সদর উপজেলার হরিপুর ও মিরপুরের তালবাড়িয়া এলাকায় পদ্মা থেকে গড়াইয়ের উৎস মুখ শুরু হয়েছে। প্রায় দেড় যুগ আগে থেকে পলি জমে নদে পানিপ্রবাহ কমতে থাকে। নাব্য ফেরাতে হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সুফল মিলছে না। সাত বছর ধরে নদী খনন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প চললেও পানিপ্রবাহ বাড়ানো যাচ্ছে না। বছরের প্রায় অর্ধেক সময়ই প্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাচ্ছে; যা হুমকির মুখে ফেলেছে সুন্দরবনের মিঠা পানির ভারসাম্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং কোটি মানুষের জীবিকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে নদী খনন প্রকল্পের সুফল মিলছে না। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর স্বচ্ছতা ছাড়া কোনো খনন বা উন্নয়ন প্রকল্প সফল হয় না। তবে কেবল খনন নয়, নদী পুনরুদ্ধারের জন্য চাই একটি বহুমাত্রিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে নিয়মিত সিলকোট অপসারণ ও সংরক্ষণ, অবৈধ দখল ও দূষণ বন্ধ, পদ্মার সঙ্গে গড়াইয়ের সংযুক্তি নিশ্চিতকরণ, নদীর প্রশস্ততা ও গভীরতা টেকসই রাখা, স্থানীয় জনসম্পৃক্ততা ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ।
সম্মিলিত সামাজিক জোটের চেয়ারম্যান ড. আমানুর আমান বলেন, ‘গড়াই নদ শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের রন্ধ্রে গাঁথা জীবনরেখা। তাই একে রক্ষায় চাই সময়োপযোগী পরিকল্পনা, টেকসই তদারকি, দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। তা না হলে গড়াই ইতিহাসে সীমাবদ্ধ থাকবে, জীবন থেকে হারিয়ে যাবে।’
নদীপারের বাসিন্দারা জানান, গড়াই নদ কুষ্টিয়া ছাড়াও ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোরসহ বেশ কয়েকটি জেলা হয়ে দক্ষিণে সুন্দরবনের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১০টি জেলার কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও লবণাক্ততা রোধে গড়াইয়ের রয়েছে অপরিহার্য ভূমিকা।
এ নদীর সঙ্গে সরাসরি জড়িত স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা। তবে দখল, দূষণ ও ভরাটের ফলে অনেক স্থানে নাব্য হারিয়েছে। কোথাও কোথাও তা সরু খালে পরিণত হয়েছে।
গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পকে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে গ্রহণ করা হয়। নদীকে আগের রূপে ফিরিয়ে আনতে ১৯৯৭ সালে সর্বপ্রথম তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গড়াই নদের মুখে মাটি কেটে পরীক্ষামূলক খননকাজ উদ্বোধন করেন। কিছুদিনের মধ্যেই মাটি ও বালিতে নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই কাজে আর কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। দ্বিতীয় ধাপে ১৯৯৯ সালে ২৭৪ কোটি টাকা ব্যয়ে আরো একটি প্রকল্প অনুমোদন হয়। তখন হরিপুর অংশে ড্রেজিংয়ের মাটি ও বালি ফেলে সেখানে নানা প্রজাতির গাছ রোপণ করে পার্কও গড়ে তোলা হয়। তবে পরে সেই পার্কসহ আশপাশের জমি নদীতে চলে যায়। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পরের বছর থেকেই গড়াই নদ মরা খালে পরিণত হতে থাকে। এর বড় প্রভাব পড়তে শুরু করে দক্ষিণাঞ্চলের নদী এবং সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের ওপর। এরপর ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে চার বছর মেয়াদি ‘গড়াই নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্প-২’ হাতে নেয়া হয়। এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৪২ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় নদীর মুখ থেকে শুরু হয়ে কুমারখালী উপজেলার নন্দলালপুর ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৪০ মিটার প্রস্থের নদীবক্ষে ৯৩ লাখ ঘনমিটার মাটি খনন করা হয়। তৃতীয় ধাপে ২০১৮ সালে ৫৯০ কোটি টাকা ব্যয়ে চার বছর মেয়াদি একটি প্রকল্প নেয়া হয়। চলতি বছরের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদও শেষ হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ২০ কিলোমিটার এলাকা খনন করে ৪৪ দশমিক ৫৮ লাখ ঘনমিটার বালি অপসারণের কাজ চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৯২ লাখ ঘনমিটার সিলকোট উত্তোলন করা হয়েছে। এছাড়া নদীর বাম তীরে হরিপুর-কুষ্টিয়া সংযোগ সেতুসংলগ্ন ৩৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের তীর সংরক্ষণকাজ চলছে। এ কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার টাকা।
তবে প্রকল্পের শুরু থেকেই ড্রেজিং ও বালি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ড্রেজিং করা সিলকোট নিরাপদ স্থানে সংরক্ষণ না করে অনেক ক্ষেত্রে নদীতেই ফেলে রাখার কারণে তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। এর ফলে খনন প্রকল্পটির কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি বলে মনে করেন নদী বিশেষজ্ঞরা।
অবশ্য পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। এখন নদীতে টেকসই নাব্য বজায় রাখতে হলে প্রতি বছর সিলকোট অপসারণ করতে হবে। তবে তারা স্বীকার করছে, অর্থ বরাদ্দে বিলম্ব ও সিলকোট সংরক্ষণে জায়গার অভাবে কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, গড়াই নদ কেবল একটি পানিপ্রবাহ নয়, এটি কুষ্টিয়াসহ সমগ্র দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশ ও জীবনের নির্ভরযোগ্য ভরসা। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কালীগঙ্গা, কালীসহ বেশ কয়েকটি ছোট নদী। বর্তমানে পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে শহর ও গ্রামে হাজার হাজার নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। কুষ্টিয়া পৌরসভার হিসাবমতে, ৩৭ হাজার হোল্ডিংয়ের মধ্যে অধিকাংশ বাড়ির নলকূপে পানি উঠছে না।
গড়াই নদ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রধান উৎসগুলোর একটি। নদীর মাধ্যমে প্রবাহিত মিঠা পানি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করে লবণাক্ততার ভয়াবহতা থেকে। তবে নাব্য হারানোর কারণে সুন্দরবনসহ দক্ষিণাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি সংকট ও পরিবেশগত ভারসাম্য হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দল কুষ্টিয়া জেলার সভাপতি খলিলুর রহমান মজু বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গড়াইয়ের এ অবস্থার দায় শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নে নয়, বরং রাষ্ট্রের নদী নীতির ব্যর্থতার প্রতিফলন।’
সার্বিক বিষয়ে গড়াই খনন প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈকত বিশ্বাস বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সুন্দরবন রক্ষায় গড়াই নদী নিয়মিত খনন ছাড়া বিকল্প নেই। বর্ষায় জোয়ারের পলি জমে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এজন্য প্রতি বছরই ড্রেজিং অপরিহার্য।’