চমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগ

শয্যার চার গুণ রোগী, হাম-ডেঙ্গুর চাপ সামলাতে হিমশিম চিকিৎসকরা

শুধু গতকাল দুপুর পর্যন্ত নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৩৬ শিশু। ওয়ার্ডে কর্মরত নার্সরা জানান, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে চারজন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে শয্যার তুলনায় প্রায় চার গুণ রোগী ভর্তি থাকায় শিশুদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাম ও ডেঙ্গুর প্রকোপের সঙ্গে জ্বর, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ায় ওয়ার্ডে জায়গা সংকুলান হচ্ছে না। মেঝে, বারান্দা ও সিঁড়ির পাশেও শয্যা বসিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের তিন ইউনিটে ১৬১ শয্যার বিপরীতে চিকিৎসাধীন রয়েছে প্রায় ৬০০ শিশু, যার মধ্যে ১৯৯ জন হাম আক্রান্ত বা সন্দেহভাজন। একই সঙ্গে ৩০ শয্যার ডেঙ্গু কর্নারে ভর্তি রয়েছে ১০০ রোগী। অতিরিক্ত রোগীর চাপে সীমিত চিকিৎসক-নার্স দিয়ে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকিও। বিশেষ করে হাম রোগীদের ভিড়ে অন্য শিশুরা সংক্রমণের তীব্র ঝুঁকিতে আছে।

সরজমিনে বৃহস্পতিবার চমেক হাসপাতালের ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে দেখা যায়, প্রবেশপথের আগেই বারান্দা ও সিঁড়িঘরের মেঝেতে শয্যা বসিয়ে শিশুদের স্যালাইনসহ চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। ওয়ার্ডে ঢোকার দুই পাশে হাম ব্লকের দুটি কক্ষে আটটি করে মোট ১৬টি শয্যা রয়েছে। তবে হাম আক্রান্ত শিশু ও তাদের স্বজনদের ভিড় এতটাই বেশি যে ভেতরে চলাচলও কষ্টসাধ্য। একেকটি শয্যায় তিন-চারজনের বেশি শিশু চিকিৎসা নিচ্ছে। অতিরিক্ত রোগীর কারণে অন্য রোগে ভর্তি শিশুরাও হাম সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছে, অসুস্থ হয়ে পড়ছেন কিছু অভিভাবকও। এদিকে বিদ্যুৎ সচল থাকলেও তীব্র গরমে রোগীদের বাতাস দিতে হাতপাখা ও চার্জার ফ্যান ব্যবহার করতে হচ্ছে।

চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে সাধারণ শয্যা রয়েছে ৬০টি। এর সঙ্গে হাম ও ডেঙ্গু ব্লকের ৩০টি মিলিয়ে মোট শয্যা ৯০টি। এছাড়া ৮ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ২১টি এবং শিশু কিডনি ওয়ার্ডে ২০টি শয্যা রয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা পর্যন্ত হাসপাতালে হাম আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন ১৯৯ শিশু ভর্তি ছিল। এর মধ্যে ১ নম্বর ডেডিকেটেড হাম ওয়ার্ডের ৫০ শয্যার বিপরীতে ভর্তি ছিল ১০১ জন এবং ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১৬ শয্যার হাম ব্লকে ৮৮ জন। এনআইসিইউতে ছিল আরো ১০ জন। একই সময়ে ৮ ও ৯ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে নিউমোনিয়া, জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে অন্তত ৪০০ শিশু চিকিৎসাধীন ছিল।

শুধু গতকাল দুপুর পর্যন্ত নতুন করে ভর্তি হয়েছে ১৩৬ শিশু। ওয়ার্ডে কর্মরত নার্সরা জানান, নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে চারজন শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।

ফেনীর সোনাগাজী থেকে হামে আক্রান্ত ছয় মাস বয়সী ফাইজানকে বুধবার চমেক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আনা হয়। তার মামা শরীফ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফেনী সদর হাসপাতাল ও আল আকসা বেসরকারি হাসপাতালে ভাগিনার চিকিৎসা না পেয়ে বুধবার মা ও শিশু হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সেখানে শয্যা না থাকায় বিকালে চমেক হাসপাতালে যাই। সেখানে চিকিৎসক ও নার্সের সংকট রয়েছে। টাকা না দিলে আয়া কিংবা ওয়ার্ড বয়দের দিয়ে কাজ করানো যায় না। একেকটি শয্যায় চার-পাঁচজনকে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় বাড়তি টাকা খরচ করে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে এনে চিকিৎসা করাতে হচ্ছে।’

পাশাপাশি জ্বর, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত শিশুরাও হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। তাদের বেশির ভাগের পরিবার আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় ভিড়ের মধ্যেই চমেক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছে; বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই অনেকের। একই ওয়ার্ডে হাম আক্রান্ত ও অন্যান্য রোগে আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা দেয়ায় সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। রোগীর তুলনায় চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যাও অপ্রতুল।

চমেক হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মুসা মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হামের রোগী বেড়েছে। একই সঙ্গে তীব্র গরমে জ্বর ও অন্যান্য সংক্রমণ নিয়ে শিশু ওয়ার্ডে শয্যার কয়েক গুণ রোগী ভর্তি হচ্ছে। অতিরিক্ত শয্যা বসিয়েও রোগীর সংকুলান করা যাচ্ছে না। একেকটি শয্যায় তিন-চারজন শিশুকে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এমনকি ওয়ার্ডের বাইরে বারান্দা ও সিঁড়ির পাশেও চিকিৎসা চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করা হলেও রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় শিশু ওয়ার্ডে পৃথক হাম ব্লকেও চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। এতে অন্যান্য রোগে ভর্তি শিশুদের হাম সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে। সীমিত চিকিৎসক, নার্স ও জনবল দিয়ে এত রোগী সামলানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।’

চমেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে ২৭ জন ভর্তি হওয়ায় সেখানে বর্তমানে ১০০ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে বৃহস্পতিবার জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালে ২৭ জন, বিআইটিআইডিতে সাত, জেনারেল হাসপাতালে ১২, সিএমএইচে তিন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ১৮ এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২৬ জন। সব মিলিয়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে ২১৫ ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৭ দিনে জেলায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৮৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। এর মধ্যে চমেক হাসপাতালেই মারা গেছে তিনজন।

চমেক হাসপাতালের ৩০ শয্যার ডেঙ্গু কর্নারে নারী ও পুরুষ রোগীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে। সরজমিনে সেখানে দেখা যায়, কর্নারটিতে ১০০ রোগী চিকিৎসাধীন। নার্সরা জানান, দিনের বেলায় বেশির ভাগ রোগী মশারি ব্যবহার না করলেও বিকালের পর তা টাঙান। তবে নিয়মিত মশারি ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হলেও তীব্র গরমের কারণে অনেক রোগীকেই তা খুলে রাখতে দেখা গেছে।

চমেক হাসপাতালে ডেঙ্গু কর্নারে চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৪০ বছর বয়সী নাজমা বেগম। তার ছেলে জাহিদ হোসেন তারেক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার মা রোববার থেকে ডেঙ্গু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন আছে। শরীর অনেক দুর্বল। উন্নতি হতে সময় লাগবে। এখানে প্রতিদিন রোগীর চাপ বাড়ছে। যেহেতু ডেঙ্গু হলে সুস্থ না হলে রোগীরা হাসপাতালে থাকেন, সে কারণে এখানে রোগীর সংখ্যা বেশি।’

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দিন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সবাই চট্টগ্রাম মেডিকেলমুখী হওয়ায় এখানে রোগীর চাপ বেড়েছে। ওয়ার্ডগুলোতে শয্যা অনুযায়ী জনবল থাকলেও ভর্তি রোগী কয়েক গুণ বেশি। ফলে চিকিৎসাসেবা দিতে আমাদের বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে। কভিডের সময়ের মতো হাম কিংবা ডেঙ্গুর জন্য আলাদা ডেডিকেটেড হাসপাতালের ব্যবস্থা করা গেলে চমেক হাসপাতালের ওপর চাপ কমত। তবে সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিশু রোগীর বাড়তি চাপ সামাল দিতে চমেক হাসপাতাল থেকে হাম আক্রান্তদের জন্য পৃথক চিকিৎসা কেন্দ্রে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল অস্থায়ীভাবে ব্যবহারের প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে। এতে চমেক হাসপাতালের ওপর চাপ কমার পাশাপাশি সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো এবং অন্যান্য রোগীর চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক ডা. সেখ ফজলে রাব্বি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হাম রোগীদের চিকিৎসায় রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল বা অন্য কোনো হাসপাতালকে অস্থায়ীভাবে ব্যবহার করা যায় কিনা, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি। চসিক মেয়র রেলওয়ে হাসপাতালকে এ কাজে ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন। এটি বাস্তবায়ন করা গেলে চমেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডের ওপর চাপ কমবে। তবে বিষয়টি এখনো আলোচনাধীন।’

আরও