চট্টগ্রামে এক দশকে পানির স্তর নেমেছে ১০ মিটারের বেশি বাড়ছে আয়রন ও লবণাক্ততা

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোয় দিন দিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে।

চট্টগ্রামের উপকূলীয় উপজেলাগুলোয় দিন দিন ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এতে সুপেয় পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী, সন্দ্বীপ ও বাঁশখালীর মতো উপকূলঘেঁষা এলাকায় অনেক গভীরেও সুপেয় পানি মিলছে না। যেসব গভীর নলকূপে পানি মিলছে, তাতেও লবণাক্ততা ও আয়রনের পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চট্টগ্রামে গত এক দশকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ১০ মিটার পর্যন্ত নেমে গেছে, যা কিছু এলাকায় পৌঁছেছে প্রায় ১৮ মিটার পর্যন্ত। ২০২০ সালের আগে যেখানে সাব-মার্সিবল পাম্প ছিল হাতেগোনা, সেখানে ছয় বছরে বসানো হয়েছে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি। দেড় বছরেই বসানো হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার নতুন পাম্প। এত গভীর থেকেও মিলছে না মানসম্পন্ন পানি। আয়রন ও লবণাক্ততা সহনীয় মাত্রার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে এখন এসব পাম্পে আলাদাভাবে বসানো হচ্ছে রিমুভাল ফিল্টার।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, পানিতে লবণাক্ততার সহনীয় মাত্রা প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ ৬০০ মিলিগ্রাম এবং আয়রনের মাত্রা সর্বোচ্চ এক মিলিগ্রাম। কিন্তু চট্টগ্রামের উপকূলীয় কিছু এলাকায় গভীর নলকূপের পানিতে লবণাক্ততা পাওয়া যাচ্ছে ৩০০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। আর আয়রন পাওয়া গেছে সর্বোচ্চ ১৬ মিলিগ্রাম।

বাঁশখালীর চাম্বল ইউনিয়নের বাসিন্দা আসহাব উদ্দিন বলেন, ‘বাঁশখালীতে সুপেয় পানির সংকট বেশি। অগভীর নলকূপের পানিতে আয়রনের পাশাপাশি লবণাক্ততা ক্রমেই বাড়ছে। নতুন করে সাব-মার্সিবল পাম্পের সংখ্যা বাড়লেও ভালো মানের পানি পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন পাম্পগুলোয় ফিল্টার বসাতে হচ্ছে। সুপেয় পানির অভাবে রোগব্যাধিও বেড়েছে। সুপেয় পানিতেও লবণাক্ততার অস্তিত্ব আছে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীনভাবে ব্যক্তি পর্যায়ে বসানো পাম্পের সংখ্যা অনেক বেশি। অতিরিক্ত পানি উত্তোলনে ভবিষ্যতে চট্টগ্রামে সুপেয় পানির সংকট আরো প্রকট হবে। সীতাকুণ্ড, কর্ণফুলী, সন্দ্বীপ, বাঁশখালীর মতো উপকূলঘেঁষা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির মান এতটাই খারাপ যে অনেক গভীরেও সুপেয় পানি মিলছে না। ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিনির্ভরতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এখন এ অঞ্চল দাঁড়িয়ে আছে সম্ভাব্য পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে।

পানির স্তর-সংক্রান্ত জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বাঁশখালী উপজেলার সরল ও শেখেরখীল ইউনিয়নে গত ১০ বছরে পানির স্তর নিচে নেমেছে ১৭ দশমিক ৮২ মিটার। কাঁঠালিয়া ইউনিয়নে নেমেছে ১৫ দশমিক ৮৪ মিটার এবং গণ্ডমারায় সাড়ে ১৩ মিটার, চাম্বল ইউনিয়নে ১০ দশমিক ৬৭ মিটার। উপজেলায় গড়ে পানির স্তর নেমেছে ১২ দশমিক ৬০ মিটার। পটিয়া পৌরসভা এলাকায় গত ১৫ বছরে পানির স্তর নিচে নেমেছে ১০ মিটার। এছাড়া উপজেলার কোলগাঁও ও ছনহরা ইউনিয়নে ১০ দশমিক ৮০ মিটার, জিরিতে সাত মিটার, ভাঁটিখাইনে আট মিটার এবং কচুয়াই ইউনিয়নে পানির স্তর নেমেছে সাড়ে নয় মিটার। উপজেলায় গত ১৫ বছরে পানির স্তর নিচে নেমেছে গড়ে ৮ দশমিক ২৭ মিটার। এছাড়া আনোয়ারা উপজেলার বৌরাগ ইউনিয়নে ১২ বছরে পানির স্তর নিচে নেমেছে সর্বোচ্চ নয় মিটার। এই সময়ে উপজেলায় গড়ে পানির স্তর নিচে নেমেছে ৪ দশমিক ৮২ মিটার। চন্দনাইশে গত ১০ বছরে পানির স্তর নেমেছে ৩ দশমিক ৩৭ মিটার। সীতাকুণ্ডে প্রায় তিন মিটারসহ অন্যান্য উপজেলায় গড়ে তিন থেকে ছয় মিটার পানির স্তর নেমেছে।

সন্দ্বীপ উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী রবিন সরকার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘উপজেলা পানির স্তর সেভাবে নিচে না নামলেও আয়রন ও লবণাক্ততার সমস্যা আছে। বিশেষ করে উপজেলার রহমতপুর, আজিমপুর, হরিশপুর, উড়িরচরসহ বেড়িবাঁধসংলগ্ন এলাকার সুপেয় পানির জন্য ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ ফুট পর্যন্ত গভীরে যেতে হয়। এ এলাকায় আয়রন বা লবণাক্ততা কমিয়ে আনতে নিয়মিত পানির মান পরীক্ষা ছাড়াও সাব-মার্সিবল পাম্পে ফিল্টার বসাতে হচ্ছে।’

কর্ণফুলী উপজেলার উপসহকারী প্রকৌশলী নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামের মধ্যে বর্তমানে কর্ণফুলী উপজেলার পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। উপজেলার চারপাথরঘাটা, শিকলবাহায় অনেক গভীর থেকে পানি উত্তোলনের চেষ্টা করেছি। কিন্তু মান কিংবা পানির রঙ খুবই খারাপ। সম্প্রতি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ হাজার ২০০ ফুটের বেশি খনন করলেও আমরা ভালো মানের পানি পাইনি। এমনকি অন্যান্য ইউনিয়নে ৮০০-৯০০ ফুট গভীরতায় গেলেও ভালো পানি পাওয়া যাচ্ছে না।’

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ সালের আগে সাব-মার্সিবল পাম্প ছিল খুবই সামান্য। গত ছয় বছরে জেলার ১৫টি উপজেলায় স্থাপন হয়েছে ২৬ হাজার ৬৩২টি। এর আগে এ অঞ্চলে পানির জন্য অগভীর নলকূপ, শ্যালো মেশিনের ওপর নির্ভর করা হতো। তবে পানির স্তর নিম্নমুখী হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানি তুলে আনতে সাব-মার্সিবল পাম্প বসানোর হার বেড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত জেলায় নতুন করে সাব-মার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হয়েছে সাড়ে ছয় হাজার।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলায় ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ২৪ হাজার ৬৩০টি সাব-মার্সিবল পাম্প বরাদ্দ দিয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরেও বরাদ্দ ছিল ২ হাজার ৩৯২। অর্থাৎ ছয় অর্থবছরে ২৭ হাজার ২২২টি পাম্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী পালাশ চন্দ্র দাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘চট্টগ্রামের অনেক ইউনিয়নে এক দশকে পানির স্তর ১০ মিটারের বেশি নেমে গেছে। গভীর থেকে পানির উৎস খুঁজে সুপেয় পানির জন্য সাব-মার্সিবল পাম্পের বিকল্প নেই। সরকারই বরাদ্দ দিচ্ছে এ পাম্প। জেলায় এখন বড় সমস্যা আয়রন ও লবণাক্ততা। সরকারি বরাদ্দের বাইরে পাম্পের সংখ্যা আরো কয়েকগুণ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে সাব-মার্সিবল পাম্প বসানোর জন্য অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না। সে কারণে চট্টগ্রাম জেলায় কী পরিমাণ পাম্প বসানো হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। সরকারি হিসাবের বাইরে কয়েকগুণ বেশি পাম্প বসানো হয়েছে।’

ভূগর্ভস্থ সুপেয় পানিতে আয়রন ও ক্লোরাইনের (লবণাক্ততা) বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের জন্য সাব-মার্সিবল পাম্প বসানো ভালো না হলেও এর কোনো বিকল্প নেই। হস্তচালিত অগভীর নলকূপের কোনো বরাদ্দ এখন নেই। তবে পানিতে আয়রন বা লবণাক্ততার সমস্যা সমাধানে আমরা আইআরপি ফিল্টার পাইপলাইনে স্থাপন করছি। এ ফিল্টার প্রতি ঘণ্টায় এক হাজার লিটার পানি পরিশোধন করতে পারে।’

আরও