জুলাই আন্দোলনে চোখ হারিয়েছেন ৪০১ জন: গবেষণা

গবেষণায় বলা হয়, আন্দোলনের সময় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ চোখে গুরুতর আঘাত পান। তাদের মধ্যে ৬৮০ জনের অস্ত্রোপচার লাগে। এর মধ্যে শতাধিক ভিট্রিও-রেটিনাল সার্জারি ও ৪০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়। কর্নিয়া দাতার অভাবে বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার স্থগিত রাখা হয়। ৮৫৬ জন আহত ব্যক্তি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজিতে (এনআইওএইচ) চিকিৎসা নেন।

২০২৪ সালের জুলাই মাসে হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ছোড়া রাবার বুলেট, শটগানের পেলেট বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস শেলের আঘাতে মোট ৪০১ জন চোখ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৮২ জন এক চোখ হারিয়েছেন আর ১৯ জন হারিয়েছেন দুই চোখই। অধিকাংশ ভুক্তভোগী ছিলেন তরুণ পুরুষ। গবেষকেরা একে জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখছেন।

এ তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক সায়েন্টিফিক জার্নাল টর্চারে প্রকাশিত ‘আই ইনজুরিস ইন বাংলাদেশ’স ২০২৪ স্টুডেন্ট-লেড মাস আপরাইজিং: অ্যা পাবলিক হেলথ ক্রাইসিস আনফোল্ড’ শীর্ষক গবেষণায়। এতে আন্দোলনে চোখে আঘাত পাওয়া ব্যক্তিদের চিকিৎসা, ক্ষয়ক্ষতি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বায়োমেডিকেল রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (বিআরএফ) গবেষক ফারহিন ইসলাম, ডা. এস এম ইয়াসির আরাফাত ও ডা. মোহাম্মদ সরোয়ার হোসেন।

গবেষণায় বলা হয়, আন্দোলনের সময় এক হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ চোখে গুরুতর আঘাত পান। তাদের মধ্যে ৬৮০ জনের অস্ত্রোপচার লাগে। এর মধ্যে শতাধিক ভিট্রিও-রেটিনাল সার্জারি ও ৪০টির বেশি কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়। কর্নিয়া দাতার অভাবে বেশ কয়েকটি অস্ত্রোপচার স্থগিত রাখা হয়। ৮৫৬ জন আহত ব্যক্তি ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অপথালমোলজিতে (এনআইওএইচ) চিকিৎসা নেন।

গবেষণায় বলা হয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চোখে পেলেট বুলেটের আঘাতে রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়, যা দৃষ্টিশক্তি হারানোর অন্যতম প্রধান কারণ। দৃষ্টিশক্তি হারানোর কারণ হিসেবে কর্নিয়ার ক্ষতি, অপটিক নার্ভ ও অ্যান্টেরিওর সেগমেন্ট ক্ষতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

চোখে আঘাতের কারণ হিসেবে গবেষণায় পেলেট বুলেটের পাশাপাশি রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস শেল এবং ইট-পাটকেল ও লাঠির কথাও বলা হয়। এসব অস্ত্র ব্যবহার আইন অনুযায়ী ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের নিয়ম থাকলেও মাঠে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারা কখন কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করবেন—সে বিষয়ে তাদের স্বাধীনতা ছিল। ফলে কাছাকাছি থেকে এসব অস্ত্র ব্যবহারে গুরুতর আঘাতের ঘটনা ঘটে।

গবেষণায় বলা হয়, আন্দোলনে আহত অনেকেই ছিলেন পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তারা দীর্ঘমেয়াদে দৃষ্টিশক্তি হারানোর পাশাপাশি জীবিকা হারিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। অনেকেই ডিপ্রেশনে ভুগছেন। আত্মহত্যার প্রবণতা ও আত্মসম্মানহানির কারণে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে তাদের জন্য।

গবেষণায় ওএইচসিআরের বরাতে বলা হয়, জনতা নিয়ন্ত্রণের নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেছে, এমনকি সরাসরি মাথার দিকে গুলি চালিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে যেটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এসব আঘাতকে ইচ্ছাকৃত লক্ষ্য করে হামলা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।

গবেষকরা বলেছেন, এ ঘটনা একটি জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। তারা অবিলম্বে একটি রাষ্ট্রীয় কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন, যারা আহতদের পুনর্বাসন ও দৃষ্টিশক্তি ফেরানোর বিষয়ে গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আচরণ নির্ধারণে কাজ করবে। একই সঙ্গে আন্দোলনে আহতদের অবদান ও ত্যাগকে স্বীকৃতি দিয়ে স্মরণ করার কথাও গবেষণায় বলা হয়।

আরও