লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নিখোঁজ সাগর

‘বাঁইচা থাকলে ছেলে তো যোগাযোগ করত’

সাগরের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর সঙ্গে ইতালি যাওয়ার জন্য ২৩ লাখ টাকায় চুক্তি করেন সাগর। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর পরিবারটি এক-তৃতীয়াংশ টাকা পরিশোধ করে। পরদিন সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দিন রাখার পর মিসর হয়ে তাকে লিবিয়ায় নেয়া হয়। পরে বাংলাদেশী দালালচক্র তাকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়

অবৈধপথে ইতালি যাওয়ার সময় লিবিয়া থেকে নিখোঁজ হয়েছেন মাদারীপুরের তরুণ মো. সাগর মিয়া (২০)। ১০ মাস ধরে তার কোনো সন্ধান পাচ্ছে না পরিবার। এর আগে লিবিয়ার একটি বন্দিশালা থেকে সাগরকে মুক্ত করতে দালাল চক্রকে ৯ লাখ টাকা দেয়া হয়। এরপরও তার কোনো খোঁজ দিতে পারেনি। ছেলের সন্ধান ও দালালদের বিচার দাবি করেছেন সাগরের মা।

নিখোঁজ সাগর মাদারীপুর সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের পখিরা এলাকার কৃষক খবির মোল্লার ছেলে। তিনি গত বছরের ১৩ নভেম্বর থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। সন্তানের সন্ধান চেয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন তার মা বেলাতুননেছা। একই সঙ্গে দালালদের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেছেন তিনি।

গতকাল বিকালে নিজ বাড়িতে সংবাদ সম্মেলন করে ছেলের সন্ধান চেয়ে আকুতি জানান বেলাতুননেছা।

সাগরের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর শহরের সৈদারবালী এলাকার মানবপাচার চক্রের সদস্য ও স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারীর সঙ্গে ইতালি যাওয়ার জন্য ২৩ লাখ টাকায় চুক্তি করেন সাগর। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২ নভেম্বর পরিবারটি এক-তৃতীয়াংশ টাকা পরিশোধ করে। পরদিন সাগরকে আকাশপথে সৌদি আরবে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুই দিন রাখার পর মিসর হয়ে তাকে লিবিয়ায় নেয়া হয়। পরে বাংলাদেশী দালালচক্র তাকে লিবিয়ার একটি বন্দিশালায় নিয়ে যায়।

এরপর লিবিয়া হয়ে ইতালি পাঠানোর কথা বলে পরিবারের কাছ থেকে চুক্তির ২৩ লাখ টাকা নেয়া হয়।

১৫ নভেম্বর রাতে সাগরকে লিবিয়ার উপকূল থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি পাঠানোর উদ্দেশ্যে একটি নৌকায় তুলে দেয়া হয়। নৌকাটি কিছুদূর যাওয়ার পর লিবিয়ার সন্ত্রাসীদের হাতে আটক হয়েছে বলে পরিবারকে জানায় দালাল চক্র। সাগরকে মুক্ত করতে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা না দেয়ায় তার ওপর নির্যাতন চালানো হয়, এমন অভিযোগ পাওয়ার কথা জানায় পরিবার।

পরে বাংলাদেশী আরেক দালাল গোলাম মওলার (৪৮) মাধ্যমে সাগরের মুক্তির জন্য পরিবার ৯ লাখ টাকা দেয়। টাকা নেয়ার পর থেকে সাগরের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি দালাল চক্র। গত ১০ মাস ধরে দালালদের কাছে বারবার ধরনা দিয়েও আশ্বাস ছাড়া কোনো তথ্য পায়নি পরিবার।

এ অবস্থায় সাগরের মা বেলাতুননেছা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ছেলের সন্ধান চেয়ে লিখিত আবেদন করেন। একইসঙ্গে গত ৪ জানুয়ারি দালালদের বিচার ও ছেলের সন্ধান চেয়ে মাদারীপুর আদালতের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে বেলাতুননেছা বলেন, ‘বাঁইচা থাকলে ছেলে তো যোগাযোগ করত। ছেলেকে ফিরাইয়া দেওয়ার কথা কইয়া দালালে ধাপে ধাপে ৩২ লাখ টাকা নিছে। দালাল খালি আশা দিচ্ছে। তারা এখনো কয় না আমার ছেলে নাই? আমার ছেলে আর নাই, এটা বুঝতে পারতাছি। আমার বাঁচতে কষ্ট হচ্ছে। জমিজমা সব শেষ, ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে পড়েছি।’

দালালদের বিরুদ্ধে মামলা করে উল্টো হয়রানি ও হুমকির শিকার হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি। বেলাতুননেছা বলেন, ‘মামলা দিয়েছি, চালাতে পারতাছি না। মামলা তুলে নিতে দাদালরা হুমকি দিচ্ছে। আমি বিচার চাই, ছেলেকে ফেরত চাই। আমার ছেলেরে ওরা কী করেছে সেটা জানতে চাই। আমার সোনার টুকরা বাবার সন্ধান চাই। ওই আমার ভরসা।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাগরের সহপাঠী নাসির ইসলাম বলেন, ‘সাগররা দুই ভাই, এক বোন। ভাইদের মধ্যে সাগর বড়। পরিবারটি সাগরকে বিদেশে পাঠাতে গিয়ে সবকিছু শেষ করে দিয়েছে। ভিটেবাড়িটুকুও বন্ধক রাখা। তবুও যদি ওর সন্ধান পাওয়া যেত, তাহলে কষ্টটা থাকত না। যারা সাগরকে প্রলোভন দিয়ে ইতালি নেয়ার কথা বলে লিবিয়া নিছে, মুক্তিপণের জন্য টাকা নিছে, সেই দালালদের বিচার চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় দালাল নামজুল ব্যাপারী হলেও তিনি মূলত শিবচর উপজেলার মির্জারচর সিপাইকান্দি এলাকার ইসমাইল ব্যাপারীর ছেলে গোলাম মওলার হয়ে কাজ করেন। গোলাম মওলা মানবপাচার চক্রের অন্যতম সক্রিয় সদস্য বলে অভিযোগ রয়েছে। শিবচরসহ পুরো জেলায় তার অন্তত ১০ জন সহকারী রয়েছেন।

গোলাম মওলা ও তার সহকারীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও চক্রটির সদস্যরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন বলে অভিযোগ পরিবারের। এ বিষয়ে জানতে গোলাম মওলার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়।

তবে নামজুল ব্যাপারী নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘আমি কোনো দালালি করি না। এগুলো আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ।’

মাদারীপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘মানবপাচার রোধে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোনো আসামিকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। অনেক মামলার আসামি দীর্ঘদিন ধরে দেশছাড়া। সাগরের মা সন্তানের সন্ধান চেয়ে যে মামলাটি আদালতে করেছেন, সেটি সদর থানার পুলিশ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় একজন আসামিকে ধরাও হয়েছিল। বাকি আসামিদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও