সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতা

৪০০ কোটি টাকা ব্যয়েও সুফল মিলছে না

দুই পাশে টিলা ভূমি। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সুরমা নদী। টিলা ভূমি থেকে নেমে অনেকগুলো খাল এসে মিলেছে নদীতে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বলে প্রশস্ত এ খালগুলোকে ছড়া বলা হয়।

দুই পাশে টিলা ভূমি। মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে সুরমা নদী। টিলা ভূমি থেকে নেমে অনেকগুলো খাল এসে মিলেছে নদীতে। প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট বলে প্রশস্ত এ খালগুলোকে ছড়া বলা হয়। এসব ছড়া দিয়ে বর্ষার পানি এসে মিশে যায় নদীতে। ফলে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টি হলেও শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতো না—একসময় এটাই ছিল সিলেট শহর। প্রাকৃতিকভাবেই এমন সুবিন্যস্তভাবে গড়ে ওঠে এ শহর। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন, ছড়া-খাল দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ আর জলাশয় ভরাটের কারণে গত দুই দশকে বদলে গেছে সিলেটের চিত্র। এখন ভারি বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হয়ে পড়ে নগর। সড়ক ছাপিয়ে বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও ঢুকে যায় পানি। ফলে দুর্ভোগ পোহাতে হয় নগরবাসীকে।

দখল ও ভরাট হয়ে যাওয়া ছড়া-খাল উদ্ধার করে সিলেট নগরকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে গত এক দশকে অন্তত ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)। কিন্তু এতেও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে নিস্তার মিলছে না। এবার বর্ষায় অন্যান্য বছরের চেয়ে বৃষ্টি হয়েছে তুলনামূলক কম। তবু অন্তত তিন-চারদিন বৃষ্টির পানিতে ডুবেছে নগর। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই রাতে ঘণ্টা দুয়েকের বৃষ্টিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে নগরের বেশির ভাগ এলাকা। অনেক সড়কে হাঁটুপানি জমে যায়। পানি ঢুকে পড়ে বাসাবাড়িতে।

এত টাকা খরচের পরও ছড়া উদ্ধার না হওয়া ও নগর জলাবদ্ধতামুক্ত না হওয়ায় এসব প্রকল্পের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সিসিক সূত্রে জানা যায়, সিলেট নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ছোটবড় প্রায় ২৫টি ছড়া। তবে দখল-দূষণে এখন অনেক স্থানে ছড়ার অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে। নগরের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া ১৩টি বড় ছড়ার দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৩ কিলোমিটার। দীর্ঘদিন ধরেই এসব ছড়ার দুই পাশ দখল করে রেখেছে স্থাপনা নির্মাণ করা অবৈধ দখলদাররা। এ ছড়াগুলো উদ্ধারে এ পর্যন্ত তিনটি প্রকল্পে প্রায় ৪০০ কাটি টাকা ব্যয় করেছে সিসিক।

সর্বশেষ ২০১৬ সালে ছড়া-খাল দখলমুক্ত করতে ২৩৬ কোটি ৪০ লাখ টাকার একটি প্রকল্প নেয়া হয়। তবে এসব বৃহৎ প্রকল্পের পরও ছড়া দখলমুক্ত করা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

সিসিকের পক্ষ থেকে ছড়া-খাল দখলদারদের একটি তালিকা করা হয় ২০১৬ সালে। এতে ২৬৮ জনকে দখলদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। দখলদারদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। এছাড়া কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ছড়া-খাল দখল করে তারা গড়ে তুলেছে বহুতল ভবন। অনেকে পরিবর্তন করে ফেলেছে ছড়ার গতি। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে পানি নিষ্কাশনের পথ। এতে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।

এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ছড়া-খাল উদ্ধারে একাধিক প্রকল্প নেয়া হলেও নগরবাসী তার খুব একটা সুফল পায়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রকল্পের ব্যাপারে সিসিকও তার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেনি। ফলে জলাবদ্ধতা নিরসন হচ্ছে না। প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের পাশপাশি দীর্ঘমেয়াদি সুফল পেতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন।

তবে এমন দাবির সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে সিসিকের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান বলেন, আমরা প্রায় ৩০ কিলোমিটার ছড়া উদ্ধার করেছি। এতে নগরীতে আগের মতো আর জলাবদ্ধতা হয় না। অধিক বৃষ্টিতে নগরীর কিছু এলাকায় পানি জমলেও অল্প সময়ের মধ্যে তা নেমে যায়।

তিনি আরো বলেন, অনেক ক্ষেত্রে আমরা দখলদারদের উচ্ছেদ করার পর ফের ছড়া দখল হয়ে যায়। এছাড়া ময়লা-আবর্জনা ফেলেও ছড়ার পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়। এজন্য সমন্বিত উদ্যোগ দরকার। এটা কোনোভাবেই সিসিকের একার পক্ষে সম্ভব নয়।

আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল ছড়া উদ্ধার করে জলাবদ্ধতা থেকে নিস্তার মিলবে না। কারণ নগরীর ভেতর দিয়ে প্রবহমান সুরমা নদী ভরাট হয়ে গেছে। বর্ষা মৌসুমে নদী পানিতে টুইটম্বুর হয়ে যায়। ফলে ছড়ার পানি টানতে পারে না নদী। এ কারণে নদী খননের প্রয়োজন।

সিলেট নগরীর উন্নয়নের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ ও পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, সুরমা নদী ভরাট হয়ে গেছে। এ কারণে নগরের পানি নিষ্কাশন হতে পারে না। নগরকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে সুরমা নদী খনন করতে হবে।

তবে সিসিক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর দাবি, সিলেটে আর আগের মতো জলাবদ্ধতা হয় না। ছড়াগুলো আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলেও অনেকাংশে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে এবং উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুরমা নদী ভরাট হওয়ায় পানি নামতে পারে না। এছাড়া কিছু এলাকা ওয়াটার লেভেল থেকেও নিচু। নিচু এলাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা এ বছর নিরসন হচ্ছে না। কারণ নিচু এলাকায় পাম্প স্থাপন করে জমে থাকা বৃষ্টির পানি খালে ফেলতে হবে। এবার আমরা পাম্প বসানোর কাজ করতে পারছি না। আশা করি শুষ্ক মৌসুমে এ কাজ করতে পারব।

আরও