অন্যদিকে অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে দুর্বলতা, বিনিয়োগে স্থবিরতা, রাজস্ব আহরণে চাপ ও কর্মসংস্থানের সংকটের মধ্যেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব দিয়েছে সংস্থাটি। বাস্তবতা ও সরকারি পরিসংখ্যানের এ পার্থক্য বিবিএসের তথ্যের মান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। এর আগের মাস জুনে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৬০ শতাংশ। মে মাসে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল যথাক্রমে ৯ দশমিক ৪২ ও ৯ দশমিক শূন্য ৬। অর্থাৎ, মে থেকে জুলাইয়ে ধারাবাহিকভাবে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। এছাড়া ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এ দুটি হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ৫৫ ও ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ। সে হিসেবে গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় চলতি বছরের জুলাইয়ে সার্বিক ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি ও সবজির বাজারের দামের ঊর্ধ্বমুখিতায় দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে (২০২৬ সালের এপ্রিল-জুন) আগের প্রান্তিকের তুলনায় দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২১ শতাংশে। মূলত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সবজির মূল্যবৃদ্ধি এ সময়ে মূল্যস্ফীতিকে বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচ্য প্রান্তিকে জ্বালানি মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ৯ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশে পৌঁছায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে গ্যাস ও জ্বালানি তেলের দামে। জ্বালানি তেল ও লুব্রিক্যান্টের মূল্যস্ফীতি ১ দশমিক ৭ থেকে বেড়ে ১৩ দশমিক ৮ এবং গ্যাসের মূল্যস্ফীতি ১১ দশমিক ৩ থেকে বেড়ে ২৪ শতাংশে উন্নীত হয়। এছাড়া জুনে দেশে বিদ্যুতের দাম পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, মূল্য সমন্বয়ই জ্বালানি মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির প্রধান কারণ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে মূল্যস্ফীতির বিস্তার বা ডিফিউশন ইনডেক্সের বিশ্লেষণে দেখা যায়, জুনে ভোক্তা মূল্যসূচকের ৩৮২টি পণ্যের মধ্যে ২৬১টির দাম আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। মাত্র ২২টি পণ্যের দাম কমেছে এবং ৯৯টি পণ্যের দাম অপরিবর্তিত ছিল। অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধি আর কয়েকটি পণ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রকাশিত মাসিক জাতীয় গড় খুচরা বাজারদরের ৬২টি পণ্যের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি বছরের সাত মাসের মধ্যে জুলাইয়ে ২৬টি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। জুনের তুলনায় ১৩টি পণ্যের দাম বেড়েছে। আবার মে ও জুনের তুলনায় জুলাইয়ে আটটি পণ্যের দাম বেশি ছিল। বিপরীতে জুনের তুলনায় ছয়টি পণ্যের দাম কমেছে এবং নয়টি পণ্যের দামে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
জুলাইয়ে সয়াবিন ও পাম অয়েল, খোলা ময়দা, দেশী পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, গুঁড়া দুধ, বিভিন্ন ধরনের মাছ—রুই, কাতল, মৃগেল, পাঙাশ, ইলিশ, শিং, সিলভার কার্প ও তেলাপিয়ার দাম চলতি বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ছিল। সবজির মধ্যে দেশী ও হল্যান্ড আলু, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, শসা ও টমেটোর দামও জুলাইয়ে সর্বোচ্চ ছিল। আমদানি করা চিনির দামও বছরের মধ্যে সর্বোচ্চে উঠেছে।
জুলাইয়ে সবচেয়ে বেশি মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে কাঁচামরিচে। জুনে জাতীয় গড় খুচরা দাম কেজিপ্রতি ৭১ টাকা থাকলেও জুলাইয়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৪২ টাকায়। দেশী পেঁয়াজের দাম জুনের ৩৬ থেকে বেড়ে জুলাইয়ে ৫৬ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে দাম বেড়েছে ২০ টাকা বা ৫৫ দশমিক ৬ শতাংশ। একই সময়ে সয়াবিন তেলের দাম জানুয়ারির ১৮১ থেকে বেড়ে জুলাইয়ে ১৯৩ টাকা এবং পাম অয়েলের দাম ১৫৭ থেকে বেড়ে ১৬৮ টাকা হয়েছে। দুটি পণ্যের ক্ষেত্রেই জুলাইয়ের দাম ছিল চলতি বছরের সর্বোচ্চ।
গত বছরের জুলাইয়ের সঙ্গেও ভোজ্যতেলের বাজারে মূল্যচাপের পার্থক্য স্পষ্ট। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে সয়াবিন তেলের দাম ছিল ১৭১ টাকা, যা চলতি বছরের জুলাইয়ের তুলনায় ২২ টাকা বা প্রায় ১২ দশমিক ৯ শতাংশ কম। পাম অয়েলের দামও ১৫৪ থেকে বেড়ে ১৬৮ টাকা হয়েছে, অর্থাৎ বেড়েছে প্রায় ৯ দশমিক ১ শতাংশ।
বেশকিছু কৃষিপণ্যের দাম বাড়লেও চালের বাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ছিল। মাঝারি বোরো চালের দাম মে মাসে ৬০ টাকা, জুনে ৫৯ এবং জুলাইয়েও ৫৯ টাকা ছিল। সরু বোরো চালের দাম জুন ও জুলাইয়ে ৭৫ টাকায় স্থির ছিল। তবে মাঝারি আমন চালের দাম জুনের ৫৮ থেকে জুলাইয়ে ৫৯ টাকা হয়েছে। মসুর ডালের দাম মে ও জুনে যথাক্রমে ১০২ ও ১০১ টাকা থেকে জুলাইয়ে বেড়ে ১০৫ টাকা হয়েছে।
প্রাণিজ আমিষের বাজারে জুলাইয়ে কিছুটা মূল্যবৃদ্ধি দেখা গেছে। ব্রয়লার মুরগির দাম জুনের ১৬৭ থেকে বেড়ে জুলাইয়ে কেজিপ্রতি ১৭৫ টাকা হয়েছে। ফার্মের লাল ডিমের দাম জুনের ৪২ থেকে জুলাইয়ে বেড়ে হালি ৪৩ টাকা হয়েছে। মাছের বাজারে দেশী মাঝারি রুইয়ের দাম ৪১২ থেকে ৪১৬ টাকা, ছোট রুই ৩৩৬ থেকে ৩৪০ টাকা এবং বড় পাঙাশ ২৪৭ থেকে ২৫০ টাকা হয়েছে। ইলিশের দাম মে মাসের ১ হাজার ৩৮৫ থেকে ধারাবাহিকভাবে বেড়ে জুলাইয়ে ১ হাজার ৫৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সবজির বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ছিল আরো বিস্তৃত। দেশী আলুর দাম জুনের ৩৪ থেকে জুলাইয়ে ৩৮ টাকা, হল্যান্ড সাদা আলু ২৪ থেকে ২৬ এবং বেগুন ৫৮ থেকে ৭৬ টাকায় উঠেছে।
জানতে চাইলে বিবিএসের মহাপরিচালক মো. শামীমুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির তথ্য সারা দেশের ৬৪ জেলা থেকে সংগ্রহ করা হয়। শহর ও অন্যান্য এলাকার তথ্য নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে গড় করে মূল্যস্ফীতির হিসাব করা হয়। মূল্যস্ফীতি পরিমাপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে প্রচলিত পদ্ধতি এবং জাতিসংঘের নির্ধারিত ফর্মুলা অনুসরণ করা হচ্ছে।’
মো. শামীমুল হক আরো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে মূলত দুই ধরনের তুলনা করা হয়। একটি হলো এক বছর আগের একই মাসের সঙ্গে বর্তমান মাসের তুলনা বা ইয়ার অন ইয়ার। অন্যটি আগের মাসের সঙ্গে বর্তমান মাসের তুলনা বা মান্থ অন মান্থ। ফলে বছরওয়ারি মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও মাসওয়ারি হিসাবে ভিন্ন চিত্র দেখা যেতে পারে।’
জিডিপির তথ্যের মান নিয়ে প্রশ্ন করলে বিবিএসের মহাপরিচালক বলেন, ‘বিষয়টি বর্তমানে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিআইডিএসের অর্থনীতিবিদদের একটি দল জিডিপির হিসাব ও তথ্যের মান পর্যালোচনা করছে। হিসাব পদ্ধতিতে কোনো ঘাটতি বা গ্যাপ রয়েছে কিনা, থাকলে তা কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হচ্ছে—এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। পর্যালোচনা শেষে এ বিষয়ে আরো স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পরিসংখ্যানের গুণগত মান নিয়ে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রশ্ন রয়েছে। সংস্থাটির ২০২৬ সালের জানুয়ারির ‘ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্ট’ প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি, সরকারি আর্থিক পরিসংখ্যান, আমদানি-রফতানি এবং আর্থিক ও মুদ্রানীতিসংক্রান্ত তথ্যের ক্ষেত্রে দুর্বলতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানের বিষয়ে আইএমএফ বলেছে, ভোক্তা মূল্যসূচকের (সিপিআই) বাস্কেটে অন্তর্ভুক্ত পণ্য ও সেবার পরিধি অপর্যাপ্ত। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ যথাযথভাবে মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানকে ‘বি’ রেটিং দিলেও এর পরিধি বা ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে ‘সি’ রেটিং দিয়েছে সংস্থাটি।
বিবিএসের মূল্যস্ফীতির বাস্কেটে বর্তমানে ৭৪৯টি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে আলমারি, ল্যাপটপ, চেয়ার-টেবিলের মতো এমন কিছু পণ্যও রয়েছে, যা কোনো ভোক্তা জীবনে খুব কম সংখ্যকবার কেনেন। আগে এ বাস্কেটে ৪২০টি পণ্য ছিল। বিশ্লেষকদের মতে, বাস্কেটে পণ্যের সংখ্যা ও ওজনের পরিবর্তনের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়লেও সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে তার প্রভাব তুলনামূলক কম প্রতিফলিত হতে পারে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ মূল্যস্তর কমে যাওয়া নয়। গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মূল্যস্তর অনেক ওপরে উঠে গেছে। এখন সেই উচ্চ মূল্যস্তরের ওপরই নতুন করে দাম বাড়ছে। শাকসবজি, ডিম, মাছ, চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর প্রকৃত মূল্যস্ফীতির চাপ সরকারি গড় হিসাবের চেয়ে বেশি হতে পারে।’
জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিনিয়োগ, জ্বালানি সরবরাহে সংকটসহ বিভিন্ন কারণে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে এবং এর নেতিবাচক প্রভাব রাজস্ব আহরণেও পড়েছে।’
বিবিএসের সংস্কার, জরিপের মান উন্নয়ন ও তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় আরো উন্নতি প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান। তার কথায়, এ বিষয়টি শ্বেতপত্রেও তুলে ধরা হয়েছে। বিবিএসের নিয়মিত কার্যক্রম ও জরিপের গুণগত মান বাড়াতে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর বাস্তবায়ন জরুরি। এখনো বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি।
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা, রাজস্ব আহরণে ঘাটতি, বেসরকারি বিনিয়োগের মন্থর গতি এবং কর্মসংস্থানের সংকটের মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধির সাময়িক হিসাব দিয়েছে বিবিএস।
অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সূচকে দুর্বলতার মধ্যেও জিডিপির প্রবৃদ্ধি কীভাবে ৪ শতাংশের বেশি হলো এবং এ হিসাবের পদ্ধতি কতটা বাস্তব অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে প্রতিফলিত করছে। জিডিপির তথ্যের গুণগত মান নিয়ে আইএমএফও প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটির ডেটা অ্যাডিকুয়েসি অ্যাসেসমেন্টে জাতীয় আয় বা জিডিপি-সংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘সি’ রেটিং দেয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে জিডিপি হিসাবের পদ্ধতি ও তথ্যের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার বিষয়ও উঠে এসেছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশকের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা থাকে জিডিপির। বৈশ্বিকভাবে জিডিপির সঙ্গে ঋণ কিংবা রফতানি থেকে শুরু করে রাজস্ব আয়সহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক নির্দেশকের তুলনা করা হয়। গত দেড় দশকে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বিগত সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারেননি দেশী-বিদেশী অর্থনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকরা। বিবিএসের সংস্কারের বিষয়ে যেসব সুপারিশ এসেছে, সেগুলোর বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে সংস্থাটির দেয়া তথ্য-উপাত্তে এখনো এক ধরনের অনাস্থা রয়ে গেছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি, জিডিপিসহ বিভিন্ন সরকারি তথ্য নিয়ে অতীতে যথেষ্ট বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়েছে। এর ফলে সরকারি পরিসংখ্যানের প্রতি মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে তথ্য ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। এ ধারাবাহিকতা পুরোপুরি দূর হয়েছে এমনটি বলা যায় না। ফলে তথ্য সঠিক হলেও মানুষের মধ্যে আস্থাহীনতা থেকে যেতে পারে।’
ড. মুজেরী আরো বলেন, ‘বিবিএসের সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাই মূল্যস্ফীতি, জিডিপি, দারিদ্র্যসহ সব ধরনের সরকারি তথ্যের গুণগত মান বাড়ানোর পাশাপাশি রাজনৈতিক বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে যাতে এসব তথ্য প্রভাবিত বা ম্যানিপুলেট করা না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে সরকারি পরিসংখ্যানের প্রতি আস্থার সংকট অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান সরকারের অধীনে তথ্য বিভ্রান্তির সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে ‘নেভিগেটিং ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর অ্যাচিভিং এসডিজিস: পলিসি, পার্টনারশিপ অ্যান্ড প্রায়োরিটিজ’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে সমাপনী অনুষ্ঠান শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গতকাল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
বিগত সময়ে পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যে যে বিভ্রান্তি বা ‘মিসইনফরমেশন’ জনগণের কাছে দেয়া হয়েছে, বর্তমান সরকারের অধীনে তার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার যাতে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সে জন্য নির্ভুল তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।’
সর্বশেষ মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট তথ্য একাধিকবার পর্যালোচনা ও যাচাই করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তথ্য কয়েকবার যাচাই করেছি এবং বেশ কয়েকটি বৈঠক করেছি। নতুন মূল্যস্ফীতির তথ্য সঠিকভাবেই দেয়া হয়েছে।’