তবে এ শুল্ক সব সড়কে নয়, শুধু মেট্রোরেল, বিআরটি (বাস র্যাপিড ট্রানজিট) কিংবা উন্নত বাস পরিষেবা সুবিধাসম্পন্ন সড়কে কার্যকর হবে। যানজট শুল্ক আদায় করা হবে প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাক থেকে। বৃহত্তর ঢাকাকে ঘিরে ২০ বছরের জন্য (২০২৫-২০৪৫) প্রণয়নাধীন হালনাগাদকৃত সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (ইউআরএসটিপি) যানজট শুল্ক আরোপের এ সুপারিশ করা হয়েছে। তবে এতে বলা হয়েছে, যানজট শুল্ক কার্যকরের আগে অবশ্যই বিকল্প হিসেবে নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
বর্তমানে যানজট শুল্ক আরোপের উপযোগী একটি করিডোর রয়েছে ঢাকায়। সেটি হলো উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেল করিডোর। চালু থাকা এ মেট্রোর বাইরে ঢাকায় বর্তমানে আরো দুটি মেট্রোরেল প্রকল্প চলমান। একই সঙ্গে পরিকল্পনাধীন আছে আরো তিনটি মেট্রোলাইন। এ ছয় মেট্রো লাইনের সঙ্গে ঢাকায় নতুন আরো দুটি মেট্রোরেল এবং পাঁচটি মনোরেল লাইন নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে ইউআরএসটিপিতে। বাস্তবায়িত হলে এসব প্রকল্পসংলগ্ন সড়কে যানজট শুল্ক আরোপ করা হতে পারে। এর বাইরে ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত একটি বিআরটি করিডোর নির্মাণ করা হচ্ছে। বিআরটি বাস্তবায়ন হলে এ করিডোরও যানজট শুল্ক আরোপের উপযোগী হয়ে উঠবে। এছাড়া সরকার কোম্পানিভিত্তিক উন্নত বাস পরিষেবা প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে। ইউআরএসটিপির সুপারিশ অনুযায়ী, ঢাকার যেসব রুটে উন্নত বাস পরিষেবা থাকবে, সেসব রুটেও প্রাইভেট কার, মোটরসাইকেল ও ট্রাক থেকে যানজট শুল্ক আদায় করা হবে।
রাজধানী ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি সময়ের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ সালে ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, যা ২০২২ সালে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটারে। অর্থাৎ দেড় দশকের ব্যবধানে রাজধানীতে যানবাহনের গতি ঘণ্টায় প্রায় ১৬ কিলোমিটার কমে গেছে, যা নগরের চলাচল ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপের ইঙ্গিত দেয়।
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের আরেক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজধানীর ভয়াবহ যানজটের কারণে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা হারিয়ে যাচ্ছে যানজটে। পাশাপাশি ঢাকার ৭৩টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নিয়মিত যানবাহন আটকে থাকায় পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করছে। এতে দেশের অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়ছে এবং দৈনিক আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এমন পরিস্থিতিতে সরকার ঢাকার যানজট হ্রাসের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। এ উদ্দেশ্যে প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসব উদ্যোগের একটি ঢাকায় যানজট শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা। জানা যায়, যানজট শুল্ক আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হবে রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি আইডেন্টিফিকেশন (আরএফআইডি) প্রযুক্তি। এজন্য নির্ধারিত সড়কের বিভিন্ন স্থানে ‘আরএফআইডি রিডার’ স্থাপন করা হবে। নির্ধারিত যানবাহন থেকে আরএফআইডি রিডারের সহায়তায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুল্কের টাকা কেটে নেয়া হবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) পুরো ব্যবস্থাপনাটি তদারকি করবে।
অন্যদিকে যানজট শুল্ক কার্যকর করতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ ও ডিটিসিএর যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি আধুনিক ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে ডিএমপি ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও দুর্ঘটনা ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করবে, আর ডিটিসিএ পরিচালনা করবে যানজট শুল্ক এবং বাস চলাচল ব্যবস্থাপনা।
পরিকল্পনায় শুল্ক আরোপকে শুধু যানজট কমানোর উপায় হিসেবে নয়, পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নে নতুন অর্থায়নের উৎস হিসেবেও বিবেচনা করা হয়েছে। ইউআরএসটিপির খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৪৫ সাল পর্যন্ত প্রস্তাবিত পরিবহন উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিদ্যমান বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ প্রয়োজন হবে। সেই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ যানজট শুল্ক থেকে সংগ্রহ করা যেতে পারে।
ঢাকায় যানজট শুল্ক আরোপ পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। এ প্রসঙ্গে তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ আধুনিক ব্যবস্থা চালুর জন্য আমাদের পুরো ট্রাফিক ব্যবস্থাকে উপযোগী করে তুলতে হবে। প্রথমত, একটি নিখুঁত ডিজিটাল ডেটাবেজ থাকতে হবে, সব যানবাহন নিবন্ধিত হতে হবে এবং গাড়ির ভেতরে ট্র্যাকিং বা আইডেন্টিফিকেশনের জন্য “ট্রান্সপন্ডার” থাকতে হবে। বর্তমান সরকার যে ইউনিফায়েড আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার বা একক পরিচিতি নম্বর চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, সেটি যদি সত্যিকার অর্থে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়, তবে এ প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে যাবে। এটি মূলত ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করার একটি শক্তিশালী ও কার্যকর টুলস।’
সময় ও যানজটের ধরন অনুযায়ী শুল্কের হার ভিন্ন রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘ভোর ৪টায় রাস্তা যখন ফাঁকা, তখন কেউ সড়ক ব্যবহার করলে তাকে কেন মাশুল দিতে হবে? মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন উন্নত দেশে দেখা যায়, সড়কে যানজট যত বাড়ে, এ মাশুলের পরিমাণও তত বৃদ্ধি পায়। ফলে অনেকে যানজট ও বাড়তি মাশুল এড়াতে একদম ভোরবেলা বা অফ পিক আওয়ারে রওনা দেয়। এটি মূলত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টেরই একটি বড় কৌশল, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময়ের গাড়ির চাপকে ২৪ ঘণ্টার বিভিন্ন সময়ে বিন্যস্ত করে দেয়া হয়। একে বলা হয় “ভেরিয়েবল মাশুল”।’
এ পরিবহন বিশেষজ্ঞ আরো মনে করেন যানজট শুল্কের অর্থ গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সামগ্রিক সড়ক অবকাঠামোর মান উন্নয়নেই পুনরায় ব্যবহার করা উচিত হবে।
প্রণয়নাধীন ইউআরএসটিপিতে তিনটি স্বল্পমেয়াদি অগ্রাধিকার প্রকল্প সুপারিশ করা হয়েছে, যার একটি যানজট শুল্ক আরোপ। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।
ইউআরএসটিপি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অনেক সড়কে ব্যস্ত সময়ে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় ৫ কিলোমিটারেরও নিচে নেমে আসে। এ পরিস্থিতিতে যানজট কমানোর পাশাপাশি পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য নতুন অর্থায়নের উৎস হিসেবেও যানজট শুল্ককে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সরকারের সচিব ও ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার ঢাকার যানজট নিরসনের লক্ষ্যে মনোরেল, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে ডেডিকেটেড রুট ও কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার উদ্যোগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যানজট শুল্ক আরোপ—ঢাকার যানজট নিরসন পরিকল্পনারই একটি অংশ। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে।’