মাধ্যমিক ও কলেজে শিক্ষার্থীর হার বেশি হলেও শিক্ষকতা ও নেতৃত্বে পিছিয়ে নারীরা

প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক—শিক্ষার প্রায় প্রতিটি স্তরেই এখন ছেলেদের তুলনায় দেশের মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি।

শুধু ভর্তি নয়, উপস্থিতি ও পরীক্ষার ফলেও ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে রয়েছে মেয়েরা। তবে শিক্ষার্থী হিসেবে এগিয়ে থাকলেও মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকতা ও নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে এখনো বেশ পিছিয়ে নারীরা।

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকদের অংশগ্রহণ সন্তোষজনক পর্যায়ে থাকলেও মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে এ চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কওমি মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থায় এ ব্যবধান আরো প্রকট। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নারী শিক্ষকের হার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। অর্থাৎ শ্রেণীকক্ষে ছাত্রীদের উপস্থিতি বেশি হলেও শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষ কিংবা প্রশাসনিক নেতৃত্বে পুরুষদেরই আধিপত্য।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, গত এক দশকে নারীশিক্ষায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। উপবৃত্তি, বিনামূল্যে বই বিতরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি ও পরিবারে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরির কারণে এসেছে এ পরিবর্তন। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকাতেও এখন মেয়েদের স্কুল ও কলেজে যাওয়ার হার বেড়েছে। তবে শিক্ষাজীবন শেষ করার পর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশে নারীরা এখনো নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। আবার অধ্যক্ষ বা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মতো শীর্ষ পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে নারীদের প্রতিনিধিত্ব একেবারেই কম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. তানিয়া হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নেতৃত্ব বা প্রধান শিক্ষকের মতো দায়িত্বপূর্ণ অবস্থানে পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত সহজেই ধরে নেয়া হয় যে—তারা যোগ্য ও দায়িত্ব পালনে সক্ষম। কিন্তু নারীদের ক্ষেত্রে যোগ্যতা অর্জনের পরও আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হয়, তারা মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত। সমাজের এ মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি নারীদের অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করছে।’

ব্যানবেইস প্রকাশিত সর্বশেষ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৪ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২ জন। এর মধ্যে ৪৯ লাখ ৬০ হাজার ৭৩ ছাত্রী, যা মোট শিক্ষার্থীর ৫৪ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এ স্তরে মোট শিক্ষক ২ লাখ ৯৩ হাজার ২৮৯ জন। এর মধ্যে নারী ৯২ হাজার ৪৯২ জন, যা মোট শিক্ষকের মাত্র ৩১ দশমিক ৫৪ শতাংশ।

আবার মাধ্যমিক স্তরে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী শিক্ষকের হার সবচেয়ে বেশি গার্হস্থ্য অর্থনীতিতে। এর পরই রয়েছে সংগীত ও বাংলা। এ তিন বিষয়ে নারী শিক্ষকের হার যথাক্রমে ৯৪ দশমিক ৫০, ৫৫ দশমিক ৯৫ ও ৫২ দশমিক ১১ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম নারী শিক্ষক ইসলাম শিক্ষা (১১ দশমিক ৪০) ও গণিতে (১২ দশমিক ৫১)।

উচ্চ মাধ্যমিকে মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪৯ লাখ ২৬ হাজার ২৬৬। এ স্তরে ২৫ লাখ ৩৭ হাজার ৯৯৮ ছাত্রী, যা কলেজ পর্যায়ের মোট শিক্ষার্থীর ৫১ দশমিক ৫২ শতাংশ। তবে এ স্তরে মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৭৮৯ শিক্ষকের মধ্যে নারী আছেন কেবল ৩৭ হাজার ২৫২ জন। অর্থাৎ মোট শিক্ষকের মাত্র ২৮ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ নারী।

এদিকে মাদরাসাগুলোর মধ্যে প্রায় ৮৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই কো-এডুকেশনের সুযোগ রয়েছে। আর মেয়েদের জন্য বিশেষায়িত মাদরাসার হার ১২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে মাদরাসা শিক্ষার্থীর ৫২ দশমিক ২৬ শতাংশ ছাত্রী। অথচ বিশেষায়িত এ শিক্ষায় নারী শিক্ষকের হার মাত্র ১৯ দশমিক ২২ শতাংশ।

দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদরাসায় প্রশাসনিক ও ক্ষমতার কাঠামো নিয়ে তাই নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা মনে করেন, নামের সঙ্গে ‘মহিলা’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পুরুষ পরিচালকদের হাতেই কেন্দ্রীভূত। নীতিনির্ধারণ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই থাকে তার একচ্ছত্র প্রভাব। ফলে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে একটি বদ্ধ ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে ভিন্নমত বা অভিযোগ প্রকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদরাসায় যৌন নিপীড়নেরও অভিযোগ উঠেছে। তাই নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন ও নারী নেতৃত্বের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ও নারী শিক্ষকদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর তদারকিরও দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বরিশালের দারুল আবরার মডেল কামিল মাদরাসার প্রিন্সিপাল মুফতি হাসান বিন হাবিব অবশ্য দাবি করেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রিন্সিপাল হওয়ার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের এ পেশায় পাওয়া যায় না। তাছাড়া প্রিন্সিপালের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অনেক প্রশাসনিক কাজ থাকে, যা নারীদের জন্য অনেকটাই কষ্টসাধ্য। তাই মাদরাসা শিক্ষায় নেতৃত্বের পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ কম।

মহিলা মাদরাসাগুলোয় বর্তমানে নারী শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণ ও প্রাধান্য আগের তুলনায় বেড়েছে বলে দাবি করেন বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাপরিচালক মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী। তবে প্রশাসনিক কাঠামো ও উচ্চতর শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় এখনো কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে বেফাক মহাপরিচালক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অনেক মহিলা মাদরাসা আলেম দম্পতির যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ পাঠদান ও শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বাহ্যিক প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক দায়িত্ব সাধারণত পুরুষ আলেমরাই (শিক্ষক) সামলান। তাছাড়া উচ্চতর শ্রেণীর কিছু বিষয়ে বিশেষ পারদর্শিতার প্রয়োজন হওয়ায় অনেক সময় পুরুষ শিক্ষকদের সহযোগিতা নিতে হয়। আবার প্রশাসনিক বিভিন্ন দৌড়ঝাঁপ এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সমন্বয়ের মতো দায়িত্ব পালনে নারীরা এখনো তুলনামূলক কম অংশ নিচ্ছেন। এ কারণে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শীর্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বে পুরুষদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।’

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, হলি ক্রস কলেজ, ভারতেশ্বরী হোমসের মতো অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নারীদের সফল নেতৃত্বের উদাহরণ থাকলেও দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় নারী প্রধান শিক্ষক ও নারী প্রিন্সিপালের হার ১০ শতাংশেরও কম। শিক্ষা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট প্রধান শিক্ষক আছেন ১৭ হাজার ৭৭ জন, তাদের মধ্যে ১ হাজার ৫৩৫ নারী। অর্থাৎ মোট প্রধান শিক্ষকের মাত্র ৮ দশমিক ৯৯ শতাংশ নারী। অন্যদিকে কলেজের ক্ষেত্রে মোট প্রিন্সিপাল ৩ হাজার ৩৬৪ জন। এর মধ্যে নারী মাত্র ৩১৬ জন, যা মাত্র ৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ। একই চিত্র দেখা গেছে নারী সহকারী প্রধান শিক্ষক ও নারী ভাইস প্রিন্সিপালের ক্ষেত্রেও। মোট ১৩ হাজার ৬৬০ সহকারী প্রধান শিক্ষকের মধ্যে নারী কেবল ২ হাজার ১২৪ জন এবং ৯০৫ ভাইস প্রিন্সিপালের মধ্যে নারী আছেন ১২৮ জন।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ঢাকার একটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নারী শিক্ষকদের জন্য প্রিন্সিপাল কিংবা ভাইস প্রিন্সিপালের মতো পদগুলোয় আসা অনেক বেশি কঠিন। আমাকেই যেমন একাধিক ব্যক্তি বুঝিয়েছিল, আমি যদি ভাইস প্রিন্সিপাল হই, তাহলে কলেজের দায়িত্ব পালন করে অফিসের দায়িত্ব পালন করা কঠিন হবে। তাই আমি যেন কর্তৃপক্ষকে জানাই, ভাইস প্রিন্সিপাল পদে আমি আগ্রহী নই। অনেক ক্ষেত্রে এমনও হয়, একজন নারী যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও ম্যানেজমেন্ট কমিটি তার পরিবর্তে কোনো পুরুষকে সুপারিশ করে। যুক্তি হিসেবে তারা দেখায়, নারী হিসেবে সংসার সামলে এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে না। আমারই পরিচিত দুজনের সঙ্গে কয়েক বছর আগে এমন ঘটনা ঘটেছে।’

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া এবং সহযোগিতাপরায়ণতার ক্ষেত্রে বেশির ভাগ সময়ই পুরুষদের তুলনায় নারীরা এগিয়ে থাকেন। এছাড়া নারী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে নির্যাতন বা অনিয়মের অভিযোগও তুলনামূলক কম। এর আগে বিষয়টি বিবেচনা করে প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়াতে কোটা প্রথাও প্রচলন করা হয়েছিল। ১৯৯৬ সালে প্রথম প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ করা হয়। পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর তা কার্যকর না থাকলেও ২০০৯ সালে পুনরায় চালু করা হয়। ২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিধিমালায়ও নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা বহাল রাখা হয়। ওই বিধিমালায় বাকি ৪০ শতাংশের ২০ শতাংশ পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত ছিল আর অবশিষ্ট ২০ শতাংশ ছিল পোষ্য কোটা।

এ কোটা ব্যবস্থা প্রাথমিক স্তরে নারী শিক্ষকের হার বাড়াতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল। এমনকি সরকারি এ উদ্যোগ দেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নারী শিক্ষক নিয়োগে উৎসাহী হয়। বর্তমানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশই নারী। আর বেসরকারি বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেনসহ সব ধরনের প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট শিক্ষকদের মধ্যে নারীর হার ৬২ দশমিক ৬ শতাংশ।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধূরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘দেশে বর্তমানে উচ্চশিক্ষিত নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষকতার জন্য যোগ্য নারীরও অভাব নেই। তবে নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক নারী শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হতে পারছেন না।’

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ বাড়াতে অন্তত সাময়িকভাবে ৬০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণ প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মতো মাধ্যমিক স্তরেও শিক্ষকদের নিজ এলাকার বা নিকটবর্তী বিদ্যালয়ে নিয়োগে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা উচিত। এতে নারীদের জন্য শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হওয়া সহজ হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষকের সংখ্যা বাড়ানো গেলে নারী শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা সহজ হবে। এতে অভিভাবকরাও মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠাতে আরো স্বাচ্ছন্দ্য ও নিরাপদ বোধ করবেন। পাশাপাশি শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার কমবে এবং নারী শিক্ষার্থীরা নারী শিক্ষকদের দেখে অনুপ্রাণিত হবে।’

এদিকে কোনো নীতিমালা প্রণয়ন বা উদ্যোগ নেয়ার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের বাস্তব পরিস্থিতিকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়াকে দেশের অন্যতম বড় সমস্যা বলে মনে করেন শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, নারীরা কেন পিছিয়ে পড়ছেন, কোন কোন বিষয় তাদের অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতার মধ্যে কোনগুলো সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে—এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ নেয়া অত্যন্ত জরুরি। একই সঙ্গে নারীরা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা ও ভূমিকা প্রত্যাশা করেন, সেটিও জানা প্রয়োজন। বাস্তব পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই কার্যকর ও সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা উচিত।

মাধ্যমিক বা কলেজ পর্যায়ে নারী শিক্ষকের হার কম থাকা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের সামগ্রিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রতিফলন বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের প্রধান ও নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা শিরীন পারভীন হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘পারিবারিক সহযোগিতার অভাব, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে আনুষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তবে প্রাথমিক শিক্ষা খাতে পরিস্থিতি তুলনামূলক ভিন্ন। ১৯৭৯ সালে গঠিত নারীবিষয়ক কমিশন সুপারিশ করেছিল, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নারী শিক্ষকরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন না করা পর্যন্ত তাদের জন্য কোটা সংরক্ষণ করতে হবে। সে সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগে নারীদের জন্য ৬০ শতাংশ কোটা চালু করা হয়। এর ফলেই প্রাথমিক শিক্ষায় নারী শিক্ষকের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।’ অন্যান্য ক্ষেত্রেও এ ধরনের নীতিগত উদ্যোগ নেয়া হলে সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারত বলে মনে করেন তিনি।

কোটা ব্যবস্থা বৈষম্য সৃষ্টি করে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে শিরীন পারভীন হক বলেন, ‘সমাজে এখনো নারী ও পুরুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিতে সমতা তৈরি হয়নি। নারীরা এখনো পুরুষের তুলনায় বেশি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধার মুখোমুখি হন। এসব বাধা অতিক্রম করে নারীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করতেই কোটা প্রয়োজন। যখন নারী-পুরুষের ক্ষেত্রে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য থাকবে না এবং নারীদের বাড়তি বাধার সম্মুখীন হতে হবে না, তখন কোটার প্রয়োজনও থাকবে না। কিন্তু তার আগে পর্যন্ত সমতা নিশ্চিত করতে এটি গুরুত্বপূর্ণ।’

প্রধান শিক্ষক বা অধ্যক্ষের মতো নেতৃত্বের পদে নারীদের অংশগ্রহণ ১০ শতাংশেরও কম থাকার বিষয়ে এ নারী নেত্রী বলেন, ‘এসব পদ ক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রভাব বিস্তার, তদবির ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ হয়। সেখানে দক্ষতা ও যোগ্যতা সবসময় অগ্রাধিকার পায় না। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা ও নারীর নেতৃত্ব নিয়ে নেতিবাচক ধারণার কারণেও অনেক যোগ্য নারী নেতৃত্বের পদে পিছিয়ে পড়েন।’

এ বিষয়ে জানতে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেককে একাধিকবার ফোন করা হলেও সাড়া দেননি।

আরও