চার বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ

৩৭ জেলা থেকে হাম রোগী ঢাকায় জটিলতা সামলাতে পারছে না স্থানীয় হাসপাতালগুলো

মানিকগঞ্জের সবচেয়ে বড় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ৫০০ শয্যার মানিকগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এছাড়া জেলায় রয়েছে ২৫০ শয্যার একটি জেলা হাসপাতালও।

তবে কোনো হাসপাতালেই নবজাতকের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (এনআইসিইউ) নেই। হামের উপসর্গ কিংবা ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর অক্সিজেনের মাত্রা কমে গেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের ঢাকায় পাঠানো হয়। শুধু ঢাকার আশপাশের জেলা নয়, উত্তরাঞ্চলের রংপুর ও গাইবান্ধা থেকে দক্ষিণের ভোলা-পটুয়াখালী পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে স্বজনরা রাজধানীর নির্দিষ্ট কয়েকটি হাসপাতালে ছুটে আসছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া জটিল হাম রোগীর প্রায় অর্ধেকই আসছে ঢাকার বাইরের জেলাগুলো থেকে। জেলা ও প্রান্তিক পর্যায়ে গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের জটিলতা সামাল দেয়ার সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় স্বজনরা তাদের রাজধানীতে নিয়ে আসছেন। ঢাকার চারটি বিশেষায়িত হাসপাতাল—ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ এবং ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কভিড-১৯ হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুদের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

‘ঢাকায় বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুদের টিকাদানের হার ও স্বাস্থ্যগত জটিলতার বিশ্লেষণ’ শীর্ষক গবেষণাটি নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাওলাদারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। এতে প্রধান গবেষক ছিলেন ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের সহকারী অধ্যাপক ডা. অর্পিতা গৌতম। দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ও গবেষকদের পাশাপাশি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. মো. আব্দুল্লাহ সাঈদ খানও এতে যুক্ত ছিলেন।

গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ঢাকার এসব হাসপাতালে ভর্তি হাম আক্রান্ত শিশুরা দেশের ৩৭ জেলা থেকে এসেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগের ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুর রয়েছে। বরিশাল বিভাগের বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী; রাজশাহী বিভাগের বগুড়া, জয়পুরহাট, নওগাঁ, নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম বিভাগের কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালী থেকেও রোগী এসেছে। এছাড়া খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর ও বাগেরহাট; ময়মনসিংহ বিভাগের ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা; রংপুর বিভাগের রংপুর ও গাইবান্ধা এবং সিলেট বিভাগের সুনামগঞ্জ থেকেও শিশু ভর্তি হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের পর সবচেয়ে বেশি হাম রোগী এসেছে কুমিল্লা, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, গাজীপুর, ভোলা, বগুড়া ও ময়মনসিংহ থেকে। গবেষকদের ভাষ্য, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে রোগীদের রাজধানীর নির্দিষ্ট হাসপাতালগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ে জটিল রোগীর চিকিৎসা সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত দেয়। এ পরিস্থিতিতে ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর চাপও বাড়ছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত দেশে হাম ও এর উপসর্গে ৮৮৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৫৯৪ জন।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা থাকলেও অনেকে জেলা শহর থেকে ঢাকায় এসে চিকিৎসা নিচ্ছে। টাঙ্গাইলের সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১২ উপজেলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৪৪ জন। হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে আট শিশু।

টাঙ্গাইল ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. খন্দকার সাদিকুর রহমান বলেন, ‘এখন পর্যন্ত হাসপাতালে ৭২৯ জন রোগী ভর্তি হয়, এর মধ্যে ৭১৯ শিশু চিকিৎসা শেষে বাড়ি ফিরেছে। এ হাসপাতালে তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আমরা যথাসাধ্য চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করেছি এবং খুব কম রোগী ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। আমাদের এখানে শিশুদের জন্য নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আইসিইউসহ শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন এবং হামের শিশুদের আলাদাভাবে ওয়ার্ড রয়েছে।’

হামের সঙ্গে অন্য উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় রেফার করতে হয় বলে জানান মানিকগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. আইভি ফেরদৌস। তিনি বলেন, ‘জেলা কিংবা উপজেলা হাসপাতালগুলোতে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কম। বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে আট থেকে ১০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসে। তাদের মধ্যে দু-একজনকে ভর্তি রাখার পরামর্শ দেয়া হয়। জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড রাখা আছে। সেখানে স্বাভাবিক হামের চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। সংক্রামক রোগের জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থা নেই। তবে জেলা হাসপাতালে আইসোলেশন ব্যবস্থা রয়েছে।’

গবেষণায় অংশ নেয়া সব শিশুরই প্রাথমিক উপসর্গ ছিল জ্বর ও ফুসকুড়ি। তাদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশের কাশি, ২৮ শতাংশের নাক দিয়ে পানি পড়া এবং ১৯ শতাংশের চোখ লাল হওয়া বা চোখ দিয়ে পানি পড়ার সমস্যা ছিল। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিশুর মধ্যে হামজনিত জটিলতা দেখা যায়। জটিলতায় আক্রান্তদের দুই-তৃতীয়াংশের শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়া, প্রায় এক-চতুর্থাংশের ডায়রিয়া বা অন্য পেটের সমস্যা এবং অল্পসংখ্যকের কানের সংক্রমণ হয়েছিল। যেসব শিশু কখনো হাম টিকা পায়নি, অন্তত এক ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের তুলনায় তাদের জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ছয় গুণ বেশি ছিল। শুধু বুকের দুধ না পাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রেও জটিলতার আশঙ্কা দ্বিগুণের বেশি। হাসপাতালে আসার সময় যাদের ঠিক তিনটি উপসর্গ ছিল, তাদের মধ্যেও জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

এনএসইউ গ্লোবাল হেলথ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন হাওলাদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘টিকাদানের সময় পুনর্বিবেচনা করা, ছয় মাসের কম বয়সী শিশুদের জন্য শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর প্রচার করা এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের জটিলতার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে হাসপাতালের সেবা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পরও অনেক শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা উদ্বেগজনক জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন, যদিও এসব সমস্যার প্রকোপ সম্পর্কে এখনো কোনো সরকারি তথ্য নেই। ভাইরাসটি সপ্তাহ বা মাস ধরে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়, যার ফলে বিশেষ করে অল্পবয়সী শিশুরা নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো পুনরাবৃত্ত সংক্রমণের শিকার হয়। এদের হাম-পরবর্তী জটিলতার চিকিৎসায় আরো বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।’

গবেষণায় অংশ নেয়া রোগীদের মধ্যে ময়মনসিংহের অন্তত আটজন থাকলেও কোনো হাম রোগীকে ঢাকায় পাঠানো হয় না বলে দাবি করেছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. মো. মাইনুল ইসলাম। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ জেলায় কোনো জেলা হাসপাতাল নেই। তবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য আইসোলেশন ওয়ার্ড রয়েছে। এখানে সক্ষমতার কোনো ঘাটতি নেই। আমরা সাধারণত হাম আক্রান্ত শিশুদের ঢাকায় পাঠাই না। শিশু বিভাগে একাধিক ও পর্যাপ্তসংখ্যক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। বিশেষ কোনো রোগী ঢাকায় পাঠাতে হলে সেখানকার হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করেই পাঠানো হয়।’

জটিল অবস্থায় হাম আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই ঢাকায় রেফার করেন বলে জানান গাজীপুরের সিভিল সার্জন ডা. মামুনুর রহমান। তিনি বলেন, ‘শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাম রোগীদের জন্য আলাদা ওয়ার্ড রয়েছে। সেখানে অক্সিজেন, হাই-ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলা ও সেন্ট্রাল অক্সিজেনের ব্যবস্থা আছে। শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরাও রয়েছেন।’

গবেষণা দলের প্রধান ও ইস্টার্ন মেডিকেল কলেজের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. অর্পিতা গৌতম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৭ জেলা থেকে রোগী এসেছে। এটি স্থানীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সীমিত সক্ষমতা এবং জটিল রোগীর চিকিৎসায় পর্যাপ্ত সুবিধার অভাবের বিষয়টি তুলে ধরে। নিম্ন আয়ের এলাকায় লক্ষ্যভিত্তিক ক্যাচ-আপ টিকাদান অভিযানের মাধ্যমে নিয়মিত হামের টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি বড় শিশুদের জন্য দুই ডোজের টিকাসূচি জোরদার এবং জীবনের প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোকে উৎসাহিত করতে হবে। টিকাদান ও পুষ্টির ঘাটতি কমানো গেলে অতিরিক্ত চাপে থাকা রেফারেল হাসপাতালগুলোতে গুরুতর অসুস্থ শিশুদের প্রবাহও কমানো সম্ভব।’

আরও