দারিদ্র্য বিমোচন ও এসডিজি অর্জনে সরকার গত এক যুগে বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। ফলে ১২ বছর আগের তুলনায় দারিদ্র্যের হার প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সময়ে চরম দারিদ্র্য প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। জাতীয় পর্যায়ে ২০১৬ সালে দারিদ্র্যের হার ছিল ২৪ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশে। অর্থাৎ এ সময়ে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। কিন্তু সারা দেশে দারিদ্র্য কমলেও উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে ঢাকায়। এখানে দারিদ্র্য না কমে উল্টো প্রায় ২ শতাংশ বেড়েছে। অথচ প্রতি বছর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) সর্বোচ্চ অর্থ ব্যয় হচ্ছে ঢাকা বিভাগে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ঢাকা একাই পেয়েছিল এডিপির মোট বরাদ্দের ৩৮ শতাংশ অর্থ। দেশের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে জিডিপির বড় জোগানদাতা ঢাকা বিভাগ। বৈদেশিক রেমিট্যান্সেও বড় অবদান এ বিভাগের। এর পরও এখানে দারিদ্র্য বৃদ্ধির কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঘিরে এক ধরনের গোষ্ঠীতান্ত্রিক পৃষ্ঠপোষক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক মধ্যস্বত্বভোগীরা উন্নয়ন বরাদ্দ ও সামাজিক নিরাপত্তার ভাগ নিয়ে গেলেও যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছেন না। আর আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও তৈরি হয়নি সেভাবে। কারো কারো মতে, বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিব মানুষ কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসায় এখানে দারিদ্র্য বেড়েছে। কেউ কেউ করোনার প্রভাবকেও একটি বড় কারণ বলে মনে করছেন। মূল্যস্ফীতির অভিঘাতেরও ভূমিকা থাকতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, এখানকার দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত ভঙ্গুর। তাই সামান্য ধাক্কাতেই মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। অর্থাৎ গরিব মানুষ দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। জরিপে প্রাপ্ত তথ্যের যথার্থতা নিয়েও প্রশ্ন আছে কারো কারো। যদিও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় উচ্চমানসম্পন্ন ডাটা দেয়া হয়েছে জরিপে।
বিবিএসের খানা আয়-ব্যয় জরিপ-২০২২-এর তথ্যমতে, গত ছয় বছরে জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বেড়েছে ঢাকায়। ২০১৬ সালে এ বিভাগে দারিদ্র্যের হার ছিল ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালে এটি প্রায় ২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশে। এ সময়ে ঢাকা বিভাগের গ্রামাঞ্চলে দারিদ্র্য বৃদ্ধির হার ছিল প্রায় আড়াই শতাংশ। ২০১৬ সালের ১৯ দশমিক ২ থেকে বেড়ে ২০২২ সালে এটি ২১ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। শহরাঞ্চলে এ হার ১২ দশমিক ৫ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে। দারিদ্র্যের হার সবচেয়ে বেশি কমেছে রংপুর বিভাগে। সেখানে ২০১৬ সালের ৪৭ দশমিক ২ শতাংশ দারিদ্র্য ২০২২ সালে এসে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এডিপির অঞ্চলভিত্তিক বরাদ্দ নিয়ে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি) কর্তৃক ‘বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের আঞ্চলিক বিন্যাস’ শীর্ষক একটি গবেষণা করা হয়। এতে দেখা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে শুধু ঢাকা বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট এডিপির ৩৭ শতাংশ অর্থ। একই অর্থবছরে বিভাগটিতে এডিপিতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল মোট এডিপির ৩৮ শতাংশ অর্থ। যেখানে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল মোট এডিপির মাত্র সাড়ে ৩ শতাংশ অর্থ। এ হিসাবে কম বরাদ্দ পাওয়া অন্য দুই বিভাগ থেকে ঢাকা প্রায় ১৩ গুণ বেশি বরাদ্দ পেয়েছিল। বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটের সাধারণ সরকারি সেবা, প্রতিরক্ষা এবং জনশৃঙ্খলা ও সুরক্ষা ছাড়া বাকি ১২টি খাতের চলমান প্রকল্পের বাজেটগুলোর জেলা ও আঞ্চলিক অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে গবেষণাটি করা হয়েছিল। আইপিডির পক্ষ থেকে গবেষণাটি পরিচালনা করেন পরিকল্পনাবিদ রেদওয়ানুর রহমান ও সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান।
গত মে মাসে বিআইডিএসের এক গবেষণায় করোনাকালে ঢাকায় দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছিল। আর মোট দরিদ্র মানুষের ৫১ শতাংশকে ‘নতুন দরিদ্র’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। যাদের অনেকে নিম্নবিত্ত থেকে নিচে নেমে গেছে বলে মন্তব্য করেছিলেন সংস্থাটির মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন। ঢাকা বিভাগে দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘যদি জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য কমে তাহলে বিভাগীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য বৃদ্ধির তথ্যে কোনো গরমিল থাকতে পারে।’ এখানে সংখ্যাগত কোনো ভুল আছে কিনা সেটি নিশ্চিত হতে বিবিএসের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
জরিপের তথ্যকে অবশ্য উচ্চমানসম্পন্ন বলছেন প্রকল্প পরিচালক ও বিবিএসের উপপরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এ জরিপে টেকনিক্যাল সাপোর্ট দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা তথ্যের মান নিয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে এবং জরিপের ডাটাকে হাই কোয়ালিটি বলেছে। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার খানা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণ করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। স্থানীয় চিত্রই নিয়ে আসা হয়েছে জরিপে। কেন দারিদ্র্য বেড়েছে, তার ব্যাখ্যা দেয়া গবেষকদের কাজ। তবে সব বিভাগে যে একই হারে দারিদ্র্য কমবে সে ধারণাও ঠিক নয়।’
বেশি বরাদ্দ পেয়েও দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে ঘিরে মধ্যস্বত্বভোগীদের সুবিধা নেয়ার বিষয়টিকে সামনে এনেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঘিরে ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত একটি পৃষ্ঠপোষক গোষ্ঠী সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ফলে উন্নয়ন বরাদ্দ ও সামাজিক নিরপত্তা যাদের পাওয়ার কথা তারা পাচ্ছেন না। আর বিগত সময়ে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বাড়েনি। তাই অনানুষ্ঠানিক খাতের কম মজুরি দিয়ে মানুষ দারিদ্র্যসীমার ওপরে উঠতে পারছে না। আবার কাজের সন্ধানে অন্য শহর থেকে গরিব মানুষ এখানে ভিড় করছে। কিন্তু গ্রামের মতো এখানে সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ নেই। ফলে এখানে সামাজিক নিরাপত্তার বড় রকমের দুর্বলতায় শহুরে দারিদ্র্য বেড়েছে।’
দেশের দারিদ্র্য ব্যবস্থাপনাকে অত্যন্ত ভঙ্গুর হিসেবে উল্লেখ করে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এখানকার জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। ফলে সামান্য কোনো ধাক্কা এলেই তাদের পতন ঘটে। এর পেছনে কভিডও একটি বড় বিষয়। আর বিভিন্ন শহর থেকে রাজধানীতে অভ্যন্তরীণ অভিবাসনের কারণেও ঢাকায় দারিদ্র্য বাড়তে পারে।’
বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন নীতিনির্ধারণ ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। বিভাগটির দারিদ্র্য বিশ্লেষণ ও পরিবীক্ষণ অনুবিভাগের যুগ্ম প্রধান ড. মুনিরা বেগম বলেন, ‘দারিদ্র্য বৃদ্ধির পেছনে বেশকিছু বিষয় থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনও একটি কারণ হতে পারে। আর তথ্য সংগ্রহ হয়েছিল কভিডের ধাক্কার ঠিক পরবর্তী সময়ে। তাই সেটারও একটি প্রভাব থাকতে পারে। এর পেছনে বেশকিছু সূচকের ভূমিকা থাকায় এসব বিষয় নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ না করে এখনই সঠিক কারণ বলা যাবে না।’
দারিদ্র্য নিয়ে কাজ করা গবেষণা সংস্থা পিপিআরসির নির্বাহী পরিচালক ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ‘নগরায়ণের প্রক্রিয়ায় নগর দারিদ্র্য আরো গভীর হচ্ছে। ঢাকার বাইরে থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠী কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসছে। বিষয়টি নিয়ে আরো বিশদ গবেষণা প্রয়োজন।’
এক বছর আগে বরিশালের বরগুনা থেকে ঢাকায় এসেছেন নজরুল ইসলাম। ঢাকায় এখন তিনি রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। এফডিসি মোড়ে তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি এলাকায় কৃষিকাজ করতেন, মাছ ধরতেন। সেখানে বিল এলাকায় বছরের ছয় মাসই পানি থাকে। তখন আর কৃষিকাজ করা যায় না। কিন্তু এখন আগের মতো মাছও পাওয়া যায় না। যেতে হয় সমুদ্রের দিকে। সেখানেও আছে ঝড়-বৃষ্টির ভয়। তাই তিনি ঢাকায় এসেছেন।
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থেকে আসা ইউনুসের গল্পটাও একই রকম। অন্যের কৃষিজমিতে কাজ করেন তিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যায় কাজ না থাকায় কোরবানির ঈদের পর ঢাকায় এসেছেন। এখন কারওয়ান বাজারে কুলির কাজ করছেন। থাকেন একটি মেসে। শুধু নিম্নবিত্ত মানুষ নয়, অনেকেই আসছে চাকরির সন্ধানে। ডিপ্লোমা শেষ করে গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ শিখতে সাত মাস আগে ঢাকায় এসেছেন রাকিবুর রহমান। ময়মনসিংহ সদরের এ তরুণ কোর্স শেষ করে এখন কাজ খুঁজছেন। তবে প্রত্যাশিত কাজ না পেলে তাকে মগবাজারের মেস ছেড়ে আবার নিজ এলাকায় ফিরে যেতে হবে। চাকরির প্রস্তুতির জন্য রাজধানীতে আসা এমন মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়।
বিবিএসের সাম্প্রতিক ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস-২০২১ শীর্ষক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের তথ্য। সংস্থাটি বলছে, প্রতি হাজার জনগোষ্ঠীর বিপরীতে সামগ্রিক অভ্যন্তরীণ স্থানান্তরের হার ৬০ দশমিক ২ জন। আর প্রতি হাজারে বহির্গমনকারী জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৫৫ দশমিক ৯। অর্থাৎ নিট স্থানান্তরের হার ৪ দশমিক ৩। স্থান বিবেচনায় শহরাঞ্চলে প্রতি হাজারে প্রবেশ করছে ১২৫ আর বেরিয়ে যাচ্ছে ১২২ জন। অর্থাৎ নিট হানান্তর হচ্ছে তিনজন, যা গ্রামের হারের তুলনায় প্রায় তিন গুণ। বিভাগ হিসেবে সবচেয়ে বেশি স্থানান্তর হয় ঢাকা বিভাগে। এখানে প্রতি হাজারে ১০৭ জনের আগমন ও ১০২ জনের বহির্গমন ঘটে।
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিজ্ঞানীদের আন্তর্জাতিক জোট আইপিসিসির গবেষক আতিক রহমানের সঙ্গে। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় দারিদ্র্য বাড়লে তার প্রভাব পড়ে ঢাকায়। প্রতিদিন এখানে নতুন রিকশাচালক ও কুলিদের আগমন ঘটছে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাদের অবস্থা নাজুক। অল্প পানি বাড়লেই তাদের বিপদ বেড়ে যায়। ফলে তারা জীবিকার খোঁজে রাজধানীতে ভিড় করেন।’
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, ‘বিভিন্ন অঞ্চল থেকে চাকরির জন্য ঢাকায় দরিদ্র মানুষের আগমনের ফলে এখানে দারিদ্র্য বাড়ছে। সিলেটে, রংপুরসহ অন্যান্য এলাকা থেকে এখানে মানুষ আসে।’
পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, ‘এখানে প্রি-কভিড ও পোস্ট-কভিড ফ্যাক্টর কাজ করেছে। কভিডে শ্রমজীবী মানুষের একটা অংশ ঢাকায় থেকে গেছে। কিন্তু তখন তাদের কাজের সুযোগ কমে গিয়েছিল, বিশেষত যারা কায়িক শ্রম দেন। আবার কভিডের পর একঝাঁক গরিব মানুষ নতুন করে কাজের সন্ধানে ঢাকায় এসেছে। কিন্তু এ সময়টায় মূল্যস্ফীতি ৬ থেকে ৯ শতাংশে উঠে গেছে। এটা গরিব মানুষকে আরো বেশি মাত্রায় আক্রমণ করেছে। এটিও রাজধানীতে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হতে পারে।’