টানা শৈত্যপ্রবাহে বিপর্যস্ত যশোরের জনজীবন। কনকনে শীতে জবুথবু সাধারণ মানুষসহ প্রাণিকুল। প্রতিদিনই কমছে তাপমাত্রা। ব্যারোমিটারের পারদ গতকাল ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। গত সপ্তাহে তীব্র শীতের মধ্যে বৃষ্টি হওয়ায় বিপাকে পড়েন ফুলের রাজ্য হিসেবে খ্যাত ঝিকরগাছার গদখালীর ফুলচাষীরা। শীত ও ঘন কুয়াশায় বিভিন্ন বাগানের ফুল ঝরে যাচ্ছে। অনেক ফুলগাছ মরে গেছে। এতে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন কৃষক।
ভুক্তভোগীরা বলছেন, গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, পাতা কালো বর্ণ ধারণ করে শুকিয়ে যাচ্ছে, পাপড়ি কালো হয়ে ঝরে যাচ্ছে। গোলাপ আর বিক্রির উপযোগী থাকছে না। সব বাগানেরই একই অবস্থা। ফলে চাষীদের এবার লোকসান গুনতে হবে।
স্থানীয় ফুলচাষী রফিকুল ইসলাম জানান, টানা ঘন কুয়াশা ও প্রচণ্ড ঠাণ্ডার পাশাপাশি কয়েকদিন আগের বৃষ্টিতে তার বাগানের গোলাপ নষ্ট হয়ে গেছে। গাছের কচি পাতা নষ্ট হয়ে ঝরে পড়ছে, গোলাপের কুঁড়িতে কালো দাগ ও পাপড়ি ঝরে যাচ্ছে। তার ভাষায়, ‘আগে এক বিঘা জমি থেকে প্রতিদিন এক হাজারের মতো গোলাপ তুলেছি। এখন শ’খানেকের মতো পাচ্ছি। পাতা নষ্ট হচ্ছে গ্ল্যাডিওলাসেরও। ঠিকমতো ফুটছে না রজনীগন্ধা। বাজারে গোলাপসহ বিভিন্ন ফুলের আমদানি খুবই কম। তাই দাম বেশি। কিন্তু বেশির ভাগ বাগানের ফুল ঝরে যাচ্ছে। ফলে কৃষককে লোকসানে পড়তে হবে।’
গদখালীর ফুল বাজারে কথা হয় কয়েকজন চাষীর সঙ্গে। তারা জানান, এবার গোলাপ ফুলে বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে। কারণ ফেব্রুয়ারির বড় তিন উৎসব ঘিরে বাগানের পরিচর্যা করেছেন তারা। কিন্তু এখন যেভাবে ফুল ঝরছে তাতে চলতি মৌসুমে অন্তত ৫ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়তে হবে এখানকার চাষীদের।
সরজমিন সোমবার গদখালী বাজারে গিয়ে দেখা যায়, গোলাপের সংখ্যা কম। চাষীদের প্রায় সবার মুখেই ফুল ঝরে পড়ার হতাশা। এ থেকে প্রতিকারের কোনো উপায় আছে কিনা, তা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে আলাপ করছেন তারা। এদিন গোলাপ ৯-১২ টাকা, গ্ল্যাডিওলাস ৫-১২, চন্দ্রমল্লিকা (হলুদ) দুই-আড়াই, চন্দ্রমল্লিকা (সাদা) দেড়-দুই, রজনীগন্ধা ৬-৮, জারবেরা ১০-১২ টাকা পিস হিসিবে বিক্রি হয়েছে। প্রতি হাজার গাঁদা বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা দরে।
৫০০ পিস গোলাপ নিয়ে বাজারে এসেছেন পাটুয়াপাড়ার সোহেল রানা। তিনি বলেন, ‘তিন বিঘা জমি থেকে ৫০০ গোলাপ তুলেছি। বিক্রি করছি ১১ টাকা দরে। দাম বেশি পেলেও জমি হিসেবে সংখ্যা অনেক কম। গত বছর একই বাগান থেকে ৫ লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি করেছিলাম। এবার তার অর্ধেকও বিক্রি হয়নি। শীত আর ঘন কুয়াশায় ৭০ ভাগ ফুল ঝরে গেছে। কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারির তিন উৎসবে লাখ টাকার ফুল বিক্রি করতে পারব কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’ আরেক চাষী মফিজুর রহমান বলেন, ‘গত বছর ২ লাখ টাকার গোলাপ বিক্রি করেছিলাম। এবার ৫০ হাজার টাকারও বিক্রি হবে না।’
গদখালীর হাড়িয়ার রহমত আলী বলেন, ‘পাতা শুকিয়ে পড়ে যাচ্ছে, পচন লেগেছে পাপড়িতে। যেখানে হাজার পিস গোলাপ পাওয়ার কথা, সেখানে ৩০০-এর বেশি তুলতে পারছি না।’ কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ নিয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা তো মাঠেই যান না, কীভাবে পরামর্শ নেব?’
যশোরের প্রায় দেড় হাজার হেক্টর কৃষিজমিতে ছয় হাজারের মতো কৃষক ফুল চাষের সঙ্গে জড়িত। দেশের মোট ফুলের চাহিদার ৭৪ শতাংশ এ জেলা থেকে সরবরাহ করা হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে গদখালীর ফুলের চাহিদা ও বিক্রি বাড়তে থাকে।
যশোর ফুল উৎপাদন ও বিপণন সমবায় সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম বলেন, ‘এবার ১০০ কোটি টাকার ওপরে ফুল বিক্রির আশা ছিল। কিন্তু বৈরী আবহাওয়া বিশেষ করে বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা আর অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় গোলাপ, গ্ল্যাডিওলাস ও গাঁদা ফুল নষ্ট হয়ে গেছে। ফেব্রুয়ারি মাস সামনে রেখে মূলত চাষীরা বাগান পরিচর্যা করে থাকেন। কিন্তু এবার পাতা ঝরে পড়ায় গাছের খাদ্য তৈরিও বন্ধ হয়ে গেছে। এসব কারণে গোলাপের বাজার থেকে আমরা ৫ কোটি টাকার লোকসানের মুখে পড়েছি।’
ঝিকরগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ হাসান পলাশ বলেন, ‘চায়না গোলাপ বিশেষ করে যেসব গাছের বয়স এক বছরের কম, সেগুলোয় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। মূলত বেশি সার প্রয়োগ, পাঁচবারের বেশি সেচ দেয়া, বৃষ্টি ও ঘন কুয়াশার কারণে পাতা স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে। চাষীদের আসতে বলেছি। কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক বিক্রেতাদেরও ডাকা হয়েছে। সবাইকে নিয়ে বসে চাষীদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। আপাতত গোলাপ গাছের গোড়া শুকনো ও ছত্রাকমুক্ত করতে ডলোমাইট ও জিপসাম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি।’