নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার সঙ্গে জেলা শহর মাইজদীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম নৌযান। দ্বীপের প্রায় সাত লাখ মানুষের জন্য সরকারিভাবে দুটি সি-ট্রাক বরাদ্দ থাকলেও প্রায় সময়ই বন্ধ থাকে একটি। ফলে গ্রীষ্ম, বর্ষা কিংবা শীত সবসময়ই ঝুঁকি নিয়ে মাছ ধরার নৌকা আর স্পিডবোটে উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে হয় তাদের। এতে প্রায়ই ঘটছে প্রাণহানির ঘটনা।
এ বিষয়ে যাত্রীরা ঘাট ইজারাদারদের দুষলেও দায় নিতে রাজি নয় ইজারা কর্তৃপক্ষ। আর প্রশাসন বলছে, সম্প্রতি নৌকা ও স্পিডবোটের ফিটনেস যাচাইসহ নানা উদ্যোগ নিয়েছেন তারা।
যাত্রীরা বলছেন, চেয়ারম্যান ঘাট-নলচিরা রুটে যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের জন্য সি-ট্রাক একমাত্র ভরসা। কিন্তু যাত্রীদের চাহিদামতো সেটি চলাচল না করায় পণ্যবাহী ট্রলার ও স্পিডবোটে বাধ্য হয়ে ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করতে হয়। বেশির ভাগ ট্রলার মূলত পণ্যবাহী। এরই মধ্যে কয়েকটি ট্রলারে যাত্রী পারাপার করা হয়। সেগুলোয় আবার মালপত্রও তোলা হয় কয়েক টন। একটি ট্রলারে মালপত্র ও্ঠানোর পর যাত্রী ধারণক্ষমতা থাকে ১০০ জনের মতো। কিন্তু ট্রলার মালিক ও চালকরা ১৫০-এর বেশি যাত্রী নিয়ে যাতায়াত করছেন। এসব নিয়ে যাত্রীরা প্রতিবাদ করলে তাদের মারধরসহ বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে যাতায়াত করায় ট্রলার মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন।
সায়েদুল হক নামে এক এনজিও কর্মী বলেন, ‘হাতিয়া উপজেলার একাধিক খণ্ড রয়েছে। মূল ভূখণ্ডের বাইরে আরো কয়েকটি ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। এছাড়া একটি অংশ রয়েছে জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে। অর্থাৎ মেঘনার দক্ষিণ পাশে দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া সদরসহ কয়েকটি ইউনিয়ন রয়েছে। আর মেঘনার উত্তর পাশে অর্থাৎ জেলার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে রয়েছে আরো দুটি ইউনিয়ন। পুরো উপজেলায় অন্তত সাত লাখ মানুষ বসবাস করে। এসব মানুষের যাতায়াতের মাধ্যমই হচ্ছে নৌযান। সরকারিভাবে দুটি সি-ট্রাক বরাদ্দ রয়েছে, যা অনেকটা নিরাপদ। কিন্তু বেশির ভাগ সময় একটি সি-ট্রাক বন্ধ থাকে। আরেকটি চললেও নদীতে সিগন্যাল থাকলে সেটাও বন্ধ থাকে। ফলে যাত্রীদের যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায় মাছ ধরা কাঠের নৌকা আর ছোট ছোট স্পিডবোট। যাত্রী বেশি হওয়ায় এসব নৌযানে অতিরিক্ত যাত্রী পারাপার করতে হয়।’
যাত্রীরা বলছেন, হাতিয়ার কয়েকটি ঘাটের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে চেয়ারম্যান ঘাট ও নলচিরা ঘাট। এ দুই ঘাট হয়ে প্রতিদিন কয়েক হাজার মানুষ যাতায়াত করে। নৌযানের মধ্যে সি-ট্রাক কিছুটা নিরাপদ হলেও সেটাতেও গাদাগাদি করে যেতে হয়। ২৫০-৩০০ যাত্রী নেয়ার সক্ষমতা থাকলেও নেয়া হচ্ছে ৭০০-১০০০ জন। স্বাভাবিক সময় দিনে দুবার যাতায়াত করলেও বৈরী আবহাওয়ায় সেটিও থাকে বন্ধ। ফলে দিনের বেশির ভাগ সময় মানুষের একমাত্র ভরসা ঝুঁকিপূর্ণ কাঠের নৌকা ও ছোট স্পিডবোট। ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো মূলত মাছ ও পণ্যবাহী। অথচ নেয়া হচ্ছে যাত্রী। তাও ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। অনেক সময় আরো বেশি ঝুঁকি নিয়ে যেতে হচ্ছে স্পিডবোটে। এসব নৌযানে নেই লাইফ জ্যাকেট কিংবা অন্য কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
এ বিষয়ে ইজারাদারের পক্ষে আলতাফ হোসেন জানান, সরকারি সি-ট্রাকে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়া হচ্ছে। তার পরও যাত্রীদের ভিড় না কমার কারণে মাঝে মধ্যে কাঠের নৌকা ও স্পিডবোটে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। তবে নৌকা ও বোট দুটোরই ফিটনেস রয়েছে। যেগুলোর ফিটনেস নেই সেগুলো চলাচল করছে না।
এ বিষয়ে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, ‘যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে প্রায়ই ঘাটে অভিযান চালানো হয়। যেসব নৌকা বা স্পিডবোটের ফিটনেস নেই, সেগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিসির সঙ্গে কথা হয়েছে। হাতিয়ার জন্য আরো একটি সি-ট্রাক ও ফেরি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরই মধ্যে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এটি বাস্তবায়ন হলে ঘাট আরো আধুনিক হবে। এতে হাতিয়ার মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ লাঘব হবে।’