে শতাংশেরও কম। আবার যেটুকু আছে, সেটুকু এলাকাও সীমানাপ্রাচীর দিয়ে এবং নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নগরবাসী এর সুবিধা পায় না। একই সঙ্গে স্থাপনা নির্মাণে মানা হয় না ইমারত নির্মাণ বিধিমালা। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত উচ্চতার বেশি উঁচু ভবন তৈরি করা হয়। কোথাও নকশার বাইরে গিয়ে করা হয় ভবনের সম্প্রসারণ। কোথাও ভবন ব্যবহারেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটছে। আবাসিক ভবনের অনুমোদন নিয়ে তৈরি করা হচ্ছে বাণিজ্যিক ভবন। অনেক ভবনের চারপাশে রাখা হচ্ছে না প্রয়োজনীয় পরিসর। বিধিমালা না মেনে এভাবে অবকাঠামো নির্মাণের কারণে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বড় প্রভাবক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজধানী আশপাশ এলাকার উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন তদারকির দায়িত্বে থাকা রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) বলছে, ঢাকায় ২০০৬-১৬ সাল পর্যন্ত বছরে নতুন স্থাপনা নির্মাণ হয়েছে ৯৫ হাজার। এর মধ্যে রাজউকের অনুমোদন নিয়ে গড়া হয়েছে কেবল দশমিক শতাংশ অবকাঠামো। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) ২০২১ সালের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ঢাকায় যেসব পার্ক বা উদ্যান রয়েছে সেখানে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে অবকাঠামো, কংক্রিট ধূসর এলাকা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিপরীতে উদ্বেগজনক হারে কমছে সবুজ এলাকার পরিমাণ। ৬৮ একর আয়তনের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উন্নয়ন প্রকল্পের প্রস্তাবিত নকশায় অবকাঠামো, কংক্রিট ধূসর এলাকার পরিমাণ শতকরা ৩৭ ভাগ। গুলশানে অবস্থিত সাড়ে নয় একরের বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কেও এর পরিমাণ ৩৭ ভাগ। ২৩ একরের ওসমানী উদ্যানের নকশায় ধূসর এলাকার পরিমাণ ৫২ ভাগ। দশমিক একরের বনানী পার্কের ক্ষেত্রে তা ৪২ ভাগ। উদ্যানের প্রকৃতি-পরিবেশ সবুজকে ধ্বংস করে এভাবে উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন বাস্তবায়ন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় বলেও সমীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করে বিআইপি।

বিষয়ে বিআইপি সভাপতি মোহাম্মদ ফজলে রেজা সুমন বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা শহরে প্রচলিত ইমারত নির্মাণ আইন বিধিমালা অনুযায়ী যে পরিমাণ খোলা মাটির জায়গা রাখা দরকার, বাস্তাবিকভাবে তা রাখা হচ্ছে না। ফলে শহরের তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে অনিয়ম যে ভূমিকা রাখছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। বিষয়টি নিয়ে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায়ও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। ঢাকা শহরের বিশেষ করে লিজ হোল্ড প্রপার্টির জমি যেগুলো বড় আকারের অর্থাৎ তিন কাঠা থেকে বেশি জমিতে ২০ শতাংশও সফটগ্রাউন্ড পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ তা থাকার কথা ছিল ৪০ শতাংশ। অঞ্চলগুলো কংক্রিটের আস্তরণে পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

এদিকে রাজউক প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় (ড্যাপ) উল্লেখ করা হয়েছে, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদন নিলেও শর্ত লঙ্ঘন করে ঢাকা মহানগরীর বিপুলসংখ্যক স্থাপনা বা ইমারত নির্মাণ করা হয়েছে। এর পেছনে উল্লেখযোগ্য কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আইন লঙ্ঘনের প্রবণতা, জনসচেতনতার অভাব, ইমারতে নিয়োজিত প্রকৌশলী বা স্থপতির মনিটরিংয়ের অভাব, মহাপরিকল্পনা বিধিবিধানের ত্রুটি-বিচ্যুতি ইত্যাদি।

বিধি না মেনে ইমারত নির্মাণের প্রবণতা একটি শহরের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে মনে করেন কানাডার সাসকাচোয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে জলবায়ুবিষয়ক পিএইচডি গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ঢাকা শহরের বিভিন্ন বিল্ডিংয়ের দূরত্ব কিছু ক্ষেত্রে এতই কম যে দুটি ভবনের মাঝখান দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ বেশ কম। আবার ফাঁকা জায়গা না থাকার কারণে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে ঊর্ধ্বকাশে যেতে পারে না। সূর্যের তাপমাত্রা বিভিন্ন স্থাপনায় জমা হয়ে থাকে। ফলে অনেক রাতেও এসব ভবন ঠাণ্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না। ভূপৃষ্ঠেও তাপমাত্রা জমা থাকায় অন্য এলাকার তুলনায় ঢাকার বায়ু গরম থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, দুপুর ১২টায় ঢাকার মূল ভূখণ্ডের তাপমাত্রা আশপাশ এলাকার তুলনায় - ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ আরো জানান, হিট আইল্যান্ড হয়ে থাকার কারণে দেখা যায়, ঢাকায় বৃষ্টি হচ্ছে না। তাপমাত্রা বেশি থাকায় বৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হয়। আবার ঢাকায় সবুজ জায়গা জলাভূমি কমে যাওয়ায় সূর্যের আলোর ব্যবহারও কম হচ্ছে। গাছপালার পরিমাণ বেশি থাকলে সালোকসংশ্লেষণের কারণে সূর্যের তাপমাত্রার একটি অংশ ব্যবহূত হতো। সেটির সুযোগ না থাকায় বায়ুমণ্ডলে সেই তাপ ছড়িয়ে পড়ছে। এতে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে তাপমাত্রা।

কাজের সুবাদে গত দুই দশকে দেশে শহরমুখী মানুষের অভিগমন বেড়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়। জনসংখ্যার সমান্তরালে বাড়ছে নগরায়ণ। ক্রমাগত কমছে খোলা চত্বরের পরিমাণ। একই সঙ্গে কমছে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা। অধিক জনসংখ্যার চাপে নির্মাণ করতে হচ্ছে বহুতল ভবনসহ নানা অবকাঠামো। এসব নির্মাণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেসব আনুষঙ্গিক উপাদান ব্যবহার করা হয়, তা তাপ অসংবেদনশীল বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। ফলে অধিকাংশ অবকাঠামো দিনের বেলায় উত্তপ্ত থাকে, আবার রাতে যে হারে ঠাণ্ডা হওয়ার কথা তা না হয়ে উল্টো তাপ ধরে রাখে। উদ্বৃত্ত তাপই আশপাশের পরিবেশের সঙ্গে মিশে তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। আবার ভূমি ব্যবহারের যথাযথ নীতিমালা না মেনে গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক বাণিজ্যিক ভবন। বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে ওঠা অবকাঠামোর অধিকাংশই অপরিকল্পিত।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের নগরায়ণ জনসংখ্যার তুলনায় ঢাকা, চট্টগ্রাম খুলনার বার্ষিক বৃদ্ধির হার গড়ে ২০০ শতাংশেরও বেশি বলে বিভিন্ন গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৫৯ সালের মাস্টারপ্ল্যানের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে ঢাকা শহর। শহরের উন্নয়নে কার্যকর কোনো নীতিমালা না থাকায় ভূমির যথাযথ ব্যবহার হয়নি, যেখানে-সেখানে গড়ে উঠেছে অবকাঠামো। তাছাড়া ওই সময়ের তুলনায় এখন রাজধানীতে জনসংখ্যা বেড়েছে ৩০ গুণ। সে অনুযায়ী মাস্টারপ্ল্যান আধুনিকায়ন করা হয়নি, যার প্রভাব পড়েছে উন্নয়নে। বাড়ছে তাপমাত্রা, যা জনজীবনে অস্বস্তির সঙ্গে নিয়ে আসছে নানা ধরনের রোগবালাইও।

জানতে চাইলে রাজউকের নগর পরিকল্পনাবিদ নতুন ড্যাপের প্রকল্প পরিচালক আশরাফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা শহর এর আশপাশে অবকাঠামো নির্মাণ করতে চাইলে অবশ্যই -সংক্রান্ত আইন বিধিবিধান মেনেই নির্মাণ করতে হবে। ড্যাপের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ এমন কোনো ভবনকে অনুমোদন দেয়া হবে না। আবার সরকারি জমি বা রাস্তা, খাল-নদী দখল করে যেসব স্থাপনা নির্মাণ করা হবে, সেগুলোরও অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ নেই। বিষয়ে রাজউকের নজরদারি আরো বাড়ানো হবে।

আরও