বাপেক্সের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ছয় রিগে কূপ খনন করবে পেট্রোবাংলা

দেশে গ্যাসের মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে কূপ খনন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের পাঁচটি রিগ। এর বাইরে চুক্তিভিত্তিক তিনটি রিগ টার্ন কি পদ্ধতিতে কূপ খননে নিয়োজিত রয়েছে।

দেশে গ্যাসের মজুদ সক্ষমতা বাড়াতে কূপ খনন কার্যক্রমে যুক্ত রয়েছে স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের পাঁচটি রিগ। এর বাইরে চুক্তিভিত্তিক তিনটি রিগ টার্ন কি পদ্ধতিতে কূপ খননে নিয়োজিত রয়েছে। এ কাজের তৎপরতা বাড়াতে আরো তিনটি রিগ চুক্তিতে দেশে আনার পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। সব মিলিয়ে স্থানীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক ছয়টি রিগ কূপ খননে কাজ করবে।

জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, দেশে গ্যাসের স্থানীয় মজুদ দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু বাপেক্সের রিগ দিয়ে গ্যাস কূপ খনন করলে খুব বেশি এগোনো যাবে না। ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে ১০০ কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের উদ্যোগ নিয়েছে জ্বালানি বিভাগ। এ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী কাজ করতে হলে আরো রিগ প্রয়োজন। কয়েকটি এরই মধ্যে দেশে এসেছে। বাকিগুলো নতুন বছরের শুরুতে যুক্ত হবে।

পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, দেশের স্থলভাগে মোট ১১টি রিগ দিয়ে কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কাজ একসঙ্গে চলবে। এসব কূপের কাজ শেষ হলে আনুমানিক দৈনিক ১৪ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। বর্তমানে বাপেক্সের পাঁচটি রিগের মধ্যে কুমিল্লার শ্রীকাইল গ্যাস ক্ষেত্রের শ্রীকাইল-৫ কূপে বিজয়-১০ রিগ কূপ খননে নিয়োজিত রয়েছে, বিজয়-১১ রিগ হবিগঞ্জ-৫ কূপ খনন করছে। বিজয়-১২ রিগ সিলেটের কৈলাসটিলা-১, বিজয়-১৮ রিগ খাগড়াছড়ির সেমুতাং গ্যাস ক্ষেত্রের ৬ নম্বর কূপ খনন করবে। এছাড়া আইপিএস রিগ দিয়ে সিলেটের বিয়ানীবাজার-২ গ্যাসকূপ খননে নিয়োজিত রয়েছে। বাপেক্সের গ্যাস কূপ খনন কার্যক্রম বাড়াতে আরো দুটি রিগ ক্রয় করবে জ্বালানি বিভাগ।

বাপেক্স ও পেট্রোবাংলার দুজন কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, যেসব কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে সেগুলো উন্মুক্ত দরপত্রের ভিত্তিতে কোম্পানি নির্বাচন করা হয়েছে। বাপেক্স, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল) ও বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড (বিজিএফসিএল) আওতাধীন কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার করা হবে। টার্ন কি পদ্ধতিতে এসব কূপ খনন করার অর্থ হলো কূপ খনন করতে রিগসহ প্রয়োজনীয় যেসব মালামাল ও সেবা লাগবে তার সবগুলোই এসব কোম্পানি দেবে। পেট্রোবাংলা এসব সেবার বিনিময়ে অর্থ প্রদান করবে।

জানা গেছে, সিলেট-১০ এক্স, সিলেট-১১ (তেল কূপ) ও রশিদপুর-১১ কূপ খনন করা হবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। তিতাস-১৮, তিতাস-৩১ (গভীর) কূপ ও ভোলা দ্বীপে কূপ খননও করা হবে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে। এছাড়া শ্রীকাইল-৫, হবিগঞ্জ-৫ (ওয়ার্কওভার), কৈলাসটিলা-১ (ওয়ার্কওভার), বিয়ানীবাজার-২ (ওয়ার্কওভার), সেমুতাং-৬ (ওয়ার্কওভার) কূপ খনন করবে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি বাপেক্স।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বৃহৎ গ্যাস ফিল্ড তিতাস-২৮ (কূপ নম্বর) কূপে চলতি বছরের ২৭ নভেম্বর চুক্তিভিত্তিক রিগ দ্বারা কূপ খনন শুরু হবে। এছাড়া আগামী বছরের জানুয়ারিতে আরো একটি রিগ তিতাস-৩১ কূপে যুক্ত হবে। এ কূপ খননে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) চীনা কূপ খনন কোম্পানি সিসিডিসি (সিএনপিসি চুঙকিঙ ড্রিলিং ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড) সঙ্গে চুক্তি করেছে। এছাড়া ভোলা দ্বীপে কূপ খনন করতে বাপেক্স এবং তৃতীয় পক্ষীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চীনের সিনোপ্যাকের সঙ্গে চুক্তি সই করবে। বাপেক্স সূত্রে জানা গেছে, চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি সই হলে ভোলায় কূপ খননে সেখানে একটি রিগ কাজ করবে।

দেশের দ্বীপ জেলা ভোলায় এরই মধ্যে নয়টি কূপ খনন করা হয়েছে। এসব কূপ খননের মাধ্যমে সেখানে দৈনিক ১৮ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান মিলেছে। বর্তমানে ভোলায় ৮ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট গ্যাসের ব্যবহার হচ্ছে। বাকি ১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সেখানে চাহিদা না থাকায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ভোলার গ্যাস মূল ভূখণ্ডে আনতে এরই মধ্যে সেখানে পাইপলাইন নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে পেট্রোবাংলা। যা এখন প্রক্রিয়াধীন। বর্তমানে ভোলায় পেট্রোবাংলা যে কূপ খননের উদ্যোগ নিয়েছে চুক্তিভিত্তিক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেখানে রিগ ব্যবহার করা হবে।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কম সময়ের মধ্যে দ্রুত গ্যাস উৎপাদনের লক্ষ্যে কূপ খননে গতি বাড়িয়েছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার ২০২৮ সাল পর্যন্ত একটি লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অনেক বেশি রিগের প্রয়োজন রয়েছে। মোট ১১ রিগ একসঙ্গে কূপ খননে কাজ করবে। যা এর আগে কখনো হয়নি। সফলভাবে এসব রিগ দিয়ে কাজ করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী দ্রুত কাজও এগিয়ে নেয়া যাবে।’

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা রয়েছে ৩৮০ কোটি ঘনফুট। সেখানে মোট সরবরাহ হচ্ছে ২৭০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। প্রতিনিয়ত স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন ব্যাপক হারে কমে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পেট্রোবাংলা স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যাপক হারে এলএনজি আমদানি করছে। তবে ব্যয়বহুল এই এলএনজি আমদানি করে জ্বালানির জোগান নিশ্চিত করা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।

পেট্রোবাংলা বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মধ্যে ৫০টি এবং ২০২৬-২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন ও সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সংস্থাটি। দেশের বিভিন্ন ব্লকে অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খনন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এরই মধ্যে জামালপুরে গ্যাসের মজুদের পরিমাণ ও বিস্তৃতি মূল্যায়নের লক্ষ্যে আরো দুটি (একটি উন্নয়ন ও একটি অনুসন্ধান) কূপ খননের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরির কাজ চলছে। সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) অধীন হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে সিলেট-১০ কূপ খননের সময় ওই এলাকায় জ্বালানি তেলের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া হরিপুরে মজুদ করা জ্বালানি তেল বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন নিশ্চিত হওয়ার লক্ষ্যে সিলেট-১২ তেল কূপ খননের কার্যক্রম চলমান।

আরও