বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে পঁচাত্তরে একবার বিলুপ্ত হয়েছিল আওয়ামী লীগ। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ১৯৭৬ সালে আওয়ামী লীগ নামে আবার নিবন্ধিত হয়ে রাজনীতিতে ফেরে দলটি। যদিও সে সময় অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানা কারণে দলটিকে অস্তিত্বের মারাত্মক সংকটের মুখেও পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ১৯৭৮ সালের দিকে দলটির হাল ধরেন নোয়াখালীর আব্দুল মালেক উকিল। পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনা হয় আওয়ামী লীগকে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরো বড় সংকটে পড়েছে দলটি। বর্তমানে আওয়ামী লীগকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো কোনো নেতা দৃশ্যপটে অনুপস্থিত। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে গ্রহণযোগ্য কেউ উঠেও আসতে পারেননি। এ অবস্থায় মালেক উকিলের মতো নেতার অভাব বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করছে আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বক্তব্য হলো সরকার পতনের পর দলের সভাপতিসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশ দেশ থেকে পালিয়েছেন। দেশে থেকে যাওয়া বা পালাতে না পারা নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার মতো কোনো নেতৃত্ব দলটিতে গড়ে ওঠেনি। এ অবস্থায় প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দলের হাল ধরার জন্য মালেক উকিলের মতো নেতার সন্ধানে আছে আওয়ামী লীগ।
নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির এক সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, ‘আমাদের কোনো ভুল ছিল না, সেটা বলব না। ৫ আগস্টের আগে যে আন্দোলন হয়েছে এ ধরনের আন্দোলন আমরা আগেও দক্ষতার সঙ্গে সফলভাবে মোকাবেলা করেছি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের মধ্য দিয়ে আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো পুরো ধ্বংস হয়ে গেছে। দায়িত্বশীল নেতাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিশাপ দিচ্ছেন। এ মুহূর্তে দলকে নেতৃত্ব দেয়ার মতো লোক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার যাদের পাওয়া যাচ্ছে, তাদের প্রতি আস্থা রাখা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে দল একটা বৈরী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।’
শেখ মুজিবকে হত্যার এক বছর পর ১৯৭৬ সালের ২৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের পুরনো কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্যদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে মহিউদ্দিন আহমেদ ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাজেদা চৌধুরীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক করা হয় মিজানুর রহমান চৌধুরীকে। ওই সভায় ৩১ আগস্টের মধ্যে দলটিকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নামে নিবন্ধনের জন্য গঠনতন্ত্র জমা দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালের ৪ নভেম্বর আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধন লাভ করে।
পরে ১৯৭৭ সালের ৩ ও ৪ এপ্রিল হোটেল ইডেনে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিটি গঠন সম্ভব না হওয়ায় সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে আহ্বায়ক করা হয়। তাকে নেতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ১০ দিনের মধ্যে ৪৪ সদস্যের একটি সাংগঠনিক কমিটির নাম ঘোষণার দায়িত্ব দেয়া হয়। কারারুদ্ধ নেতারা মুক্তিলাভের পর কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হবেন বলেও সিদ্ধান্ত হয়।
১৯৭৮ সালের ৩ থেকে ৫ এপ্রিল তিন দিনব্যাপী আওয়ামী লীগের সম্মেলনে আব্দুল মালেক উকিলকে সভাপতি ও আব্দুর রাজ্জাককে সাধারণ সম্পাদক করা হলে মিজানুর রহমান চৌধুরী ওই কমিটিকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যা দেন। পরে মিজানুর রহমান চৌধুরী ওই বছরের (১৯৭৮) ১ আগস্ট দেওয়ান ফরিদ গাজীকে নিয়ে আলাদা আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অনেকে। স্পষ্টত আওয়ামী লীগ দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। এ সময়ে মুজাফফর হোসেন পল্টুর নেতৃত্বে আরেকটি অংশ বেরিয়ে যায় এবং সেটিও আওয়ামী লীগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ডের পর এটিই ছিল দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। এর মূল অংশের নেতৃত্বে ছিলেন আবদুল মালেক উকিল। আরেক অংশের নেতৃত্ব দেন মিজানুর রহমান চৌধুরী। তবে নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপির সঙ্গে মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের। নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়ী হয় বিএনপি। আর আওয়ামী লীগের মূল অংশটি ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৫টিতে প্রার্থী দাঁড় করিয়ে ৩৯টি আসন লাভ করে।
এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫০ দশমিক ৬২ শতাংশ। এর মধ্যে বিএনপি পায় ৪১ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর আওয়ামী লীগের আব্দুল মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন অংশটি পায় ২৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অংশ পায় ২ দশমিক ৭৮ শতাংশ ভোট।
এর আগে ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর জিয়াউর রহমান প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্বে আসেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে জিয়াউর রহমান জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী হন এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পায়।
দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় থাকা আওয়ামী লীগকে প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলার পাশাপাশি আন্তঃদলীয় কোন্দলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সময় পার করতে হয়েছে। তবে ১৯৭৮ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের ভাঙন ঠেকিয়ে দলের নেতাদের একক একটি প্যানেল নির্বাচন সম্ভব হলেও দলের সেই ঐক্য বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে ১৯৭৮ সালের ১১ আগস্ট মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে দলের বাইরে পাল্টা কমিটি গঠন করা হয়। এতে মূল আওয়ামী লীগের রফিক উদ্দিন ভূঁইয়া (সহসভাপতি) ও কাজী মোজাম্মেল হক (শ্রম সম্পাদক) এবং ৩৪ সদস্যের কার্যনির্বাহী সংসদের ১১ জন যোগ দেন। মিজান চৌধুরীর সঙ্গে যোগ দেয়াদের মধ্যে নূরে আলম সিদ্দিকী, আবদুল কুদ্দুস মাখনের নামও উল্লেখযোগ্য।
এরপর ১৯৭৮ সালের ৩-৫ নভেম্বর ইডেন হোটেলে তিন দিনব্যাপী মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন অংশ কাউন্সিলের আয়োজন করে। সেখানে মিজানুর রহমান চৌধুরীকে সভাপতি, অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে সাধারণ সম্পাদক, মহিউদ্দিন আহমদ ও মুজাফফর হোসেন পল্টুকে যুগ্ম আহ্বায়ক এবং নূরে আলম সিদ্দিকীকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি করা হয়। এ ঘটনার পর আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বর্ধিত সভার মধ্য দিয়ে মিজানুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে আইনানুগ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দলটি। আওয়ামী লীগের একটি অংশের বিভক্তির পর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ করে এ ধরনের উদ্যোগের সঙ্গে তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই বলে পত্রিকায় বিবৃতি দিতে থাকেন। একই সঙ্গে মূল আওয়ামী লীগের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেন।
১৯৭৮ সালের ২৩ ও ২৪ নভেম্বর আব্দুল মালেক উকিলের সভাপতিত্বে মূল আওয়ামী লীগের দুই দিনব্যাপী বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। সে সময় আওয়ামী লীগ থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরীর আলাদা হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও নেতৃত্ব নিয়ে দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের অবসান ঘটেনি বরং তা নিয়ে নতুন সমস্যা দেখা দেয়।
পরে ১৯৮১ সালের ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারি পরবর্তী কাউন্সিলের ঘোষণা আসে। কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে দলীয় বিভেদ চরমে পৌঁছে। এ সময় আওয়ামী লীগের মধ্যে তিনটি উপদল বা প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের উত্থান ঘটে। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাককে কেন্দ্র করে একটি, সাংগঠনিক সম্পাদক তোফায়েল আহমেদকে কেন্দ্র করে অপর একটি এবং সভাপতি আব্দুল মালেক উকিল ও সংসদে আওয়ামী লীগের বিরোধীদলীয় নেতা আসাদুজ্জামান খান প্রমুখের নেতৃত্বে তৃতীয় আর একটি গ্রুপ। কাউন্সিলকে সামনে রেখে প্রত্যেক গ্রুপেরই সভাপতি পদে নিজস্ব পছন্দের প্রার্থী ছিল। এ রকম এক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থায় আওয়ামী লীগের আলোচ্য কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়।
১৯৮১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে ইডেন হোটেল প্রাঙ্গণে আব্দুল মালেক উকিলের সভাপতিত্বে আওয়ামী লীগের তিন দিনব্যাপী কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। ওই কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে শেখ হাসিনার। কাউন্সিল চলাকালে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে বিভক্তি চরমে উঠলে প্রার্থীরা শেখ হাসিনাকে সভাপতি পদের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে মনোনীত করেন। সে সময় টেলিফোন মারফত ভারতে আশ্রিত শেখ হাসিনাকে দলের সভাপতি পদ নিতে অনুরোধ জানানো হয় এবং তিনি সম্মত হন। এরপর শেখ হাসিনাকে সভাপতি করে কমিটি গঠন করে আওয়ামী লীগ। পরে ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা দলীয় সভাপতি হিসেবে দেশে ফিরে কয়েক ভাগে বিভক্ত আওয়ামী লীগকে একত্র করেন।
বর্তমানে ওই সময়ের চেয়েও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ। যদিও দলটির কার্যক্রম ধরে রাখার মতো কোনো নেতা এখনো দৃশ্যমান হয়নি। এ বিষয়ে জানতে হোয়াটসঅ্যাপ মারফত যোগাযোগ করা হলে আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল। নেতাকর্মীরা এখন নিরাপদে থাকার চেষ্টা করছেন। এটি পালিয়ে থাকা না, জীবন বাঁচানো। এর মধ্যেও আমাদের নেতাকর্মীরা দলের সভাপতির নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।’